ঐ দরজার সম্মুখে কাঁসার নির্মিত মানুষের এক বৃহৎ আকারের মূর্তি দাঁড়িয়ে ছিল। তার এক হাতে লোহার মুগোর ছিল আশ্চর্যের বিষয় হলো মূর্তি ঐ মুগোর দ্বারা জমিনের ওপর আঘাত হানছিল। মূর্তির বুকে স্পেনী ভাষায় লেখাছিল, “আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি।”
রডারিক মূর্তিকে লক্ষ্য করে বলল,আমি কোন খারাপ অভিসন্ধিতে আসিনি, কোন জিনিসে হাত লাগাব না। এখানের গোপন রহস্য জানার জন্যে কেবল এসেছি। তারপর যেমনি এসেছি অমনটি চলে যাব, আমাকে বিশ্বাস কর এবং রাস্তা ছেড়ে দাও।
মূর্তির মুগোর মারা বন্ধ হয়ে গেল। যে হাত ওপরে উঠেছিল তা উপরেই রয়ে গেল আর রডারিক সে হাতের নিচ দিয়ে অন্য কামরাতে চলে গেল তার সাথে তার সঙ্গীরাও গেল।
তারা যে কামরায় প্রবেশ করল তা অত্যন্ত খুব সুরত ছিল। রডারিকের মুহাফেজরা মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তার আলোতে দেয়ালে মূল্যবান, হিরা, মতি, তারার মত ঝলমল করছিল। কামরার মধ্যখানে টেবিলে একটা সিন্ধুক রাখা ছিল তাতে লেখা ছিল,
“এ সিন্ধুকের মাঝে এ দুর্গের গোপন রহস্য সংরক্ষিত রয়েছে কোন বাদশাহ্ ছাড়া কেউ এ সিন্ধুক খুলতে পারবে না তবে বাদশাহূর্কে সতর্ক করে দেয়া হচ্ছে যে, তার কাছে বিস্ময়কর বিষয়ের দ্বার উন্মোচিত হবে, সে বিস্ময়কর বিষয় যে ঘটনা বিপর্যয় হিসেবে বাদশাহর বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটবে।
রডারিক নির্ভীকনে সিন্দুকের ঢাকনা খুলে ভেতরে দৃষ্টিপাত করল, তাতে এক ফুট লম্বা একফুট চওড়া একটা চামড়ার কাগজ পড়েছিল। তামার একটা প্লেট ঐ চামড়ার নিচে আরেকটি প্লেট ছিল তার ওপরে। রডারিক চামড়া টুকরা হাতে নিয়ে দেখল তাতে ঘোড় সোয়ার যুদ্ধাদের প্রতিচ্ছবি রয়েছে। তারা তীর, কামান ও বর্শাতে সজ্জিত। তাদের চেহারা ভয়ঙ্কর আর তাদের প্রতিচ্ছবির ওপর লেখা রয়েছে, “লক্ষ্য কর হে অবাধ্য ইনসান! এরা এমন সোয়ারী যারা তোমাকে সিংহাসন থেকে উৎখাত করে তোমার বাদশাহী ভূলণ্ঠিত করবে।”
রডারিক প্রতিচ্ছবির প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করছিল তার জেনারেলদের নজরও তার প্রতি নিবিষ্ট ছিল। তারা এমন আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল যেন অদূরেই দু’দল ফৌজ লড়ায়ে লিপ্ত হয়েছে।
অশ্ব দৌড়, শব্দ, ফৌজদের চিৎকার ধ্বনি ভেসে আসছিল। কোন বহিরাগত ফৌজ তার মুলুকে হামলা করেছে এবং তারা টলেডোতে পৌঁছে গেছে এটা ভেবে রডারিক ঘাবড়ে গেল কিন্তু তার হতচকিত ক্ষণিকের মাঝেই শেষ হয়ে গেল কারণ সে যুদ্ধ পরিষ্কার তার সম্মুখে দেখছিল।
তারা যুদ্ধ এভাবে প্রত্যক্ষ করছিল যে, কামরার দেয়াল অদৃশ্য হয়ে তার স্থলে মেঘ ছেয়ে গিয়েছিল। আর সে মেঘের মাঝে অত্যন্ত প্রশস্ত যুদ্ধ ময়দান দেখা যাচ্ছিল। দু’দল ফৌজ সুস্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। একদল ফৌজ ঈসায়ী অপরদল উত্তর আফ্রিকার মুসলমানরা। উভয় দল ফৌজ একে অপরের খুনের দরিয়া বয়ে দিচ্ছে। তলোয়ার তলোয়ারে ও যুদ্ধ হাতিয়ার হাতিয়ারে টক্কর খাচ্ছিল। যুদ্ধের দামামা বাজছিল। পায়দল ও সোয়ারী জখম হয়ে জমিনে লুটিয়ে পড়ছিল আর পলায়ন পদ দ্রুতগামী ঘোড়া তাদেরকে জমিনের সাথে মিশিয়ে দিচ্ছিল। এ ভয়াবহ যুদ্ধের ময়দানে তীর-বর্শা উড়ে এসে মানুষের শরীর জখম করছিল। বেদনাদায়ক আর্তনাদে আসমান থরথর করে কাঁপছিল। পায়দল ও ঘোড়ার পদাঘাতে জমিন টলছিল।
