রডারিক তার জেনারেলদেরকে বলেছিল, দু’তিন দল মিলে আক্রমণ করা হবে। এক সাথে বেশী ভীড় করলে তোমাদের নিজেদের তীরে জখম হয়ে ও নিজেদের ঘোড়ার পদতলে পৃষ্ঠ হয়ে তোমরা নিজেরাই মারা যাবে। ভীড়ের মাঝে সিপাহীরা ঠিকমত তীর চালাতে পারবেনা। তাই প্রত্যেক বার হামলা হবে দুতিন দলের মাধ্যমে এবং তাহবে নতুন নতুন দল। দুশমনের সংখ্যা খুবই স্বল্প। তাদেরকে পর্যায়ক্রমে যুদ্ধ করাতে হবে যাতে তারা বিশ্রামের সুযোগ না পায়। যুদ্ধের ক্ষণ দীর্ঘ করতে হবে যাতে দুশমনরা আমাদের তলোয়ারে কিছু খতম হয় আর বাকীরা যেন এমনিতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে যায়।
তারেক ইবনে যিয়াদ তার কমান্ডারদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, কোথাও এক জায়গায় জমে লড়াই করা যাবে না। আঘাত হেনেই কেটে পড়বে। কেটে পড়ার সময় এলোমেলো হয়ে যাবে, যাতে করে তোমাদের পিছু পিছু যে দুশমনরা আসবে তারাও যেন এলো-মেলো হয়ে যায়। দুশমনদেরকে পাহাড়ের আড়ালে আনবে তাহলে তাদেরকে তীরন্দাজরা আঘাত হানতে পারবে।
তারেকের প্লান ছিল গেরিলা যুদ্ধের। কারণ এত স্বল্প সংখ্যক বাহিনী নিয়ে রডারিকের বৃহৎ বাহিনীর সাথে এক জায়গাতে স্থির থেকে সামনা-সামনি যুদ্ধ করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু গেরীলা যুদ্ধ কোন সহজ যুদ্ধ নয়। এ যুদ্ধ কেবল বিজ্ঞ জেনারেলই পরিচালনা করতে পারে।
রডারিক হামলার নির্দেশ দিয়ে দিল। তারেক ইবনে যিয়াদ তিন-চার দলকে সম্মুখে অগ্রসর করলেন, তারা এমনভাবে লড়াই করতে লাগল যেন তারা পলায়নের জন্যে ব্যস্ত। তারা এমনভাবে আস্তে আস্তে পিছু হতে লাগল যে, স্পেন ফৌজ তা বুঝতেও পারলনা। মুসলমানরা একটা পাহাড়ের আড়ালে এসে-ডানে বামে চলে গেল। এরি মাঝে পাহাড়ের চূড়া হতে স্পেনী ফৌজের ওপর বর্শা ও তীর, বৃষ্টির ন্যায় অবিরাম বর্ষণ হতে লাগল। এসকল তীর-বর্শা তিতুমীরের ফৌজ হতে হাসিল হয়েছিল। তারেক ইবনে যিয়াদ ওঁত হতে তীর-বর্শা নিক্ষেপের কৌশল শিক্ষা দিয়ে ছিলেন।
তারেকের যেসব সৈন্য ডানে-বামে এলো-মেলো হয়ে চলে গিয়েছিল তারা কিছুদূর গিয়ে একত্রিত হয়েগেল। দুশমনরা তীরের আঘাতে যখন পিছু হটতে লাগল তখন ডান-বাম হতে মুসলমানরা তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করল। দুশমনরা দিশেহারা হয়ে, এলো-মেলোভাবে পলায়ন করতে লাগল। প্রতিরক্ষার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তারা অসহায়ভাবে নিহত হতে লাগল।
যুদ্ধ বিশারদ ঐতিহাসিকরা লেখেন, এর দ্বারা মুসলমানদের সিপাহ্ সালারের যুদ্ধ কৌশল, বুদ্ধিমত্তা ও বীরত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু মুসলমান ফৌজের ব্যাপারে স্পেনী ফৌজের মাঝে যে ত্রাস সৃষ্টি হয়েছিল তা তাদের যুদ্ধ মনোবল দুর্বল করে দিয়েছিল।
