“তুমি তোমার ভাষায় শুনাও” বার্তা বাহককে মুসা বললেন। “আট দিন যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা দাও, তুমি যা নিজ চোখে দেখেছ তা বল।”
ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, মুসা ইবনে নুসাইব আবেগে উদ্বেলিত হয়ে গিয়েছিলেন। চুলে ঢুলে যুদ্ধের বর্ণনা শ্রবণ করছিলেন। বর্ণনা শ্রবণের পর খলীফার কাছে বিস্তারিত পত্র লেখেছিলেন তার শেষাংশে লেখেছিলেন,
“এ যুদ্ধ কোন সাধারণ যুদ্ধের মত ছিল না। কোন সহজ ব্যাপার ছিল না। পূর্ণ হাশরের ময়দান ছিল। আমি মৌখিক যে বর্ণনা শুনেছি তাতে আমার শরীর শিহরে উঠেছিল। আমাদে বিজয় ছিল সন্দেহজনক। বার হাজার সৈন্য এক লাখের মুকাবালায় অর্ধদিনও টিকতে পারে না। এটা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রেমে জীবন উৎসর্গকারীদের কারিশমা। আমরা তাদেরকে কেবল মুবারকবাদ জানাতে পারি, প্রতিদান তো স্বয়ং আল্লাহ পাক দেবেন।
মুসা ইবনে নুসাইর রডারিকের ঘোড়া ও তরবারী পয়গামের সাথে খলীফার দরবারে দামেস্কে পাঠিয়ে দেন। এর সাথে ত্রিশ হাজার কয়েদীও পাঠান। ইবনে মানসুর নামক এক আরব লেখক সে দৃশ্যকে এভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন,
“সে ত্রিশ হাজার সৈন্য দেখে বুঝা যাচ্ছিল যে,ইসলামের মুকাবালায় কুফর কতটা অসহায়। কয়েদী দলকে ভীতির চাদর ঢেকে নিয়ে ছিল। এতদিন তারা বাতিল আকীদা-বিশ্বাসে বন্দী ছিল। ছিল তাদের বাদশাহর গোলাম। আর এখন তারা যুদ্ধ বন্দী হয়ে হেঁটে চলেছে। তাদেরকে এ খবর তখনো দেওয়া হয়নি যে, তোমরা ঘোর হতাশা হতে বেরিয়ে আলোর পথে যাচ্ছো, বাতিল হতে হকের দিকে যাচ্ছ। তাদেরকে খবর দেওয়া হয়নি যে, ইসলামের বাদশাহ জালেম নয়, নির্যাতনকারী ও নিপীড়ক নয়। ইসলামে মুনিব-গোলাম একই মর্যাদা রাখে।
একজন ইউরোপিয়ান কবি রডারিকের পরাজয়ের বিবরণ এভাবে দিয়েছেন, “যখন রডারিকের সৈন্য পরাজিত হলো তখন সে একটা উঁচু টিলার ওপর গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে লাগল, সে দেখতে পেল, গতকালও যে শাহী পতাকা পতপত করে উড়ছিল আজ তা ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে রক্তমাখা মাটিতে পড়ে আছে। সে মুসলমানদের বিজয় ধ্বনি শুনতে পেল। তার পরাজিত-নিরাশ বিস্ফোরিত আঁখিযুগল তার জেনারেল ও ক্যাপ্টেনদেরকে তালাশ করতে লাগল। কিন্তু দেখল যারা নিহত হয়েছে তারা ছাড়া বাকীরা পলায়ন করেছে।
রডারিক আহ্! ধ্বনী উচ্চারণ করে নিজেকে সম্বোধন করে বলল, আমার ফৌজের লাশের গণনা কেউ করতে পারবে না, কে করতে পারে এত বিপুল পরিমান শব দেহের গণনা?… এত বিস্তৃত ময়দান রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। খুন দেখে তার নয়নযুগল বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল যেন কোন আহত সিপাহীর গর্দান হতে শেষ রক্ত বিন্দু প্রবাহিত হচ্ছে।
