রডারিকের ফৌজের মাঝে পূর্ব হতেই যে আতংক বিরাজ করছিল তা যুদ্ধের ময়দানের স্পৃহা তাদের খতম করে দিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ হাতিয়ার ফেলে দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল।
***
রডারিকের নির্দেশে রাত্রে ক্যাম্পের চতুর্দিকে পাহারা জোরদার করা হলো। তারপরও কিছু জানবাজ মুজাহিদ ক্যাম্পে পৌঁছে বহু সৈন্য হত্যা করে ঘোড়ার ওপর তীর চালিয়ে তা বেকার করে দিয়ে আসল।
সকালে অগ্নিশর্মা হয়ে রডারিক বলল,আজকে হবে শেষ লড়াই। আজ আমি স্বয়ং নিজে অগ্রভাবে থাকব। এক গোথা জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, গোখা সিপাহীদেরকে আমি এখনো অগ্রে পাঠাইনি, তুমি তোমার গোথা জানবাজদেরকে বলে দাও আমি এখন বিজয়ের একমাত্র ভরসা তোমাদের ওপর করছি। আমার। কওমের বাহিনীরা আমাকে ভীষণ লজ্জায় ফেলে দিয়েছে।
এ জেনারেলের সাথেই মেরীনা কথা বলে তার পক্ষে আনতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাতে সে সক্ষম হয়নি পরিশেষে এক সুন্দরী লাড়কীর লোভ দেখিয়ে ছিল। তার সে প্ল্যানও বাস্তবায়ন হয়নি, ইহুদী জাদুকর তাকে জবাই করার জন্যে নিয়ে গেলে তা ভেস্তে গেছে।
যুদ্ধের তৃতীয় দিন গোথারা যুদ্ধের জন্যে সম্মুখে আসল। তাদের পিছনে ছিল অন্য কওমের সৈন্য বাহিনী। পিছনের বাহিনীর সাথে রডারিকও ছিল। সে তার সফেদ ঘোড়ায় সোয়ার ছিল। মাথার ওপর পতাকা উড়ছিল। চতুরপার্শ্বে ছিল তার মুহাফেজ বাহিনী।
তারেক ইবনে যিয়াদ রডারিকের পতাকা দেখে তার ঘোড়া ছুটিয়ে তার সৈন্য বাহিনীর সম্মুখে চলে গেলেন। তারেকের পিছনে তার রক্ষী বাহিনী গেলে তিনি তাদেরকে চলে যাবার নির্দেশ দিলেন। আর মুগীছে রূমীকে কাছে ডেকে তার কানে কানে কিছু বললেন। মুগীছে রূমী স্পেনী ভাষা বুঝত এবং বলতে পারত। সে তারেক ইবনে যিয়াদের কথা শুনে সম্মুখে চলে গেল।
মুগীছে রূমী এলান করল, “আমরা শাহান শাহে উন্দুলুসকে স্বাগতম জানাচ্ছি, আমাদের সিপাহ্ সালার তারেক ইবনে যিয়াদ বলছেন, বাদশাহ্ রডারিক যদি যুদ্ধের জন্যে এসে থাকেন তাহলে তিনি যেন আমাদের মত রক্ষী বাহিনী ছাড়া একাকি সম্মুখে আসেন।”
রডারিক ঘোষণা করাল, আমার মত কোন বাদশাহ যদি তোমাদের মাঝে থাকত তাহলে আমি তোমাদের সম্মুখে যেতাম। দস্যু সর্দারের সামনে যাওটা বাদশাহ্র মর্যাদাহানী। তোমাদের বাদশাহকে সাথে নিয়ে আসা উচিৎ ছিল।
তারেক ইবনে যিয়াদ এলান করালেন, “আমরা তোমাকে অচিরেই আমাদের বাদশাহ্র কাছে পৌঁছে দেব। আমাদের বাদশাহ্ আল্লাহ্, আমরা কোন মানুষকে বাদশাহ্ বানাইনা। আমাদের সকলের বাদশাহ্ আল্লাহ এ পয়গাম ও তোমাদের বাদশাহী, চিরতরে খতম করার জন্যে এসেছি।’
