তারেকের মূল শক্তি হলো তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাম অন্তরে নিয়ে কাফেরের মুকাবালায় বেরিয়ে ছিলেন। এ দুটো পবিত্র নাম তার অন্তরের মনিকোঠায় দানা বেধে ছিল। একারণেই স্বপ্নে রাসূল (স) তাকে সুসংবাদ দিয়েছিলেন “বিজয় তোমাদের জন্যে অপেক্ষমান তবে তা তোমরা পাবে শর্ত হলো আল্লাহর রশি শক্তভাবে ধরে থাকবে।”
এটা তো স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতি… যদি তোমরা দৃঢ়পদ থাক তাহলে তোমাদের বিশজন, কাফেরদের দু’শ জনের উপর বিজয়ী হবে আর তোমরা যদি একশত দৃঢ় থাক তাহলে তোমরা এক হাজার কাফেরের বিপক্ষে বিজয়ার্জন করবে। (সূরা আনফাল)
তারেক ইবনে যিয়াদ ঐ সকল অটল-অবিচল ও স্থিতিশীলদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যাদেরকে রাসূলে খোদা ছাড়া কুরআনে কারীমও বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছে।
তারা কেল্লা কজা করে ফেলল। দরজা একটা ভাঙ্গার সাথে সাথে বাঁধ-ভাঙ্গা বন্যার ন্যায় মুসলমানরা ভেতরে প্রবেশ করল। কেল্লার ফৌজরা মুকাবালা তো করল ঠিকই কিন্তু তাতে উদ্দীপনা ও প্রাণ ছিল না। কেল্লার জিম্মাদার দ্রুত আত্মসমর্পণ করে ভয়াবহ খুন-খারাবীর হাত থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে নিল।
তারেক ইবনে যিয়াদ প্রথমে এলান করার জন্যে হুকুম দিলেন, কেউ যেন পলায়ন না করে। সকলে নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করবে। তাদের জান-মাল ও ইজ্জতের পূর্ণ হিফাজত করা হবে।
মানুষ ভীত হয়ে পলায়নের রাস্তা খুঁজছিল। লাড়কীদের বাবা-মা তাদেরকে গোপন করছিল। আর যাদের ঘরে ধন-দৌলত ছিল তারা তো সাথে নিয়ে পলায়নের চিন্তা-ভাবনা করছিল। তারেকের হুকুম তাদের পালাবার দ্বাররুদ্ধ করে দিল। তারেকের দ্বিতীয় নির্দেশ ছিল কেল্লার তাবৎ ফৌজকে পৃথক করে আলাদা করে দাঁড় করানোর জন্যে।
তারেক আরো নির্দেশ দিলেন, “আর শহরবাসীকে সতর্ক করে দাও, কেউ যেন কোন ফৌজকে তার ঘরে লুকিয়ে রাখার মত ভুল না করে। কারো ঘর থেকে যদি কোন স্পেনী ফৌজ বের হয় তাহলে সে বাড়ীর পুরো সদস্যকে যুদ্ধ কয়েদী আর তার ঘরের তাবৎ ধন-সম্পদ মালে গণিমত হিসেবে ধার্য হবে।
তামাম ফৌজকে জঙ্গী কয়েদী বানিয়ে তাদেরকে ঐ কেল্লাতেই রাখা হলো।
***
কেল্লা বেষ্টিত শহর হাতে আসাতে এক বড় প্রশস্ত উপত্যাকা তারেক ইবনে যিয়াদের অধিকারে আসল। সবুজ-শ্যামল বনানীতে ঘেরা এলাকা তার অদূরেই। সমুদ্র। তারেক ইবনে যিয়াদ কেল্লাতে অবস্থান করে সমুদ্র পাড়ে তাবু স্থাপন করে ফৌজকে সদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিলেন।
বিজিত কেল্লা হতে এত বিপুল পরিমাণ তীর-বর্শা, ঢাল সংগ্রহ হয়েছিল যা বড় ও দীর্ঘ মেয়াদী যুদ্ধের জন্যে যথেস্ট ছিল। সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় যা হস্তগত হয়েছিল তা হলো দু’হাজার অশ্ব। এ দু’হাজার ঘোড়া তাদেরকে দিলেন, যারা ছিল শাহ্ সোয়ারা।
