পাহারাদারদের তালাশ শুরু হলো। অনেকক্ষণ পরে তিন জনের লাশ পাওয়া গেল।
***
রাত্রি শেষে যখন দিনের আলো প্রকাশ পেল তখন ময়দানের ভয়াবহতা চোখে পড়ল। ময়দানে কেবল লাশ আর লাশ। ময়দান হতে লাশ না উঠিয়ে রডারিক বড় ভুল করেছিল। আগে থেকে ফৌজের মাঝে আতংক বিরাজ করছিল, ময়দানে বিপুল পরিমাণ মৃতদেহ দেখে সে আতংক তুফান আরো বেড়ে গেল। রডারিকের উচিৎ ছিল রাতেই লাশ উঠিয়ে সমুদ্রে ফেলার ব্যবস্থা করা। কিন্তু সে হয়তো একথা ভেবে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল যে, মুসলমানরা এক রাতে এত পরিমাণ ফৌজ খতম করল কিভাবে। তার ধারনা ছিল, মাত্র কয়েকটি দল আক্রমণ করলেই এ স্বল্প সংখ্যক মুসলমান পলায়ন পদ হবে কিন্তু প্রথম দিনের যুদ্ধে তার সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
রডারিক তার জেনারেলদেরকে ডেকে বলল, ময়দানে তোমাদের ফৌজের যে পরিমাণ লাশ দেখছ এ পরিমাণ মুসলমানদের লাশ আজকে আমি চাই। তোমাদেরকে আজ অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে।
একজন জেনারেল বলল, আজ আমরা বিপুল সৈন্য নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করব।
তিতুমীর বলল, পাহাড়ের অভ্যন্তরে গিয়ে আমরা তাদেরকে খতম করব। তিতুমীরের উদ্দেশ্যে রডারিক বলল, তোমার মাথায় যদিএতটুকু বুদ্ধিই থাকত তাহলে তুমি তাদের হাতে মার খেয়ে পলায়ন করতে না। তুমি যদি সৈন্যবাহিনী নিয়ে পাহাড়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর তাহলে না তুমি জীবিত ফিরে আসবে না তোমার সিপাহী। অন্য জেনালেরকে লক্ষ্য করে বলল, আর তুমি বলছ, বিপুল পরিমাণ সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে। তুমি কি কালকে দেখনি? তারা প্রথমে তোমাদেরকে এলোমেলো করেছে তারপর একজায়গায় একত্রিত করে ভিড় সৃষ্টি করে সবাইকে খতম করে দিয়েছে… তুমি কি জানো যে দুশমনের সামনে ভীড় করা লোকসান?
আজ স্বল্প সৈন্য নিয়ে আক্রমণ করবে, একজন মুকাবালা করবে একজনের। নিজেদের মাঝে এতটুকু দূরত্ব রাখবে যাতে আরামে তলোয়ার চালান যায়। আজকের হামলাতে অর্ধেক সোয়ারী অর্ধেক পায়দল থাকবে।
এদিকে তারেক ইবনে যিয়াদ কয়েকজন পায়দল সৈন্যদল নিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি প্রথমে আক্রমণ করতে চাচ্ছিলেন না। প্রথমে দুশমনকে আক্রমণের সুযোগ দিতেন যাতে তাদের কৌশল ও যুদ্ধের প্রক্রিয়া বুঝা যায়।
