অপরদিকে সমুদ্র তীরে এক জাঁকজমকপূর্ণ তাবুতে রাগে-দুঃখে বাদশাহ রডারিক দাঁতে দাঁত পিষছিল। কখনো সে বসছিল কখনো আবার লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে তাবুর মাঝে পায়চারী করছিল। আবার কখনো মাথা-বুক থাপড়াচ্ছিল। দু’জন জেনারেল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। পরিশেষে একজন বয়স্ক জেনারেল, রডারিক যাকে অত্যন্ত সম্মান করত, সে কামরায় প্রবেশ করে বলল,
বাদশাহ নামদার! আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। গোখারা প্রতারণা করেছে তাতে কোন অসুবিধা হবে না। আমরা তাদের বংশ নিপাত করে দেব।
মাটিতে স্বজোরে পদাঘাত করে গর্জে উঠে রডারিক বলল, আমাদের বংশই নিপাত হবার পথে। যা বলছ তার কাবেল যদি তোমরা হতে তাহলে প্রথমদিনই এ, লড়াই খতম হয়ে যেত। তোমরা দুশমনের কি ক্ষতি করতে পেরেছ? যারা সংখ্যার দিক থেকে মানুষের পায়ের নিচে পিপড়ার ন্যায়। কিন্তু এ পিপড়া এখন আমাদের অস্তিত্ব বিনাশের পথে। দুশমন কমজোর হবার চেয়ে দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠল।… আমার সম্মুখ থেকে বেরিয়ে যাও।
জেনারেল চলে না গিয়ে শুরাতে শরাব ঢালল।
জেনারেল পিয়ালা রডারিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, আমরা শাহানশাহ্ কে এ অবস্থায় দেখতে চাই না। এ পিয়ালা পান করে নিজেকে সামলে নেন।
রডারিক পিয়ালা নিয়ে স্বজোরে ছুঁড়ে ফেলে তা ভেঙ্গে খানখান করে ফেলল।
রডারিক : তোমরা আমার বুদ্ধিমত্তা খতম করতে চাও, তোমরা আমাকে বাস্তবতা ভুলে যেতে বলছ।
জেনারেল রডারিকের খিমা থেকে বেরিয়ে আওরতদের খিমার দিকে গিয়ে একজন নওজোয়ান সুন্দরী লাড়কীকে সাথে করে নিয়ে এলো যে রডারিকের কাছে খুবই প্রিয় ছিল। সে লাড়কীকে খিমাতে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে চলে আসার কিছুক্ষণ পরেই লাড়কী খিমা হতে বেরিয়ে এলো। রডারিক লাড়কীকে খুব তীব্রভাবে ধাক্কা দিয়ে ছিল ফলে লাড়কী বের হয়ে আওরতদের খিমার দিকে চলে গেল।
***
রডারিক বুড়ো জেনারেলকে আহ্বান করল। জেনারেল দৌড়ে রডারিকের খিমাতে পৌঁছল।
হতাশভাবে রডারিক জেনারেলকে লক্ষ্য করে বলল, সম্ভবত ঐ ইহুদী গণক ব্যর্থ হয়েছে। সে বলেছিল, একজন নওজোয়ান লাড়কীকে জবেহ করলে আমার মন্দ পরিণাম (বদফালী) দূরিভূত হবে। আমি তাকে লাড়কী দিয়েছি। সে হয়তো তাকে জবেহ করেছে… কিন্তু… বেকার হয়ে গেছে…। ইহুদী আমাকে ধোকা দেয়নি তো?
জেনারেল : আমি এখনই এক সোয়ারীকে টলেডো প্রেরণ করছি, সে সংবাদ নিয়ে আসবে।
পরাস্ত আহত সৈনিকের মত হতাশার স্বরে রডারিক বলল, সে কবে পৌঁছবে। আর কবে বা ফিরে আসবে!
