উত্তর আফ্রিকার বর্বর গোত্রের লোকেরা বেকারার ও পেরেশান হয়ে উঠেছিল, তারা যুদ্ধের খবরের জন্যে সমুদ্র তীরে অপেক্ষমান ছিল। পরিশেষে কয়েদীদের প্রথম কিশতী তীরে ভিড়ল। বর্বররা খবর নেয়ার জন্যে মাল্লাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কয়েদীদের সাথে বর্বর সৈন্যরা ছিল। তারা যুদ্ধের খবর তাদেরকে বললে অপেক্ষমান বর্বররা দ্রুতবেগে ঘোড়া হাঁকিয়ে নিজ নিজ কবিলাতে গিয়ে পৌঁছল। যেখানে যেখানে তারেক ইবনে যিয়াদের বিজয় আর স্পেনীদের পরাজয়ের সংবাদ পৌঁছল সেথায় আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। নারী-পুরুষ শিশু-কিশোররা উম্মাদের ন্যায় নাচতে লাগল।
তারেকের কাছে বর্বর ফৌজ খুবই কম।”
“সম্মুখে গিয়ে কোথাও আবার শক্রর হাতে আটকা না পড়ে।”
“তারেক ইবনে যিয়াদের সাহায্যের জন্যে প্রস্তুত হও।”
এ ধরনের নানা কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। এর ফলশ্রুতিতে বর্বররা কিসতী জোগাড় করে জোয়ান-নওজোয়ান, মাঝবয়সী বর্বর মুসলমানরা তারেক ইবনে যিয়াদের মদদের জন্যে সমুদ্র পাড়ে গিয়ে একত্রিত হয়ে স্পেনে পৌঁছতে লাগল।
এদিকে হিজি একটা নৌকা থেকে নেমে জুলিয়নের মহলের দিকে দ্রুত বেগে ছুটে চলল। এ হলো সেই হিজি যে রডারিকের মাথা কেটে এনে জুলিয়নের বেটী ফ্লোরিডার পায়ের কাছে রাখার ওয়াদা করেছিল। হিজি যখন সিওয়াস্তাতে পৌঁছল তখন পর্যন্ত সেখানে স্পেনের যুদ্ধের কোন খবর পৌঁছেনি। সে যখন নৌকা থেকে নেমে ছুটতে লাগল তখন তার পিছু পিছু তিন-চারজন বর্বর ছুটতে লাগল।
তুমি কি স্পেন থেকে এসেছ? দৌড়াতে দৌড়াতে হিজি এক বর্বরের আওয়াজ শুনতে পেল।
না দাঁড়িয়েই হিজি জবাব দিল। যা, আমি জানি তুমি কি জানতে চাচ্ছ… বর্বররা বিজয় অর্জন করেছে।
বর্বর : একটু দাঁড়াও ভাই! ভালভাবে বলে যাও!
হিজি দ্রুত চলতে চলতে সংক্ষেপে যুদ্ধের ঘটনা, রডারিকের মৃত্যু ও তার ফৌজ হালাকীর খবর শুনিয়ে দিল।
হিজি : কায়রোতে যাও সেখানে স্পেনের হাজার হাজার কয়েদীকে অবতরণ করান হবে।
বর্বর মুসলমানরা বিজয়ের খুশী প্রকাশ করে ধ্বনী দিতে দিতে ফিরে গেল। আর হিজি মহলের দিকে গ্রুত বেগে হেঁটে চলল। মহল ছিল কেল্লার ভেতর আর তা ছিল নিকটেই। ফ্লোরিডা কেল্লার প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দিকে নিষ্পলক * চেয়ে ছিল। সে প্রতিদিন এভাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা নাগাদ কয়েকবার প্রাচীরে দাঁড়িয়ে সাগর বক্ষে নির্নিমিষ দৃষ্টে চেয়ে থাকত। কোন কিশতী দেখলে অপলক নেত্রে তা প্রত্যক্ষ করত, কিন্তী চলে গেলে তার চেহারায় নৈরাশ্যতার ছাপ ফুটে উঠত। এভাবে সে দিনের পর দিন প্রহর গুনছিল। পরিশেষে সে যার প্রতীক্ষায় ছিল তাকে দেখতে পেল। সে দূর থেকেই দেখতে পেল কিশতী হতে যে অবতরণ করল সে হিজি।
