তারেক ইবনে যিয়াদ আসমানের দিকে দু’হাত তুলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আল্লাহ্! ওগো আমার আল্লাহ! তোমার নামের সম্মান রক্ষা কর। আমরা তোমার নামে কুফুরীর বিপক্ষে লড়াই করতে এসেছি এবং তোমার কাছেই সাহায্য কামনা করি।
তারেক তার ফৌজ, দরিয়া হতে প্রায় এক মাইল পিছে রেখে ছিলেন। আর রডারিকের ফৌজকে সমুদ্রের তীরে আনতে চাচ্ছিলেন। যাতে তাদের পশ্চাদে থাকে সমুদ্র। তারেক তার সৈন্যবাহিনীর মাত্র কয়েক দল সম্মুখে রেখে বাকী সকল সৈন্য রেখেছিলেন পাহাড়ের ভেতর। তারেক লক্ষ্য করলেন রডারিকের ফৌজরা অতিদ্রুত নৌকা দিয়ে পুল তৈরী করছে।
“এদেরকে তো অত্যন্ত চঞ্চল মনে হচ্ছে।” তারেক ইবনে যিয়াদ আওয়াজ শুনতে পেলেন, ফিরে দেখলেন তার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে মুগীছে রূমী ও আবু জুরয়া তুরাইফ।
তারেক : আমরা এ ফৌজকে খুব তাড়াতাড়ি বিতাড়িত করব।
তারা যদি যুদ্ধের ক্ষেত্রেও এমন তেজী হয় তাহলে……। আবু জুরয়া বলতে বলতে নিশ্চুপ হয়ে গেল।
তারেকঃ তোমরা কি দেখছনা তাদের চঞ্চলতা ও তেজীর কারণ কি? লক্ষ্য কর, তাদেরকে কিভাবে বেত্রাঘাত করা হচ্ছে। তারা স্বেচ্ছায় ও উদ্দীপনায় কাজ করছে না বরং তাদের সালারের দোররা তাদেরকে করাচ্ছে। যুদ্ধের ময়দানেও তাদের সালার দোররা মেরে লড়াই করাবে?
তারেক ইবনে যিয়াদের দুই সালার গভীরভাবে লক্ষ্য করল, তারা দেখতে পেল তাদের জেনারেল বেত নিয়ে ঘুরাঘুরি করছে কেউ একটু অলসতা করলে তার পিঠে পড়ছে সপাং সপাং বেতের বাড়ি।
তারেক : যুদ্ধ হয় স্পৃহা-উদ্দীপনায়, বেত্রাঘাতে নয়। যে কওমের কর্তারা তাদের অধিনতদেরকে গোলাম মনে করে আর বাদশাহ হয়ে যায় প্রজাদের জন্যে ফেরাউন সে কওমের ধ্বংস অনিবার্য। উঁচু-নীচুর ভেদাভেদ কওমকে বিনাশ করে দেয়। আমাদের সিপাহীদের মাঝে প্রেরণা রয়েছে। জেনারেল, সিপাহী সকলের অন্তরে এক আল্লাহএক রাসূল। আমাদের মাঝে সমতার এটাই কারণ। কারো আল্লাহ বড় কারো ছোট এমন নয়, প্রাসাদ হোক ঝুপড়ী, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহ্ এক, আর বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহরই।
আবু জুরয়া তুরাইফ : কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ ফৌজ?