অতি ভয়াবহ ঐ হাঙ্গামার মাঝে বারবার এ আহ্বান শোনা যাচ্ছিল, হে আল্লাহর রাসূলের প্রেমিকগণ! কাফেরদের নাম-নিশানা মিটিয়ে দাও।
“আল্লাহ তোমাদের সাথে রয়েছেন।”
“হে মুসলমানগণ! পশ্চাতে রয়েছে সমুদ্র, পারাপারের মাধ্যম জাহাজ হয়েছে। ভস্মিভূত।”
“আল্লাহর রাসূল বিজয়ের বাশারত দিয়েছেন।”
রডারিক, তার জেনারেলরা ও মুহাফিজগণ এ রক্তঝরা যুদ্ধের মাঞ্জার প্রত্যক্ষ করছিল। নারা, আহ্বান, শোর-গোল ও আত্ম চিৎকার শ্রবণ করছিল। এ দৃশ্যের ওপর-নিচ, ভান-বাম চতুর্দিকে সফেদ বাদল ছেয়ে ছিল। এ ভয়াবহ দৃশ্য ছিল কাল্পনিক কিন্তু বস্তুত বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল। রডারিকের চেহার রং দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। তার জেনারেল ও মুহাফিজদের চেহারায় ভয় ও আতংকের চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছিল। তাদের সাথে যদি বাদশাহ্ না থাকত তাহলে তারা পলায়ন করত।
খ্রীস্টান ফৌজের ঝান্ডা যা পতপত করে উড়ছিল একে একে সব ভূলণ্ঠিত হতে লাগল। মুসলমানদের পতাকা উড়ছিল। পরিশেষে কাফেরদের ঐ ঝান্ডা যার ওপর ক্রস চিহ্ন ছিল তাও পড়ে গেল, সে ঝান্ডা মাটিতে পড়তেই কাফেরদের মাঝে হা হুতাশ ও দৌড়াদৌড়ি শুরু হয়ে গেল। মুসলমানরা তাদেরকে খতম করতে লাগল।
রডারিক খ্রীস্টানদের মাঝে একজন যোদ্ধা দেখতে পেল। সফেদ ঘোড়ার ওপর সোয়ার হয়ে রডারিকের দিকে পিঠ ফিরিয়েছিল। তার মাথায় সে সিরস্ত্রান ছিল তা হুবহু রডারিকের শিরস্ত্রানের ন্যায় ছিল। এমনিভাবে তার যুদ্ধ পোষাকও রডারিকের মত। তার সফেদ ঘোড়াও রডারিকের ঘোড়ার ন্যায়। বিন্দুমাত্রও পার্থক্য ছিল না। ইতিহাস বর্ণনা করে রডারিকের ঘোড়ার নাম ছিল ইলইয়া।
যুদ্ধ দৃশ্যে বাদশাহ্ বেশে রডারিক যে সোয়ারীকে দেখছিল সে হঠাৎ করে অশ্ব থেকে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার সফেদ অশ্ব সোয়ারীহীন দিগ্বিদিক ছুটাছুটি করতে লাগল।
হঠাৎ রডারিক ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল এবং পিছে ফিরে দ্রুত পলায়ন পদ হলো। যে’কামরার সামনে কাঁসার মূর্তি মুগর হাতে করে দাঁড়িয়ে ছিল সেথায় এসে দেখল মূর্তি নেই। রডারিক ও তার সাথীরা আরো ভীত হয়ে পড়ল। তারা দ্রুত– পদে সে কামরা থেকে বেরিয়ে গেল। বাহিরে এসে তারা দেখল ঔ দু’জন বৃদ্ধ পাদ্রী যারা প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে ছিল এবং রডারিককে ভেতরে যেতে নিষেধ করছিল তারা মরে পড়ে আছে। রডারিক সেখান থেকে দূরে চলে গিয়ে পিছে ফিরে দেখল দুর্গ যে বাদলে ঢাকা ছিল তা লেলিহান শিখায় পরিণত হয়েছে আর দুর্গের মর্মর পাথর পর্যন্ত দাউ দাউ করে জ্বলছে। চতুর্দিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। বাতাস তীব্রবেগে প্রবাহিত হতে লাগল। দুর্গের লেলিহান শিখার স্ফুলিঙ্গ ওপরে উঠে জমিনে পড়তে লাগল। এ ঘটনা বর্ণনাকারী ঐতিহাসিকরা লেখেছেন, দুর্গের আগুন জমিনে যেখানে পড়ছিল তা রক্তে পরিণত হচ্ছিল।
