রডারিক : তুমি কি তোমার চেহারা আমাকে দেখানোর উপযুক্ত মনে কর? তোমার চেয়ে অর্ধেক ফৌজের হাতে পরাজিত হয়ে আমার এস্তেকবালে দাঁড়িয়েছ, ধিক তোমাকে!
তিতুমীর : শাহান শাহে মুয়াজ্জম! জেনারেল একাকী যুদ্ধ করে না। আমি আমার ফৌজের আগে পলায়ন করিনি। ফৌজরা প্রথমে পলায়ন পদ হয়েছে। আমার অপরাধ শুধু এতটুকু যে, সেখানে মৃত্যু বা জঙ্গী কয়েদী হবার জন্যে একাকী দাঁড়িয়ে থাকিনি।
রডারিক তার কথায় আরো গর্জে উঠল এবং তাকে তিরস্কার করল। তিতুমীর কোন সাধারণ জেনারেল ছিল না। স্বয়ং রডারিক তার অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও সাহসীকতার তারীফ করত। আর তিতুমীর রডারিকের দুর্বলতার ব্যাপারে ভাল জানত।
তিতুমীর : বাদশাহ নামদার! আপনি মহলে গিয়ে আরাম করুন, এক লাখ ফৌজ আমাকে সোপর্দ করুন। আমি একদিনের মাঝে আক্রমণকারীদের পদতলে পৃষ্ট করে সমুদ্রপাড়ে পৌঁছে যাবো এবং এ হামলাকারীরা যেথা হতে এসেছে সেথায় আপনার পতাকা উড্ডীন করব। আমাকে তিরস্কার করার পূর্বে শাহান শাহ্ আমার কাছে যে পরিমাণ ফৌজ ছিল সে পরিমাণ ফৌজ নিয়ে যান, তাহলে দেখা যাবে বীরত্ব। এক লাখ ফৌজ কোন অযোগ্য-বুজদিল জেনারেলের কাছেও যদি থাকে তাহলে সেও হুংকার ছাড়তে পারে।
তিতুমীরের কাছে হয়তো রডারিক কোন বিষয়ে দুর্বল ছিল তা নাহলে তার এ উদ্ধ্যতোর জন্যে রডারিক জালেম বাদশাহ্ অবশ্যই তাকে শাস্তি দিত। রডারিক চুপ, করে থেকে তিতুমীরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। দেখতে পেল তার শাহী মহলে খুব সুরত আওরত মেরীনা তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রডারিক মেরীনার দিকে লক্ষ্য করতেই সে বাদশাহর সামনে কুর্নিশ করল।
মেরীনা : শাহানশাহ! আমার জন্যে কি নির্দেশ রয়েছে।
রডারিক : তুমি জানো তোমার প্রতি কি নির্দেশ রয়েছে। নতুন কিছু আছে কি?
মেরীনা : হ্যাঁ শাহান শাহ্! কম বয়সী, খুব সুরত অর্ধফোঁটা এক কলি রয়েছে … আমি আপনার সাথে যাব?
রডারিক : ঐ কলি সাথে নিয়ে এসো, তাছাড়া যদি আরো থাকে তাকেও নিয়ে এসো। আওরতদের গাড়ী পিছনে রয়েছে।
মেরীনা শাহ্ রডারিককে গভীর ভাবে লক্ষ্য করে সম্মান জানিয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর তাবুর ক্যানভাসযুক্ত দেয়াল দাঁড় করিয়ে তার ওপর শামিয়ানা টাঙিয়ে দেয়া হলো এবং তার মাঝে মখমল বিছিয়ে শাহী কুরসী রাখা হলো যা ছিল তখতে তাউছের ন্যায়। এভাবে অল্প ক্ষণের মাঝে শামিয়ানার নিচে বাদশাহ্ রডারিকের দরবার তৈরী করা হলো। রডারিক অশ্ব হতে অবতরণ করে কাপড়ের জাকজমক পূর্ণ সে দরবারে উপস্থিত হলো। চলতে চলতে রডারিক তার পিছনের এক ব্যক্তির কানে কানে কি যেন বলল!
