রডারিক তার জেনারেল ও মুহাফিজদের সাথে সেখান থেকে দ্রুত বেগে পলায়ন করল।
***
তারপর রডারিক ধর্মগুরু, পন্ডিত ও জায়গীরদারকে জিজ্ঞেস করতে লাগল ঐ দুর্গের রহস্য কি এবং যে যুদ্ধের দৃশ্য দেখা গেল তার উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য কি। কেউ তাকে যথাযথ জবাব দিতে পারল না। কেউ তাকে তার বীরত্ব ও বাহাদুরীর তারীফ করল কেউ আবার দুশমনের বিপক্ষে বিজয়ের সুসংবাদ গুনাল। কেবল একজন জাদুকর তাকে কিছু সাফ জওয়াব দিল।
জাদুকর : শাহানশাহর সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। এটা তো কেউ বলতে পারে না যে হিরাক্লিয়াস সে দুর্গ কেন নির্মাণ করেছিলেন। হয়তো হতে পারে তাতে শয়তানের কোন ক্রিয়া-প্রক্রিয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। দুর্গ না খোলাটাই আপনার জন্যে সমীচীন ছিল। লড়ায়ের যে ইশারা আপনি পেয়েছেন তা ভাল ইঙ্গিত বহন করছে না।
রডারিক : আমরা কি সে অশুভ পরিণামের হাত থেকে বাঁচতে পারি না?
জাদুকর : তা একটা তরীকাতেই সম্ভব। তাহলে আপনি যখন কোন যুদ্ধে যাবেন তখন এত বিপুল পরিমাণ সৈন্য সংখ্যা সাথে নিয়ে যাবেন যাতে দুশমন দেখেই পলায়ন করে, বা যুদ্ধ করা ব্যতিরেকেই আত্মসমর্পণ করে।
এ ঘটনার পর পামপিলুনা এলাকাতে বিদ্রোহ হয়। রডারিক বিশাল ফৌজী বাহিনী নিয়ে গিয়ে বিদ্রোহ দমন করে বিদ্রোহীদেরকে চিরতরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয় এবং সেখানেই খবর পায় আফ্রিকা স্পেনের উপর হামলা করেছে। তিতুমীর তাকে সংবাদ দিয়েছিল হামলাকারীদের সংখ্যা সাত/আট হাজার। রডারিক বিপুল সংখ্যাক ফৌজ সংগ্রহের ইন্তেজাম করে সেথা হতে দারুল হুকুমত টলেডোর দিকে রওনা হলো।
সে যখন টলেডোতে পৌঁছুল তখন তার ফৌজ সংখ্যা একলাখে দাঁড়িয়ে ছিল। তার মাঝে হাজার হাজার ছিল অশ্বারোহী। রডারিক টলেডোতে কালক্ষেপণ না করে তার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে রওনা হলো যেখানে তিতুমীর পরাজিত হয়েছে।
এদিকে তারেক ইবনে যিয়াদ সাহায্যকারী ফৌজ হিসেবে মাত্র পাঁচ হাজার ফৌজ পেলেন। এতে তার মোট ফৌজ সংখ্যা বার হাজারে উন্নীত হলো।
রডারিকের এক লক্ষ্য ফৌজ মুসলমানদের বার হাজার সৈন্যকে ছিন্ন ভিন্ন করার উম্মাদনায় বাঁধ ভাঙ্গা বানের ন্যায় ধেয়ে আসছিল।
***
পাঁচ হাজার ফৌজ তারেক ইবনে যিয়াদের মদদে এসে উপনীত হলো। এতে ইবনে যিয়াদ আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করলেন। সাহায্য আসার পূর্বে তার অপেক্ষায় তিনি এমন পাগলপারা ছিলেন যে রাতে হঠাৎ কোন সময় ঘুম ভেঙ্গে গেলে মুহাফিজ দলের কামান্ডারকে তলব করে বলতেন এখনই দু’জন সোয়ারী সমুদ্র পাড়ে পাঠিয়ে দাও সাহায্যের জন্যে ফৌজ আসছে কিনা তারা যেন সংবাদ নিয়ে আসে।