রডারিকের পরিকল্পনা মুতাবেক তার ফৌজ গতকালের মত দ্রুত বেগে সম্মুখে অগ্রসর হলো না বরং মধ্যম গতিতে সামনে বাড়তে লাগল। তারা সামনে-পিছনে তিন সারিতে সারিবদ্ধ ছিল। প্রথম সারিতে ছিল ঘোড় সোয়ার। তারা মুসলমানদেরকে দেখামাত্র দ্রুত বেগে ধেয়ে আসল। মুসলমান পূর্ব হতেই প্রস্তুত ছিল। তারা সকলেই পায়দল ছিল। একজন সোয়ারীও দেখা যাচ্ছিল না। মুসলমানদের পক্ষ হতে যুদ্ধের নাকারা বেজে উঠল। স্পেনী ঘোড় সোয়াররা পূর্ব হতেই বর্শা প্রস্তুত করে রেখেছিল। কিন্তু তারা যখন মুসলমানদের কাছে পৌঁছল তখন মুসলমানরা তাদের পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিল। তারা সকলেই হঠাৎ করে বসে পড়ল ইতিমধ্যে তেজবেগে ঘোড়া তাদেরকে অতিক্রম করে চলে গেল। ঘোড়া থামাতে পারল না। যখন তারা ঘোড়া থামিয়ে পিছে ফিরে আসছিল ততক্ষণে মুসলমানরা দুশমনের পায়দলবাহিনী পর্যন্ত পৌঁছে পূর্ণদমে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। এ অবস্থায় ঘোড় সোয়াররা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারল না কারণ তাদের নিজেদের পায়দল সৈন্যও তাদের সম্মুখে পড়ছিল। ঘোড় সোয়ার যখন আরো সম্মুখে গিয়ে পিছে ফিরে আসছিল তখন একটা বড় টিলার পশ্চাৎ হতে হঠাৎ মুসলমানদের ঘোড় সোয়ার বেরিয়ে রডারিকের সোয়ারীদেরকে অতর্কিত আক্রমণ করে বসল। আক্রমণ রডারিক বাহিনীর কাছে অকল্পনীয় ছিল। তারা বুঝে ওঠার পূর্বেই মুসলমানদের তলোয়ারে কচু কাটা হলো।
স্পেনীদের অন্য আরেকদল ঘোড় সোয়ার যখন মুসলমান ঘোড় সোয়ারদের দিকে যাচ্ছিল তখন তারা দ্রুত বেগে ঘোড়া ফিরিয়ে যে পাহাড় এবং টিলা হতে এসেছিল সেদিকে চলে গেল।
স্পেনী জবানে বার বার আহ্বান হতে লাগল ফিরে এসো! ফিরে এসো। পাহাড়ের মাঝে খবরদার যেওনা।
স্পেনী সোয়ার যখন ফিরে আসতে লাগল তখন মুসলমান সোয়ারীরা পশ্চাৎ হতে আক্রমণ করে তাদেরকে খতম করতে লাগল এবং আক্রমণ করেই তারা দ্রুতপদে পালিয়ে যেতে লাগল।
ঐতিহাসিকরা লেখেন, উভয় পক্ষের সৈন্যরা বীরত্ব প্রদর্শন করতে ছিল কিন্তু মুসলমানদের মাঝে যে স্পৃহা ছিল স্পেনীদের মাঝে তা ছিল না। মুসলমানরা ছিল বর্বর আর বর্বররা যুদ্ধ-বিগ্রহে ছিল আগ্ৰহী অধিকন্তু ছিল দক্ষ। তাদের হত্যাযজ্ঞের কথা ছিল মাশহুর। ইসলাম গ্রহণের পর কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে পরিণত হয়েছিল, যার ফলে তাদের যুদ্ধ স্পৃহা আরো বেড়ে গিয়েছিল।
স্পেন ফৌজ মুসলমানদের মুকাবালায় টিকে থাকতে পারল না, তারা পিছু হটতে লাগল। স্পেন সোয়ারীদেরকে মুসলমান সোয়ারীরা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পেরেশান করে তুলেছিল। স্পেনীরা এলো-মেলো হয়ে গিয়েছিল। মুসলমানরা একাই কয়েকজন সোয়ারকে খতম করছিল কিছু সোয়ারীকে তো তারা ঘোড়াসহ জীবিত ধরে নিয়ে এসেছিল। মুসলমানদের তাকবীর ধ্বনীতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হচ্ছিল, ক্রমেই যুদ্ধে দামামা-নাকারার আওয়াজ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। যুদ্ধের ময়দানের জন্যে বর্বরদের বিশেষ নাকারা ছিল যা তারা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাজান জরুরী মনে করত।