“সে উপস্থিত রয়েছে শাহান শাহে আলী মাকাম। ঐ ব্যক্তি একথা বলে পিছনে এক ব্যক্তির কাছে চলে গেল।”
রডারিক যার কথা জিজ্ঞেস করেছিল সে সত্তর ঊর্ধ্ব এক জাদুকর। তার দাড়ি লম্বা, দুধের মত সফেদ। কাঁদ হতে টাকনু পর্যন্ত লম্বা চোগাপরিহিত। মাথায় গোল টুপি, গলায় ও হাতে মুর্তির মালা, আরেক হাতে বাদামী রং-এর বড় লাঠি।
ঐ ব্যক্তি ধীরে ধীরে এসে রডারিকের কাছে পৌঁছল। জাদুকরের পোষাক আশাক, বয়স ও চেহারা দেখে সম্মানী মনে হচ্ছিল। কিন্তু রডারিক তার পাশের কুরসীতে বসতে পর্যন্ত তাকে বল না। তাকে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে রাখল।
রডারিক : হে গণক! তুমি কি ভবিষ্যৎ এর ব্যাপারে ভয়াবহ কোন কিছু দেখতে পাচ্ছ?
গণক : হ্যাঁ। বাদশাহ নামদার! দেখছি। অস্পষ্ট মেঘাচ্ছন্ন অবস্থা দেখতে পাই তা কখনো খুব গাঢ় হয় আবার কখনো তাতে অন্য কিছু দেখতে পাই।
রডারিক : যা দেখতে পাও তা কি?
গণক : বাদশাহ্ নামদার যে দৃশ্য দুর্গের মাঝে দেখেছিলেন, সে দৃশ্য দেখতে পাই।
রডারিক : তোমাকে যে দৃশ্যের কথা বলেছিলাম তা কি তোমার পূর্ণ মাত্রায় স্মরণ আছে?
গণক : তা আমার পূর্ণ মাত্রায় স্মরণ রয়েছে। আপনার এ গোলামের স্মৃতি শক্তি অত্যন্ত প্রবল।
রডারিক শাহী প্রতাপে বলল, তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছি কেবল তার জবাব দাও। ফালতু কথা শুনার সময় আমার নেই। তোমাকে যা শুনিয়ে ছিলাম যদি স্মরণ থেকে থাকে তাহলে বল, তা বাস্তব রূপ নিবে না তো?
গণক : এক লাখ ফৌজের সামনে কোন হাকীকত টিকবে না। এরা তো সমুদ্রের তরঙ্গ মালার ন্যায় কোন বাধা মানে না।
রডারিক : আরেকটি কথা বল তাহলো এক নওজোয়ান লাড়কীকে আমি খাবে দেখি।
গণক : তাকে কি অবস্থায় দেখেন শাহান শাহ্!
রডারিক : মস্তকহীন অবস্থায় সে এসে আমার সামনে দন্ডায়মান হয়। তারপর পলক ফেলতেই দেখা যায় তার শরীরে মাথা রয়েছে। মিট মিট করে আমাকে দেখতে থাকে। আমি ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি… তার কিছুক্ষণ পরে লাড়কীর আওয়াজ শুনতে পাই… “তোমার রাজত্বের ওপরও ঘোড়া দৌড়ান হবে। তোমার নাম নিশানা .জে পাওয়া যাবে না।“ লাকীর ঠোঁট নড়ে না কিন্তু আওয়াজ শুনা যায়।
গণক : শাহানশাহ্ ঐ লাড়কীকে চিনেন কি? এমন কোন লাড়কী আপনার সান্নিধ্যে এসেছে কি?
রডারিক : হ্যাঁ, পামপিলুনাতে আমার সান্নিধ্যে এসেছিল। সে বিদ্রোহী সর্দারের কম বয়সী বেটী ছিল। আমি তাকে কাছে রেখে ছিলাম তারপর একরাতে একটা গোস্তাখী করার দরুন তলোয়ারের এক কোবে তার শিরোচ্ছেদ ঘটিয়েছি।
রডারিকঃ এটা কোন খারাপ ফাল কি না? আর একটা কথা বলি, আমি কাউকে ভয় পাইনা কিন্তু খাবের মাঝে ঐ লাড়কীকে দেখার সাথে সাথে ভয় পেয়ে যাই।