দিনের বেলা তিনি সমুদ্র তীরে গিয়ে জাবালুত তারেকের চূড়াতে উঠে উঁচু হয়ে বারবার সমুদ্র বক্ষে গভীরভাবে নয়ন বুলাতেন পরিশেষে যখন ফৌজ আসার কোন আলামত তিনি দেখতেন না তখন তার প্রতিটি কথা ও কাজে গোস্বার ঝলক দেখা দিত। তার সালাররা তাকে শান্তনা দিয়ে বলতেন সাহায্য বাহিনী অনেক দূর হতে। আসবে তো। তাই কিছুদিন দেরী হওয়াটা স্বাভাবিক।
তারেক কয়েকবার একথা বললেন, আমি জানি তাড়াতাড়ি কেন সাহায্য আসছে না। সম্ভবতঃ আমীরে আফ্রিকা কাসেদকে দামেস্কে পাঠিয়ে খলীফার দরবারে সাহায্যের আবেদন করেছেন। দামেস্ক থেকে ফৌজী সাহায্য আসতে আসতে কয়েকটি নতুন চাঁদ উদিত হবে। বুড়া আর জওয়ানের মাঝে এটাইতো পার্থক্য। একদা তারেক বললেন, মুসা ইবনে নুসাইর বার্ধক্যে উপনীত হয়েছে ফলে হার কাম এখন আরামের সাথে করতে চায়। তার এ কথা তো স্মরণ রাখা দরকার ছিল যে আমি জওয়ান এবং ধৈর্য হারা। সিরিয়া ও আরব থেকে সাহায্য তলব করার কি প্রয়োজন ছিল এবং তার মাঝে কি বুদ্ধিমত্তা লুকিয়ে রয়েছে? বর্বররা তো মরে যায়নি! কেবল শুধু এলান করে দিলেই হতো যে, সমুদ্র পাড়ে ইবনে যিয়াদের সাহায্য প্রয়োজন তাহলে একদিনের মাঝেই হাজার হাজার বর্বর মুসার দরবারে উপস্থিত হতো।
ফৌজী সাহায্যের অপেক্ষায় তারেক দাঁতের উপর দাঁত পিষছিলেন তারপরও সৈন্যের ট্রেনিং পূর্ণদমে চালু রেখেছিলেন। ঘোড় সোয়ারীদের প্রতি বিশেষভাবে নজর দিয়েছিলেন। কারণ তিতুমীরের সাথে যুদ্ধের সময় অসংখ্য ঘোড়া হাতে এসেছিল! তারেক পায়দলদের মাঝ থেকে বেছে বেছে অশ্ব দিয়ে বিশেষভাবে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন।
তারেক ইবনে যিয়াদ বেকার বসে থাকার আদমী ছিলেন না। তাছাড়া তাকে এ বিষয়টাও পেরেশান করে তুলেছিল যে, স্পেনের জেনারেল তিতুমীর পরাজিত হয়ে বসে নাই, সে তারেক ইবনে যিয়াদের ইন্তেজার করবে না বরং পরাজয়কে বিজয়ে পরিণত করার মানসে এবং হামলাকারীদেরকে স্পেন থেকে বিতাড়িত করার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে।
তারেক ইবনে যিয়াদ এ খবর পেয়েছিলেন যে, স্পেনের বাদশাহ্ রডারিক রাজধানী হতে বেশ অনেক দূরে রয়েছে। সে বিদ্রোহ দমনে গেছে। তার অবর্তমানে তারেক ইবনে যিয়াদ সম্মুখে অগ্রসর হয়ে স্পেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খতম করে। আরো কিছু এলাকা দখল করে কিছু ফৌজও হালাক করতে পারতেন।
পরিশেষে সাহায্যের ফৌজ এসে পৌঁছল। তারেক নবাগত পাঁচ হাজার ফৌজকে মাত্র এক রাত্র বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে সকালেই সম্মুখে অগ্রসর হলেন। তিনি জুলিয়নের কাছে জেনে নিয়ে ছিলেন সামনে কোথায় কি রয়েছে। তাছাড়া তিনি ভাল গোয়েন্দা হিসেবে হিজিকে পেয়েছিলেন যে হিজি ফ্লোরিডার কাছে রডারিকের মাথা কেটে আনার ওয়াদা করেছিল। তারেক তাকে দু’জন আদমী দিয়ে ছিলেন তারা দুশমনের এলাকাতে গিয়ে দেখে আসত দুশমন কোথায় আছে এবং তাদের সংখ্যা কত। যদি কেল্লা থাকে তাহলে তা কেমন মজবুত।