এদিন রডারিক আরো কয়েকটি দলের মাধ্যমে আক্রমণ করাল এবং ভালভাবে সৈন্যবাহিনীকে বলে দিল মুসলমানরা পিছু হটলে তাদের পিছু পিছু যেন তারা না যায়। এখন মুসলমানদের পিছু হটার প্রয়োজন ছিল না। তাদের ওপর যখন আক্রমণ হলো তখন তারা টিলার মাঝে আশ্রয় নিল এবং চতুর্দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। স্পেন ফৌজও তাদের মত এলো-মেলো হয়ে গেল। তারপর মুসলমানরা টিলার ওপর থেকে তাদের ওপর এমন আক্রমণ করল যে তাদের অপ্রত্যাশিতভাবে প্রচুর জীবন নাশ হয়ে গেল। মুসলমানরা পিছু হটার কৌশলে তাদের প্রতি আক্রমণ করতে লাগল। তারপর হঠাৎ করে মুসলমানরা সব একত্রিত হয়ে বেষ্টনি দিয়ে স্পেন ফৌজকে ঘিরে ফেলে সম্মুখে বীর বিক্রমে অগ্রসর হয়ে তাদেরকে এমনভাবে সংকুচিত করে ফেলল যে তারা তলোয়ার চালানোরও সুযোগ পেল না। মুসলমানরা তাদেরকে কচু কাটা করল। সূর্য অস্তমিত হলো। ময়দানে রডারিকের ফৌজের লাশের স্তূপ পড়ে রইল তা দেখে তারা আঁতকে উঠল।
অর্ধ রাত্রি। রডারিকের ফৌজ গভীর নিদ্রায় অচেতন। পাহারাদার ঘুরাফেরা করছে। হঠাৎ এক পাহারাদের বুকে খঞ্জর বিদ্ধ হলো। এভাবে আরো কয়েকজন পাহারাদারের অবস্থা এমন হলো। একদিক পরিপূর্ণভাবে নিরাপদ হয়ে গেল। ফৌজ তাবু ছাড়া ছিল। ঘোড়া ফৌজের কাছেই বাঁধা ছিল।
পাহারাদার নিহত হবার পর ছয়জন মুসলমান ধীরপদে অত্যন্ত সতর্কার সাথে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে ঘোড়ার রশি কেটে দিয়ে খঞ্জর মেরে জখম করে ছেড়ে দিল। প্রায় দেড়শত ঘোড়া তারা এমন করল। ঘোড়া আঘাত প্রাপ্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে. লাগল এবং মাটিতে যে সব ফৌজ শুয়েছিল তাদেরকে পিষে ফেলল। এভাবে আঘাত প্রাপ্ত ঘোড়া অসংখ্যক সৈন্যকে পদতলে পৃষ্ঠ করে খতম করে দিল।
এ কর্ম সমাপ্ত করে জানবাজ মুজাহিদরা সেখান তেকে অত্যন্ত সুস্থ সুন্দরভাবে ফিরে এলো। তারা যখন তাদের ক্যাম্পে পৌঁছল তখন সেখানে পর্যন্ত রডারিকের ফৌজের শোর-গোল শুনা যাচ্ছিল। তখনও ঘোড়া ছুটাছুটি করছিল। কোন সাধারণ ঘোড়া ছিল না তা ছিল যুদ্ধ ঘোড়া, তাই তাদের সহজে আয়ত্বে আনা সম্ভব ছিল না। রডারিকসহ তামাম ফৌজ জেগে উঠেছিল।
মশাল জ্বালান হলো। একটা ঘোড়াকে খুব কষ্ট করে ধরা হলো। ঘোড়ার পিঠ দিয়ে রক্ত ঝরছিল। রডারিক পেরেশান হয়ে পড়ল। এ ঘোড়া জখম হলো কি করে। আরো কিছু ঘোড়া ধরে আনা হলো সবগুলোর বদন হতে প্রবল বেগে রক্ত বেরুচ্ছিল।
রডারিক : এটা দুশমনের রাতের কাণ্ড। রাতে যারা পাহারায় ছিল তাদেরকে অশ্বের পিছু বেঁধে টেনে-হেঁছড়ে চামড়া ছুলে সমুদ্রে নিক্ষেপ কর।
