সম্মুখে একটা মজবুত কেল্লা ছিল। তিতুমীর ফৌজের কিছু ফৌজ পলায়ন করে সেখানে আশ্রয় নিয়ে কেল্লাবাসীর সংখ্যাধিক্য করেছিল ফলে কেল্লাবাসী কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিল এবং খুসী হয়েছিল কিন্তু তিতুমের ফৌজরা কেল্লাবাসীদের যুদ্ধের স্পৃহা কমিয়ে দিয়েছিল। বর্বররা তাদের মাঝে আতংক সৃষ্টি করে দিয়েছিল। পরাজিত সৈন্যরা একথা কখনও বলত না যে তারা নিজেরা বুজদিল কিন্তু হামলাকারীরা যে অত্যন্ত শক্তিশালী তা প্রচার করত। তিতুমিরের ফৌজরা কেল্লাতে প্রবেশ করতেই আওয়াজ তুলে দিয়ে ছিল,
হামলাকারীরা মানবরূপী জিন, ভূত বৈ কিছু নয়। নিজেদের জীবনের বিন্দুমাত্র পরওয়া করে না। আমরা স্বচোখে দেখলাম তাদের কাছে একটাও ঘোড়া নেই, তারপর জানিনা কোথা থেকে যেন বিপুল সংখ্যক ঘোড় সোয়ার আমাদের পশ্চাৎ হতে এসে উপস্থিত হল। আসমান থেকে আমাদের ওপর তীর বর্ষিত হতে লাগল। একেকটা তীর আমাদের একেকজন আদমীকে হালাক করে দিল।
তারা সংখ্যায় আমাদের অর্ধেকও ছিল না।
আর তাদের ধ্বনী! … যেন বজ্রপাত হচ্ছিল।
এ ভীতি কেল্লা অতিক্রম করে শহরের মানুষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছল। শহরে প্রার্থনা হতে লাগল ঐ জালেম হামলাকারীরা যেন এদিকে না আসে। এটা এমন বাস্তব বিষয় যে খোদ খ্রীস্টান ঐতিহাসিকরাও উল্লেখ করেছেন যেমন লেইনপোল লেখেছেন, “মুসলমানরা সংখ্যায় খুবই কম ছিল কিন্তু তারা অসাধারণ বীর বাহাদুর, সাহসী ও জীবন উৎস্বর্গকারী ছিল। তাদের নিয়ন্ত্রণ এমন এক সিপাহসালারের হাতে ছিল যাকে ইতিহাস নির্দ্বিধায় ‘হিরো’ হিসেবে অবহিত করে। যুদ্ধ শক্তি, ভাল অস্ত্র শস্ত্র, সংখ্যার বিপুলতা তো স্পেনের ফৌজদেরও ছিল কিন্তু যে স্পৃহায় মুসলমানরা সজ্জিত ছিল তা স্পেন ফৌজের কাছে ছিল না।”
মুসলমানরা আল্লাহর হুকুমে আর স্পেনবাসীরা বাদশাহর হুকুমে যুদ্ধ করছিল। মুসলমানরা তাকবীর দিচ্ছিল আল্লাহু আকবার, আল্লাহ্ সবচেয়ে বড়। এ ধ্বনী তাদের অন্তরে গভীরতম প্রদেশ থেকে বেরুচ্ছিল। এ ধ্বনীর মাঝে যে ভীতি ছিল তা ছিল আল্লাহর নামের। স্পেনীদের কোন ধ্বনী ছিল না। আর থাকলেও তা ছিল শাহান শাহে উন্দুলুস জিন্দাবাদ। এটা একটা প্রাণহীন ধ্বনী। এটা একটি প্রথাগত তাকবীর, এতে উদ্দীপনা স্পৃহা কিছুই নেই।
***
সবুজ-শ্যামলে ঘেরা। চতুর্দিক কুদরতের সৌন্দর্যের শোভায় সুশোভিত। এখনো প্রভাত আলো পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়নি এমন সময় কেল্লার প্রাচীরে দাঁড়িয়ে এক সেপাহী চিৎকার করে বলে উঠল “তারা এসে গেছে” তারপর এ আওয়াজে কয়েকজন সেপাহী একসাথে চিৎকার করে উঠল এ শব্দ আপনা আপনিই পুরো পল্লীতে ছড়িয়ে পড়ল।
কেল্লার জিম্মাদার দৌড়ে গিয়ে প্রাচীরে চড়ে মুসলমান লস্কর আসতে দেখল। সে তিতুমীরের মত বিজ্ঞ জেনারলেকে এ লস্করের কাছে পরাজিত হয়ে পলায়ন করতে দেখেছে। কিছুদিন তিতুমীর এ কেল্লাতে অবস্থান করেছিল এবং এমন আঙ্গিকে যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছিল তাতে কেল্লার জিম্মাদারের ভেতর ভীতির সঞ্চার হয়ে ছিল। সে ভীতি সঞ্চারক জীন-ভূতের লস্কর এখন তার সম্মুখে উপস্থিত। কেল্লার জিম্মাদার প্রাচীরের ওপর থেকে হুকুম দিল, কেল্লার দরজা ভালকরে বন্ধ করে দাও এবং প্রতিটি দরজার সামনে পূর্ণ প্রস্তুত থাক। ..