ফ্লোরিডা কেল্লার প্রাচীর হতে দৌড়ে নামল। হিজি মহলের সদর দরজার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। দিনের বেলা, তাই দরজা খোলা। হিজি কেল্লার ভেতরে প্রবেশ করল। তাকে সকলেই চিনত একারণে কেউ বাধা দিল না। মহলের যেখানে ফুল বাগান, উঁচু গাছ-পালা ও পত্র-পল্লবে ঘেরা সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। বহিরাগত কারো সেখানে যাবার অনুমতি ছিল না। অনেক বড় বিস্ময়কর খবর নিয়ে এসেছিল তাই হিজি বড় পেরেশান ছিল। ফলে সে কোন কানুনের পরওয়া করেনি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সে একটু ঝিরিয়ে নিচ্ছিল।
হিজি : হিজি পশ্চাতে মেয়েলি কণ্ঠ ও পদধ্বনি শুনতে পেল। পিছনে ফিরতে ফ্লোরিডা তীব্র আবেগে তাকে বুঝে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পরেই ফ্লোরিডা হিজিকে ছেড়ে দিয়ে হালকা ধাক্কা মেরে পিছু হটে গেল। তার চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ ভেসে উঠল।
ফ্লোরিডা : তুমি রিক্ত হাতে এসেছ, তোমার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ কর, রডারিকের মাথা কোথায়?
হিজি ফ্লোরিডার কথা শুনে মৃদু হাসল।
ফ্লোরিডা হিজির কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকি দিয়ে বলল হিজি! বল, মুসলমানরা রডারিকের কাছে পরাজিত হয়েছে আর তুমি সেখান থেকে পালিয়ে এসেছ? আমার বাবা কি গ্রেফতার হয়েছে না নিহত হয়েছে?
হিজি: না ফ্লোরা! গভর্নর জীবিত রয়েছেন, রডারিক নিহত হয়েছে।
তার মাথা কেন নিয়ে আসনি?
হিজি : সে সলিল সমাহিত হয়েছে। মাটি থেকে শাহী পাদুকা তুলে ফ্লোরিডার দিকে তুলে ধরে বলল, তার এ জুতা হস্তগত হয়েছে। তার সফেদ ঘোড়া দরিয়ার কিনরায় দাঁড়িয়ে ছিল। ঘোড়ার কাছে পড়েছিল তার এ পাদুকা ও তলোয়ার। এ জিনিস আমার হাতে এমনিতেই আসেনি। আমি তলোয়ার নিয়ে রডারিকের ফৌজের মাঝে প্রবেশ করেছিলাম। রডারিকের পতাকা দেখতে না পেয়ে সমুদ্র পাড় পর্যন্ত পৌঁছে ছিলাম। রডারিকের ফৌজ মুসলমানদের হাতে নিহত হচ্ছিল। আমি রডারিকের সফেদ ঘোড়া দেখতে পেলাম কিন্তু তাতে রডারিক সোয়ার ছিল না। তার পাদুকা ও তলোয়ার উঠিয়ে তার ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে সিপাহসালার তারেক ইবনে যিয়াদের কাছে গিয়ে খবর দিলাম রডারিক সলিল সমাহিত হয়েছে। ঘোড়া ও মুক্তা খচিত তলোয়ার তারেক তার কাছে রেখে দিলেন। পাদুকা আমার কাছে রাখার জন্যে আবেদন করলাম। তিনি অনুমতি দিলেন। আমি তা তোমার জন্যে। নিয়ে এসেছি। ফ্লোরিডার চেহারা চমকে উঠল। তার প্রতিশোধ পূর্ণ হলো।
***
দু’জন ঐতিহাসিক প্রফেসর দুজি এবং গিয়ানগুজ লেখেছেন, মুসা ইবনে নুসাইরের কাছে তারেক ইবনে যিয়াদের পয়গাম পৌঁছলে তিনি তা তড়িঘরি করে পড়লেন। আবেগে তার চেহারা লাল হয়ে গেল। আট দিন যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ তারেক ইবনে যিয়াদ দিয়েছিলেন কিন্তু মুসা ইবনে নুসাইর তাতে পূর্ণ শান্ত হলেন না,
