পরিশেষে ঐ রাত্রেই পরিকল্পনা করে কাজ শুরু হয়ে গেল। একজন গোথা জেনারেল রাজী হচ্ছিল না। সে রডারিকের অপেক্ষায় অপেক্ষমান ছিল। জেনারেল মূলত বাদশাহর চাটুকার ছিল। মেরীনা জাদু প্রয়োগ করল। সে তাকে এক নব যৌবনা খুব সুরত ললনার ঝলক দেখাল। জেনারেল কাবু হয়ে গেল এবং ঐ ললনীকে তার সাথে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চাইল।
মেরীনা : বাদশাহ্ আপনার জন্যে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এত সুন্দর লাড়কী সে আপনার কাছে রাখতে দেবে না। বরং আমি লাড়কীকে বাদশাহর কাছে পৌঁছে দেব বাদশাহ সাথে করে নিয়ে যাবে তারপর লাড়কীকে আমি ঠিকমত বুঝিয়ে দেব সে পরে আপনার কাছে চলে আসবে। বাকী আমি আপনাকে যা বললাম তা করার জন্যে প্রস্তুত হোন। রডারিক যদি নিহত হয় তাহলে নতুন বাদশাহকে বলে আপনাকে বিশাল জায়গীরের অধিকারী বানিয়ে দেব।
মেরীনা ঐ ইহুদী তরুণীকে বলেদিল ঐ জেনারেলের প্রতি কোন ভরসা নেই। সে প্রতারণা করতে পারে। মেরীনা ঐ তরুণীর হাতে সুফুফ (চূর্ণ ঔষধ) দিয়ে বলল, রাত্রে জেনারেল কে যখন শরাব পান করাবে তখন শরাবের মাঝে এ সুফ মিশিয়ে দেবে। সুফুফের প্রতিক্রিয়াতে সে মেধাগত ও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধের সময় জেনারেলকে অকেজো করে রাখা।
এ সুফুফ যদি রডারিককে পান করান যেত তাহলে ইহুদী ও গোথাদের সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব ছিল না। কেননা সে কোন কিছু পানাহার করার পূর্বে দু’জন ব্যক্তিকে পানাহার করিয়ে তা পরীক্ষা করে নিত। তার একান্ত লোকেরা তার খানা-পিনার ইন্তেজাম করত। ঐতিহাসিকরা লেখেন, সে যে অত্যন্ত জুলুমবাজ ও নির্যাতনকারী ছিল তা জানত। তাই সর্বদা মাজলুমদের প্রতিশোধের আশংকায় থাকত।
***
গোথা ও ইহুদী সর্দাররা আওপাসের সাথে পরামর্শ করে যে পরিকল্পনা করেছিল সে অনুপাতে প্রায় দেড়শত নওজোয়ান তৈরী করা হলো। রডারিক টলেডোতে পৌঁছার পর নওজোয়ানদেরকে তার সামনে পেশ করা হলো যে এরা স্বেচ্ছায় ফৌজে শামিল হতে চায়। এরা সাধারণ ফৌজ নয় জানবাজ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। রডারিককে আরো বলা হলো এরা রাতের যুদ্ধা, রাতের আঁধারে হামলাকারীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করবে।
রডারিক যেদিন টলেডোতে পৌঁছুল তার আগের দিন আওপাস ফিরে গিয়েছিল। সেদিন রাতেই গোথা গোত্রের সাথে সম্পর্ক যুক্ত কমান্ডাররা গোপনে বৈঠকে মিলিত হয় তার মাঝে ইহুদীরাও ছিল। তারা নির্জনে সলা-পরামর্শ করে সবাই যার যার মত ফিরে যায়।
পরের দিন রডারিক যখন একলাখ ফৌজীবাহিনী (যার মাঝে কয়েক হাজার ছিল ঘোড় সোয়ার) নিয়ে হামলাকারীদেরকে স্পৈন হতে বিতাড়নের মানসে তুফানের বেগে ছুটছিল তখন সিপাহীরা হামলাকারীদের ব্যাপারে একে অপরের থেকে নানান ধরনের আশ্চর্যজনক কথা-বার্তা শুনছিল।
