PURA উপলব্ধির এক স্বীকৃতিমূলক আন্দোলনের সূচনা হয়েছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে একে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের লক্ষ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে এই পূর্বাভাস অত্যন্ত শক্তিশালী এবং নিকটবর্তী ভবিষ্যতে প্রায় ৭০০০ PURA গুচ্ছ সমস্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়বে।
.
গাঁধীজি বলেছেন সত্যকার ভারত গ্রামেই অবস্থান করে। মানবতার এই বিশাল সমষ্টি ভারতবর্ষকে বিশ্বের কাছে নিবেদনে সাহায্য করতে পারে॥
১২. উদ্যানে
১২. উদ্যানে
প্রাচীর তুলে দুঃখ বা আনন্দকে আমি কারারুদ্ধ করি না;
আত্মত্যাগে বা অর্জনে, লাভে বা লোকসানে,
খোলা প্রাঙ্গণে আমি শুধু ফুল ফোটাই,
নদীতে ও পুকুরে পদ্মফুল ভাসাই।
১৯৯৭ সালে আমাকে যখন ভারতরত্ন উপাধি দেওয়া হল, চিত্রা নারায়ণন (রাষ্ট্রপতি কে আর নারায়ণন-এর কন্যা) আমায়, আমার ভাই এবং তাঁর নাতি-নাতনিদের নিয়ে মুঘল গার্ডেনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সে এমন এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে আমি ওই উদ্যানের সমারোহ জ্যোৎস্নারাত্রে দেখবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলাম। রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর স্ত্রী উষা নারায়ণন কথাটা শুনেছিলেন। তারপর থেকে যখনই আমি কোনও রাষ্ট্রীয় ভোজে আপ্যায়িত হয়েছি তখনই রাষ্ট্রপতি এবং ফার্স্ট লেডি আমাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তখনও ভাবতে পারিনি যে আমি রাষ্ট্রপতি ভবনে এরকম আরও ষাটটি জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রি দেখতে পাব।
যখন আমি ওখানে ছিলাম মুঘল গার্ডেন আমার কাছে এক গবেষণামূলক মঞ্চ ছিল। উদ্যানটি প্রকৃতি এবং দেশের নাগরিকের সঙ্গে আমার যোগাযোগের এক মহৎ মাধ্যম ছিল। সেটা ছিল এমন এক জায়গা যেখানে সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে আমি মিলিত হয়েছিলাম। তাদের মধ্যে ভেষজ উদ্ভিদের বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন, সেইজন্য ওই চত্বরে একটা বিভাগও ছিল। বাগানে যে পাখি এবং জীবজন্তু ঘোরাফেরা করত তারা ছিল আমার পরমবন্ধু। বাগানের নির্মল ও ছন্দময় পরিবেশ এবং অপূর্ব সুন্দর বৃক্ষগুলো আমায় শান্তির সন্ধান দিত।
নানা উপলক্ষে আমি আমন্ত্রিত রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারের প্রধানের সঙ্গে বাগানে পদচারণা করেছি। বিশেষ স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হল ২০০৭ সালে সার্ক রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে পদচারণা করা। আমার মনে আছে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শওকত আজিজ মন্তব্য করেছিলেন, যদি আমরা মুঘল গার্ডেনে বসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক সম্পাদন করতাম তা হলে আমাদের মধ্যেকার মতবিরোধগুলো মুছে যেত। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, এক ঘণ্টা চা-পান বৈঠকের পরিবর্তে আমার উচিত ছিল এই মনোরম উদ্যানে বসে আমাদের অঞ্চলের উন্নয়নমূলক আলোচনা সভার আয়োজন করা।