তারেক ইবনে যিয়াদ এখন সদা ব্যস্ত। তার কাছে রয়েছে মাত্র বার হাজার লস্কর যার মাধ্যমে এক লাখ ফৌজকে পরাজিত করতে হবে। এক লাখ সৈন্য তো এত বেশী ছিল যে বার হাজার ফৌজকে পদতলে পৃষ্ট করে মারতে পারত। এতবিশাল বাহিনীকে সেকি পরাজিত করতে পারবে? এ প্রশ্ন তারেককে চরমভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।
একদিন তারেক ইবনে যিয়াদের চেহারাতে চিন্তার ছাপ দেখে জুলিয়ন বলল,–
ইবনে যিয়াদ! তোমাকে তোমাদের রাসূল বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাছাড়া স্পেনবাসীদের পক্ষ হতে যে দোয়া পাচ্ছ তাও খোদার দরবারে পৌঁছেছে। তুমি আবার এমনটি বলনা যে যারা মুসলমান নয় তাদের দোয়া-আহ্বান খোদা শুনেন না। খোদা তার অপর বান্দা কর্তৃক নির্যাতিত বান্দার দোয়া (আহ্বান) অবশ্যই শ্রবণ করেন।
জুলিয়নের এ বক্তব্য তারেক ইবনে যিয়াদের এ নির্দেশের ব্যাপারে ছিল যে তিনি হুকুম দিয়েছিলেন, যাতে জঙ্গী কয়েদীদের সাথে ভাল ব্যবহার করা হয় আর তার চেয়ে সে বেশী সদ্ব্যবহার করা হয় শহরবাসীদের সাথে এবং নিজেদের কর্ম দ্বারা যেন তাদেরকে আশ্বস্ত করান যায় যে, মুসলমানরা তাদের ইজ্জত-আব্রুর মুহাফিজ এবং প্রত্যেককে তার যোগ্যতানুসারে প্রাপ্য প্রদান করা হবে। তারা যা উপার্জন করবে তা তাদের থাকবে তবে তাদের মান মুতাবেক তাদের থেকে কর উসুল করা হবে।
যে এলাকা তারেক ইবনে যিয়াদ করতলগত করে ছিলেন তাতে কার্ডিজ ছাড়া ও আরো বেশ কিছু ছোট বড় বসতি ছিল। তার মাঝে দু’তিনটি বসতি হামলাকারীদের ভয়ে বিরান হয়ে গিয়েছিল। তারা মনে করে ছিল হামলাকারীরা রডারিকের মত কোন জালেম বাদশাহ্। তাদের ফৌজরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে, লুটতরাজ করে জওয়ান লাড়কীদেরকে নিজেদের দাসী-বাঁদীতে পরিণত করবে এবং তামাম গবাদী পশু ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। তাই তারা তাদের বাল-বাচ্চা ও গৃহপালিত পশু সাথে নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে ছিল। কিন্তু হামলাকারী ফৌজ তাদের ঘর বাড়ীর দিকে ফিরেও তাকাইনি।
জুলিয়ন : এসব লোক সকলেই তোমার সাথে রয়েছে ইবনে যিয়াদ! তারা তোমার বিজয় কামনা করছে। তারা আসমানের দিকে হাত তুলে ফরিয়াদ করছে, যাতে রডারিকের বাদশাহী বরবাদ হয়ে যায়।
তারেক ইবনে যিয়াদ : বিজিত লোকদের সাথে মানবতা দেখান ও সদ্ব্যবহার করা এটা আমার নির্দেশ নয় বরং স্বয়ং আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূল (স)-এর হুকুম।
***
বাদশাহ্ রডারিক রাজধানী টলেডোতে অবস্থান না করে এক লাখ ফৌজ নিয়ে সরাসরি অগ্রসর হচ্ছিল। সে প্রথমে বার্তা পাঠিয়ে ছিল টলেডোতে তার আপন মহলে যাবে না, শহরের বাহিরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে রওনা হবে। সে যখন টলেডোর উপকণ্ঠে উপনীত হলো তখন বিপুল সংখ্যক সরকারী কর্মচারী ও শুভাকাঙ্খী তার ইন্তেজারে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের মাঝে তার পরাজিত জেনারেল তিতুমীরও ছিল।