তারেক : তোমরা নিজ নিজ জায়গায় চলে যাও। আল্লাহ্ তায়ালা আমাদেরকে বিজয়ের এমন উপকরণ দান করেছেন যার বিন্দুমাত্রও আশা ছিল না। রাসূল (স) এর বাসারত মিথ্যে হতে পারে না, কিন্তু আমি শুধু খাব দেখার আদমী নই। যে আল্লাহকে তালাশ করে সেই আল্লাহকে পায়। আর আল্লাহ্ তাকেই সাহায্য করেন যে প্রচেষ্টা করে। এখন তোমরা নিজেদের অবস্থানে অটল-অবিচল থাক।
সারা রাত রডারিকের সৈন্য একত্রিত হলো। সকাল হবার সাথে সাথে দেখা গেল দরিয়ার তীরে প্রশস্ত ময়দানে একলাখ ফৌজ লড়াই এর প্রস্তুতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক লেনপোল লেখেন, তারেক ইবনে যিয়াদ ঘোড়ায় আরোহন করে তার ফৌজের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত উঁচু ও দৃঢ় স্বরে বললেন,
“ইসলামের মুজাহিদ ভাইয়েরা! তোমাদের সম্মুখে দুশমন আর পিছনে সমুদ্র। পলায়নের কোন রাস্তা তোমাদের জন্যে ভোলা নেই। তোমাদের সম্মুখে একটাই রাস্তা তাহলো বাহাদুরী ও বিজয়। দুশমনের সংখ্যাধিক্যে ভয় পেওনা। ভয় কর ঐ পরাজয়কে যা তোমাদের জন্যে লাঞ্ছনা-গুঞ্জনা বয়ে আনবে।”
ইউরোপীয়ান একজন ইতিহাসবিদ লেখেন, মুসলমান ফৌজরা বজ্রের মত গর্জে উঠে শ্লোগানে মাতোয়ারা করে তুলল,
“আমরা তোমার সাথে রয়েছি তারেক! আমরা তোমার সাথে রয়েছি।”
স্পেন ফৌজের পক্ষ হতে এলান হলো, “তোমরা যারাই হও ফিরে যাও। স্পেনের শাহানশাহর বাদশাহী এক সমুদ্র হতে অপর সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত। তার তলোয়ারের ভয়ে পুরো ইউরোপ প্রকম্পিত হয়। তোমাদের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করছেন তোমরা ফিরে যাও তাহলে তার তলোয়ার কোষবদ্ধ থাকবে তা নাহলে তোমরা নিজদের পরিণাম চিন্তে কর।”
তারেক ইবনে যিয়াদকে বুঝিয়ে দেয়া হলো তারা কি ঘোষণা করছে, তারেক ইবনে যিয়াদ তার জবাব বাতলিয়ে দিয়ে বললেন স্পেনী ভাষায় তা এলান করার জন্যে। এলানের জওয়াব দেওয়ার জন্যে আওপাস ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে উঁচু স্বরে বলল,
“স্পেনের শাহানশাহকে তারেক ইবনে যিয়াদের সালাম। শাহান শাহে মুয়াজ্জম! আমরা ফিরে যেতে পারি না, আমরা আমাদের তাবৎ জাহাজ-কিস্তি জ্বালিয়ে দিয়েছি। আমরা শাহানশাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি যে তিনি আমাদের জন্যে সমুদ্রে নৌকার পুল তৈরী করে দিয়েছেন। আমরা আল্লাহর নির্দেশে এসেছি, এখন স্পেনের বাদশাহর হুকুমে ফিরে যেতে পারি না।”
অপর প্রান্ত হতে বর্বর ভাষায় এলান হলো,
শাহান শাহে রডারিকের মুকাবালার জন্যে সম্মুখে অগ্রসর হলে আল্লাহ তোমাদের কোন সাহায্য করতে পারবে না। তোমরা হলে দস্যু কওম, আমরা তোমাদেরকে শেষবারের মত……
কথা শেষ না হতেই মুসলমানদের কামান হতে তিনটি তীর গিয়ে এলানকারী জেনারেলের বুকে বিদ্ধ হলো। সে ঘোড়া হতে নিচে পড়ে গেলে স্পেনের এক ঘোড় সোয়ার তরিঘড়ি করে মুমূর্ষ জেনারেলকে নিজের ঘোড়ায় উটিয়ে নিয়ে গেল।
***
রডারিক সৈন্য বাহিনীর সম্মুখে ছিল না, তার পতাকা পিছনে দেখা যাচ্ছিল। সে তার সফেদ ঘোড়ায় সোয়ার ছিল। সে যখন জানতে পারল, মুসলমানরা তার এক জেনারেলকে হত্যা করেছে তখন সে আক্রমণ করার নির্দেশ দিল। যুদ্ধের নিয়ম নীতি ও পরিচালনার ব্যাপারে তার অত্যন্ত সুনাম ছিল। সে যে প্লান বানিয়েছিল তার জেনারেলরা তা পরিপূর্ণভাবে রপ্ত করে নিয়েছিল।