তীর আন্দাজ ও বর্শাওয়ালারা প্রাচীরের ওপর পৌঁছে গেল। দরজা ভেতর থেকে আরো ভাল করে বন্ধ করে প্রতিটি দ্বারে বিপুল সংখ্যক ফৌজ অবস্থান নিল।
মুসলমানরা অতিদ্রুত এসে কেলার চারপাশে অবস্থান নিয়ে কেল্লা ঘিরে ফেলল। তারেক ইবনে যিয়াদ স্পেনী জবানে এলান করালেন, কেল্লার দরজা খুলে দিয়ে আত্মসমর্পণ কর। যদি আমাদের একজন ফৌজও মারা যায় আর আমরা যদি দরজা ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করি তাহলে তোমাদের অবস্থা ভয়াবহ হবে। আর যদি স্বেচ্ছায় দ্বার খুলে দাও তাহলে সদ্ব্যবহার করা হবে। আমরা অবরোধ লম্বা করব না। আজকের সূর্য অস্ত যাবার পূর্বেই আমরা কেল্লাতে প্রবেশ করব।
কেল্লার দরজা হতে আওয়াজ এলো, তোমাদের সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে, পারলে হিম্মত করে নিজেরা দরজা খুলো।
তারেক ইবনে যিয়াদ তার ঘোষণা পূণরায় দেয়ার প্রয়োজন মনে করলেন না, “তিনি তার নিজের ব্যাপারে ঠিকই বলেছিলেন, “আমি ধৈর্য হারা যুবা।”
তারেক : কেল্লা ভেঙ্গে ফেল।
কেল্লা কিভাবে ভাঙতে হয় মুসলমানরা তা ভাল করে জানত। সাথে সাথে কুড়াল ও হাতুড়ী নিয়ে সদর দরজার কাছে তারা উপস্থিত হলো। ওপর হতে তাদের উপর বর্শা ও তীর বৃষ্টি নিক্ষেপ হলো কিন্তু বর্বররা তীর-বর্শাকে ভয় করত না। মুসলমানদের তীরন্দাজরা যারা দরজা ভাঙতে ছিল তাদের পশ্চাতে ছিল। তাদের কামান ছিল খুব শক্তিশালী ফলে তীর অনেক দূর পর্যন্ত যেত। তারা দুশমনের তীব্র আন্দাজ ও বর্শা নিক্ষেপকারীদের ওপর অবিরামগতিতে তীর নিক্ষেপ করতে লাগল। দু’তিনজন দুশমনের তীর আন্দাজ প্রাচীর থেকে নিচে পড়ে গেল। বাকীরা লুকিয়ে পড়ল।
কেল্লার দরজা ছিল চারটি। প্রতিটি দরজাতেই বর্বররা উম্মাদের ন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তীর বর্শার কোন পরওয়া ছিল না। দরজাতে কুড়াল-হাতুড়ী দ্বারা আঘাত হানছিল প্রবল বেগে। এটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সাহসীকতার কাজ ছিল। কোন সিপাহসালার তার ফৌজকে এত ঝুঁকিপূর্ণ ও আশংকাজনক অবস্থার সম্মুখীন করত না কিন্তু তারেক ইবনে যিয়াদের মূলনীতি হলো “স্বয়ং নিজে ভীতি প্রদ হয়ে যাও তাহলে সব ভীতি ও খত্রা দূর হয়ে যাবে।”