হিরাক্লিয়াসের দুর্গ খোলা আমার ঠিক হয়নি। দুর্গের রক্ষক দুজন পাদ্রী আমাকে বাধা দিয়েছিল। তুমি আমার সাথে ছিলে তুমিও আমাকে বুঝিয়ে নিষেধ করেছিলে।
জেনারেল : শাহানশাহ্! পিছনের কথা ভুলে যান এবং সন্দেহ মন থেকে বের করে দেন।
রডারিক : সন্দেহ ও হতাশার হাত থেকে আমি কিভাবে মুক্তি পাব? তুমি কি লক্ষ্য করছে না, দুর্গে আমরা যুদ্ধের যে দৃশ্য দেখেছিলাম তা প্রতিদিন এখানে প্রত্যক্ষ করছি। মুসলমানদের যে ধ্বনি শুনে ছিলাম তাই শুনছি। আমরা ফৌজকে দুর্গের দৃশ্যের পিছু হটতে দেখছি। সেখানে যুদ্ধের ময়দানে আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখেছিলাম। আমি দেখেছিলাম আমার ঘোড়া আমাকে ফেলে পালিয়ে চলে যাচ্ছে। আর যে লাড়কীকে পামপিলুনাতে হত্যা করেছিলাম সে লাড়কী আবার আমার স্বপ্নরাজ্যে এসে ভীড় করছে।
ঐতিহাসিক লেইনপোল তৎকালের স্পেন ঐতিহাসিকদের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখেছেন, “দুর্গ ও হত্যাকৃত কিশোরী” রডারিকের ওপর প্রেতাত্মার ন্যায় সোয়ার হয়েছিল। যে ইহুদীগণক এর হাত থেকে মুক্তি দেয়ার কথা বলেছিল মেরিনা তাকে হত্যা করেছিল। বিশ-পঁচিশ হাজার গোথা ফৌজ কেবল রডারিকের পক্ষই ত্যাগ করেনি বরং তার বিরুদ্ধে লড়াই করছিল। তারপরও তার কাছে বেশ অনেক সৈন্য ছিল কিন্তু সে সব সৈন্যরা মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল। যুদ্ধ ময়দানের কর্তৃত্ব পুরোদমে তারেকের দখলে ছিল। তারেক কোন সন্দেহ ও দুষ্ট আত্মার হাতে গ্রেফতার ছিল না। তার মনে পাপের অনুশোচনা ছিল না; তার দৃঢ় বিশ্বাস তার মনোবলকে আরো বাড়িয়ে ছিল। পক্ষান্তরে রডারিকের অন্তর-মন পাপের প্রায়শ্চিত্তের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছিল। হিসেব-নিকেসের দিন তার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছিল।
***
যুদ্ধের আঠারতম দিনের সূর্য উদিত হলো। রডারিক তার তামাম ফৌজকে অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে ময়দানে দাঁড় করাল। সে তার সফেদ ঘোড়ায় সোয়ার। ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে ফৌজের মাঝে এলান করতে লাগল, আজকে যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায় পৌঁছাবে। তোমরা যদি দুশমনকে পরাজিত করতে পার তাহলে এত বিপুল পরিমাণ ইনয়াম তোমাদেরকে দেব তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও শাহান শাহ্ রডারিককে স্মরণ করবে।
তারেক ইবনে যিয়াদ : হে গোথা সম্প্রদায় তোমরা যদি আজ পরাজিত হও তাহলে, স্পেন হতে তোমাদের বংশ নির্মূল করা হবে। তোমাদের কোন আওরত ও কোন বাচ্চা রডারিক জীবিত রাখবেনা। আর হে বর্বর কওম! তোমরা কখনো কোন দিন কারো কাছে পরাজিত হয়েছ। তোমরা যদি পরাজিত হও, তাহলে কোথায় যাবে? তোমরা এই প্রথম অন্যদেশে এসেছ। আরবী মুসলমানরা কয়েকটি মূলককে ইসলামী সালতানাতে শামিল করতে সক্ষম হয়েছে। তোমাদের আরবী ভাইরা বলবে যে, বর্বররা অন্যদেশে গিয়ে যুদ্ধ করার কাবেলই ছিল না, এটা তোমরা পছন্দ কর?