“তিতুমীরের মত বাহাদুর জেনারেল তাদেরকে দেখেই পলায়ন করেছিল।”
“শোনা যায় তারা মাত্র কয়েক হাজার কিন্তু এক লাখের চেয়ে বেশী শক্তিশালী।”।
“তাদের কোন তীর ব্যর্থ হয় না। বাতাসে তীর ছেড়ে দেয় তারপর তীর নিজেই একজনের বুকে এসে বিদ্ধ হয়।”
“তাদের একজন পায়দল, চারজন-ছয়জন সোয়ারীর মুকাবালা করে এবং একে একে সবাইকে ওয়ার করে ফেলে।”
“স্বয়ং তিতুমীর বাদশাহকে বলেছে তারা আদমী নয়, জিন-ভূত।”
“শোনা যায় তারা কিন্তীতে আসেনি, এত বড় সমুদ্র সাঁতার কেটে এসেছে।”
“আমি তো এমনও শুনেছি যে তারা সাঁতার কাটেনা বরং পানির উপর হেঁটে চলে।”
রডারিকের ফৌজ রওনা হবার পর হতে তাদের মাঝে এ ধরনের নানা কথা আলোচনা হচ্ছিল। একজন একথা শুনে তার সাথে আরো তিন কথা যোগ করে অন্যের কাছে বর্ণনা করত। ফলে ক্রমেই ফৌজের মাঝে ভয়-ভীতি বাড়ছিল। তবে আরো একটা কথা তাদের মাঝে চর্চা হচ্ছিল তা হলো, তারা যেমনিভাবে চরম জালেম ঠিক তেমনিভাবে অত্যন্ত দয়ালু।
ইহুদী ও গোথারা যে পরিকল্পনা করেছিল সে মুতাবেক ফৌজের মাঝে ভীতি সঞ্চার করা হচ্ছিল। আর এসব কথা ফৌজের মাঝে চর্চা করছিল ঐ দেড়শত লোক যাদেরকে বিশেষ যুদ্ধবাজ হিসেবে ফৌজে শামিল করা হয়েছিল। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সৈন্যদের মাঝে এসব কথা আলোচনা করে প্রচার করছিল।
এক ইংরেজ ঐতিহাসিক তার গ্রন্থ “মুসলমানদের ইতিকথা”-তে লেখেছেন, স্পেনের ফৌজের ওপর এটা একটা মানসিক যুদ্ধ ছিল যা তারেক ইবনে যিয়াদ সৃষ্টি করেছিলেন। তারেক ইবনে যিয়াদ আওপাসকে নির্দেশ দিয়ে ছিলেন সে যেন স্পেন ফৌজের মাঝে এমন কিছু লোক শামিল করে দেয় যারা মুসলমানদের ব্যাপারে ত্রাস সৃষ্টি করবে। আওপাস ইহুদী ও গোথা সর্দারদের কাছে এ প্রস্তাব পেশ করলে তারা তার বন্দোবস্ত করে দেড়শত লোক রডারিকের ফৌজে শামিল করেছিল।
***
একদিকে মুসলমানদের তাবুতে বিজয়ের জন্যে দোয়া হচ্ছিল অপরদিকে ইহুদী। ও গোথাদের ইবাদতগাহে রডারিকের পরাজয়ের জন্যে প্রার্থনা হচ্ছিল। ইহুদী ও গোথা সম্প্রদায় পরস্পরে আলোচনা করচিল রডারিক যদি নিহত হয় বা পরাজিত হয়, তাহলে রাজত্ব তাদের। কারণ হামলাকারীরা লুটতরাজ করে ফিরে যাবে।
রডারিকের ফৌজ সমুদ্র তীরে পৌঁছে গিয়েছিল। তারেক ইবনে যিয়াদ খবর পেয়ে ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে একটা পাহাড়ে গিয়ে চড়লেন, সমুদ্র তীরে বহুদূর পর্যন্ত। তিনি মানুষ আর ঘোড়া দেখতে পেলেন। এত পরিমাণ ফৌজ তিনি ইতিপূর্বে আর কোনদিন দেখেননি। তারেককে পূর্বেই বলা হয়েছিল রডারিকের সৈন্য সংখ্যা এক লাখের মত হবে।