গোথা জেনারেলের নাম ধরে আহ্বান করে রডারিক বলল, সামনে অগ্রসর হয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দাও।
গোথা জেনারেল উচ্চধ্বনি দিতে বলল, প্রবল বেগে আগ্রমণ কর হে আহলে গোথা! একথা বলেই সে ঘোড়া হাঁকিয়ে দিল।
তার নিজস্ব সোয়ারীদের মধ্য হতে এক সোয়ারী পিছন দিক হতে এসে তার পিঠে প্রবল বেগে বর্শার আঘাত হানল। তারপর পিঠ হতে বর্শা বের করে পূনঃবার মারল। জেনারেল ঘোড়া হতে পড়ে গেল। গোথা কওমের সৈন্যরা তলোয়ার কোষবন্ধ করে মুসলমানদের সাথে গিয়ে মিলে গেল। তাদের মাঝে সোয়ারী ও পায়দল উভয়দল ছিল। তারেক ইবনে যিয়াদ তো আগে থেকেই জানতেন যে গোথা ও ইহুদীরা তাদের সাথে মিলে যাবে কিন্তু তারেকের ফৌজরা ছিল পেরেশান, এ আবার কেমন হামলাকারী যে তারা তলোয়ার কোষবদ্ধ করে রেখেছে।
তারেক ঘোষণা দিলেন, তাদেরকে ইস্তেকবাল কর, তারা তোমাদের দোস্ত, এখন থেকে তারা তোমাদের সাথী।
অপরদিকে রডারিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করছিল একি? তারা কোথায় যাচ্ছে? তারা তাদের জেনারেলকে হত্যা করল?
তার এসব প্রশ্নের জওয়াব দেয়ার কেউ ছিল না। এটা ছিল মেরীনা ও আওপাসের গোপন পরিকল্পনার ফসল। গোখাদের সংখ্যার ব্যাপারে ঐতিহাসিকরা দ্বিমত পোষণ করেছেন, কেউ বলেছেন, বিশ হাজার কেউ পঁচিশ বলে জ্ঞান। করেছেন। আবার কেউ পনের-বিশ হাজার বলে ধারণা করেছেন।
রডারিকের প্রশ্নের জওয়াব দেয়ার জন্যে এক গোথা সম্মুখে অগ্রসর হয়ে উচ্চস্বরে বলল,
আমরা আমাদের বাদশাহ্ ডেজার প্রতিশোধ নেব। স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী গোথা কওম। রডারিক! তুমি গোথাদের রাজত্ব খতম করে নিজে ক্ষমতার মসনদে হয়েছ আসীন, এবার দেখবে আমরা আমাদের অধিকার কিভাবে আদায় করি।”
***
লড়াই ছাড়াই যুদ্ধের রূপ পাল্টে গেল। আগের দিন রডারিক প্রবলবেগে আক্রমণ করিয়ে ছিল, কিন্তু প্রতিটি আক্রমণই ব্যর্থ হয়েছে। মুসলমানদের সংখ্যা এক সাথে বিশ হাজার বৃদ্ধি পেল। আর এ সংখ্যা কেবল নামকা ওয়াস্তে ছিল না বরং তাদের মাঝে দাউ দাউ করে জ্বলছিল প্রতিশোধের অনির্বাণ শিখা।
সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াতে তারেক ইবনে যিয়াদ যুদ্ধ পলিসি পরিবর্তন করলেন এবং গোথাদের মাঝ থেকে একজনকে জেনারেল নিয়োগ করলেন।
তারেক ইবনে যিয়াদ তার সালারদেরকে সম্বোধন করে বললেন,
“কে বলবে যে, আমার রাসূলুল্লাহর (স) ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণিতহবে না…। আল্লাহর সাহায্য যখন আসে তখন তার বান্দার তাবৎ মুশকিল আসান হয়ে যায়। আল্লাহ্ তায়ালা অবশ্যই তার মাহবুবের সুসংবাদ বাস্তবায়ন করবেন। তোমরা সকল ফৌজুকে বলে দাও তারা যেন আল্লাহর দরবারে মাথা নত রাখে আর দিলে কেবল যেন আল্লাহর নাম স্মরণ করে।