“রডারিক নিজেকে লক্ষ্য করে বলল, গতকল্য পর্যন্ত আমি স্পেনের বাদশাহ ছিলাম। আজ কিছুই নই। আলিশান কেল্লার দরজা আমার সৈন্যদেরকে দূর থেকে দেখেই খুলে যেত। এখন এমন কোন জায়গা নেই যেখানে আমি শান্তিভরে একটু বসতে পারি। আমার জন্যে দুনিয়ার তাবৎ দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।… হে বদনসীব! তুমি মনে করেছিলে পৃথিবীর সারা তাকৎ তোমার হাতে…। হ্যাঁ আমি হতভাগা। আজকে আমি শেষবারের মত সূর্যকে অস্তমিত হতে দেখছি। হে মৃত্যু! তুমি এত ধীর পদে আসছো কেন? আমাকে ছুঁ মেরে তুলে নিতে ভয় পাচ্ছ কেন? এসো… দূত এসো।”
***
তারেক ইবনে যিয়াদ তার সকল জেনারেলদেরকে ডাকলেন, জুলিয়ন ও আওপাস তার সাথে ছিল।
তারেক : আমরা এখানে আর বেশীক্ষণ অবস্থান করতে পারছি না। এ ময়দান থেকে যেসব স্পেনীরা পলায়ন করেছে তাদের স্থির থাকতে দেয়া যাবে না। তাদের পিছু ধাওয়া করতে হবে তাই রওনা হবার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণ কর।
জুলিয়ন ও আওপাসের তত্ত্বাবধানে ফৌজ রওনা হবার প্রস্তুগ্রিহণ করছিল এরি মাঝে তারেক জানতে পারলেন বিপুল পরিমাণ বর্বর মুসলমান ফৌজে যোগদানের জন্যে এসেছে। যে সকল বর্বর গোত্রে বিজয়ের খবর পৌঁছেছে সেখান থেকেই মুসলমানরা স্পেনে পৌঁছা শুরু করেছে। তারেক ইবনে যিয়াদ তাদেরকে ফৌজে শামিল করে নেয়ার নির্দেশ দিলেন আর বললেন, তাদেরকে যেন জানিয়ে দেয়া হয়, তারা যুদ্ধের জন্যে এখানে এসেছে লুটতরাজের চিন্তা যেন কেউ না করে।
সম্মুখে সাধনা নামেএকটা কেল্লা ছিল। মুসলমানদেরকে দূর থেকে আসতে দেখে কেল্লাতে যত সৈন্য ছিল তারা সবাই পালিয়ে গেল। শহরের সাধারণ জনগও চলে যাচ্ছিল।
তারেক ইবনে যিয়াদ ঘোড় সোয়ার বাহিনীর প্রধানকে বলল, কয়েকজন সোয়ারী দ্রুত পাঠিয়ে দেয়া হোক তারা গিয়ে শহরীদেরকে যেন আশ্বস্ত করে যে, তাদের ধন-সম্পদ, ইজ্জত-আব্রুর পূর্ণ হিফাজত করা হবে।
ঘোড় সোয়ারী গিয়ে তাদেরকে যার যার বাড়ীতে ফিরিয়ে পাঠাল। আর শহরবাসীদের একটি প্রতিনিধিদল তারেক ইবনে যিয়াদের কাছে আসল। প্রতিনিধি দলের মাঝে যে সবচেয়ে বেশী বয়স্ক সে বলল, আমরা দুর্বল, কমজোর। দুর্বলদের এমন কোন অধিকার থাকে না যে তারা শক্তিশালীদের ওপর কোন শর্ত আরোপ করবে। এ অধিকার বাদশাহদের রয়েছে যে তারা সৈন্যদের শক্তি বলে দুর্বল দেশে আক্রমণ করে দখল করে নিয়ে মানুষের ঘর-বাড়ী লুটতরাজ ও রমণীদের ইজ্জত হরনের হুকুম দেবে। আপনিও এমন কিছুই করবেন। এ পল্লীতে আপনাকে কেউ বাধা দেবে এমন কেউ নেই। আমাদেরকে যাবার অনুমতি দিন। সকলের ধন-সম্পদ নিয়ে নেন। আমরা আমাদের জোয়ান লাড়কী ছাড়া সাথে কিছুই নিচ্ছি না। আপনি বস্তিতে প্রবেশ করুন, আমরা আপনাকে ইস্তেকবাল জানাব। বৃদ্ধের বক্তব্য তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হলো।