বাগানে আমি দুটি কুটির তৈরি করেছিলাম। কুটির দুটোর নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যা পরিবেশ সহায়ক এবং নির্মাণে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি কুটির ত্রিপুরা থেকে কারিগর নিয়ে এসে তৈরি করা হয়েছিল, নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ভাবনা কুটির’ বা থিংকিং হাট (Thinking Hut)। সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে আমার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে ওই কুটিরে আলাপ-আলোচনার জন্য নিয়ে যেতাম। আর আমার অন্যতম বই ‘Indomitable Spirit’-এর বেশিরভাগ অংশ ওখানে বসেই লেখা। দ্বিতীয় কুটিরের নাম ছিল ‘অমর কুটির’ বা ইম্মরটাল হাট (Immortal Hut)। এর চারিদিকে একটি কুঞ্জবন ছিল— যেখানে ষোলোটি গাছ, চৌত্রিশ ধরনের ভেষজ গাছ, একটি সংগীত উদ্যান এবং একটি জীববৈচিত্র্য বাগান ছিল। আমার লেখা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘Guiding Soul’-এ মনুষ্যজীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে চর্চা আছে যা আমার বন্ধু অধ্যাপক অরুণ তিওয়ারির সঙ্গে ‘অমর কুটিরে’ বসে আমাদের আলোচনা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল। যখনই কোনও জটিল জাতীয় সিদ্ধান্ত নেবার প্রয়োজন হত তখন ওই কুটির দুটোয় বসেই আমি ভাবনাচিন্তা করতাম। অবশ্যই, ওখানে বসে অনেক কবিতা লেখার প্রেরণাও পেয়েছিলাম।
রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্পত্তি প্রায় ৩৪০ একর জুড়ে ছড়ানো। মুঘল গার্ডেন গড়ে উঠেছিল ১৫ একর জায়গা জুড়ে। উদ্যানে পরপর তিনটি উঁচু চত্বর আছে-আয়তাকার, লম্বা আর গোলাকার। আয়তাকার চত্বর বা আসল মুঘল গার্ডেনটির অত্যন্ত সুন্দর কিছু বৈশিষ্ট্য আছে যেমন— চারটি খাল, ছয়টি ঝরনা এবং ৭০ বর্গ মিটার আয়তনের মধ্যবর্তী লন (ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জাতীয় বৈঠক এখানে সম্পাদিত হয়েছিল এবং প্রজাতান্ত্রিক দিবসে ও স্বাধীনতা দিবসের জনপ্রিয় ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলো এখানে অনুষ্ঠিত হয়), ১৪৪টা মউলসারি গাছের ছাতার মতো চন্দ্রাতপ, অসাধারণ সুন্দর গোলাপ আর বিভিন্ন আয়তনের বেশ কিছু লন। এই বাগানটি লম্বা, বাগান চত্বরটির সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। লম্বা বাগানটির মাঝখান দিয়ে ৫০ মি. লম্বা রাস্তা চলে গেছে এবং মাঝখানে একটা অর্ধবৃত্তাকার ছাউনি আছে যা পুষ্পলতা দিয়ে আচ্ছাদিত। রাস্তাটির দু’পাশে গোলাপ গাছের কেয়ারি এবং চিনা কমলালেবুর গাছ আছে। লম্বা বাগানটি তৃতীয় উদ্যানকে পশ্চিমদিকে যুক্ত করেছে। এখানে রয়েছে ফুলের বাগান, মাঝখানে আছে একটা ঝরনা। এই বাগানের আকার গোলাকার বলে একে গোলাকার বাগান বা সার্কুলার গার্ডেন বলা হয়। বাগানে যখন ফুলগুলি পূর্ণভাবে বিকশিত হয় তখন রাজকীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি হয়। এই বাগানটিতে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং তাঁর স্ত্রী লরা ও তাঁর সঙ্গী প্রতিনিধি দলের জন্য ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বিখ্যাত শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের ওই ভোজসভায় যোগদানের দরুন যে সাফল্যলাভ হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে তা বিশেষ তাৎপর্যময়। মার্কিন রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর স্ত্রী উভয়েই এর প্রভূত প্রশংসা করেছিলেন।
