মুঘল গার্ডেনের তিনটি চত্বর ও বাকি অন্যান্য বাগানগুলির সৌন্দর্য তুঙ্গে উঠে যায় মধ্য-ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য-মার্চ সময়টায়। একসঙ্গে গোলাপ, নানা ধরনের লতা, গুল্ম ফুলের গাছ এবং শীতের মরশুমি ফুল ফুটে চারদিক আলো করে চমকপ্রদ প্রদর্শনী করে।
ড. ব্রহ্ম সিং, বিশেষ কর্তব্যরত আধিকারিক, উদ্যানপালন, প্রদর্শনীতে বিচিত্র ফুলের তালিকাবদ্ধ করতে গিয়ে পরম আনন্দিত হয়েছিলেন। ওখানে অ্যাকরোকলিনিয়াম, অ্যান্টিরহিনাম, ব্র্যকিকোম, বিগোনিয়া, ক্যালেন্ডুলা, ক্যাম্পানুলা, ক্যান্ডিটাফ্ট, কারনেশান, ক্রিসানথিমাম, কেলোসিয়া, চিনা অ্যাস্টর, সিনেরারিয়া, ক্যালিওপসিস, কস্মস, ক্লারকিয়া, কর্নফ্লাওয়ার, ডেইজি, ডেলফিনিয়াম, ডায়ানথাস, ডালিয়া এবং আরও নানা ফুল ছিল, বর্ণমালা ধরে নানা ফুলের নাম।
উদ্যানের সৌন্দর্য হাজার হাজার মানুষকে আকৃষ্ট করে। জনসাধারণ বিনামূল্যে এই উদ্যানে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ দিনে একান্তভাবে বিশেষ সম্প্রদায়ের যেমন কৃষক, প্রতিরক্ষা বাহিনীর কর্মচারী, প্রবীণ নাগরিক, শারীরিকভাবে অক্ষম এবং দৃষ্টিহীন মানুষদের প্রবেশের ব্যবস্থা থাকে।
ড. ব্রহ্ম সিং রাষ্ট্রপতি ভবনের গাছ নিয়ে সুন্দরভাবে চিত্রিত একটা বই প্রকাশ করেছিলেন।
রাষ্ট্রপতি ভবন চত্বরের নিসর্গচিত্র বিকশিত করে এবং আরও অতিরিক্ত সবুজ ক্ষেত্র নির্মাণের মাধ্যমে কীভাবে ভবন চত্বর আরও মূল্যবান করা যায় এ-বিষয়ে ২০০২ সালে আমার কিছু ভাবনাচিন্তা ছিল। পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি এবং নুড়িপাথর মিশ্রিত বন্ধুর জমিতে সবজি ও পুষ্পোদ্যান বিকাশের ক্ষেত্রে ডিআরডিও-তে আমার যে অভিজ্ঞতা ছিল তা কাজে এসেছিল। আমি ডিআরডিও ছাড়াও অন্যান্য সংগঠন যেমন, ভারতীয় কৃষিবিদ্যা গবেষণা সংসদ বা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ এবং বৈজ্ঞানিক ও শিল্প বিষয়ক গবেষণা সংসদ বা সিএসআইআর (কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ)-এর কৃষি বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলাম। ড. ব্রহ্ম সিং সহায়তা করেছিলেন এবং আমাদের প্রচেষ্টার ফলে বারোটি উদ্যান সৃষ্টি হয়েছিল।
ভারতবর্ষে বা ভারতের বাইরে স্পর্শনীয় বাগানের সংখ্যা খুব কম। লখনউ-এর সিএসআইআর-এর অন্তর্গত জাতীয় উদ্ভিদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা এনবিআরআই (ন্যাশনাল বোটানিকাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট)-এর একটি স্পর্শনীয় উদ্যান আছে, তার বিশেষজ্ঞসুলভ নৈপুণ্য ব্যবহার করে ২০০৪ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনের স্পর্শনীয় উদ্যান গড়ে উঠেছে। এখানেও একটি ডিম্বাকৃতি বাগান আছে যার মধ্যে একটা ঝরনা এবং পাথর বাঁধানো রাস্তা আছে। এখানে আছে চৌত্রিশটা সুগন্ধী গাছ, গুল্ম, মশলা, ফল এবং শোভাবর্ধক গাছের কেয়ারি। প্রতিটি কেয়ারির একটি করে নির্দেশক আছে যেখানে গাছের বর্ণনা হিন্দি এবং ইংরেজিতে ব্রেইল ভাষায় দেওয়া আছে।
দৃষ্টিহীন যাঁরা, তাঁরা এই উদ্যানে এসে ভীষণ খুশি হন। তাঁদের মুখমণ্ডলে আনন্দের লক্ষণ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। প্রতি বছর যখন স্পর্শনীয় উদ্যান দৃষ্টিহীনদের জন্য খোলা হয় আমি সবসময় ওদের সঙ্গে থাকি।
এক রবিবার অমর কুটিরে বসে আমি যখন ড. ব্রহ্ম সিং এবং আমার বন্ধু ড. ওয়াই এস রাজনের সঙ্গে আলাপচারিতা করছিলাম তখন সংগীতময় উদ্যানের ভাবনাটি জেগে উঠল। আমরা অনুভব করলাম বটগাছের কুঞ্জবন, জৈববৈচিত্র্যপূর্ণ বাগান এবং ঔষধি উদ্যানকে পশ্চাদপটে রেখে একটি সংগীতময় উদ্যানের প্রয়োজনীয়তা আছে। ২০০৬ সালে একটি সংগীতময় ঝরনার ব্যবস্থা চালু হল। এই প্রকল্পটি বহু প্রযুক্তির এক উদ্দীপনাময় সম্পূরণকে অন্তর্ভুক্ত করে, যেমন-গাণিতিক, বৈদ্যুতিন তড়িৎ-চুম্বকত্ব, জল-গতিবিদ্যা, উদ্স্থিতি বিদ্যা এবং মানুষের উদ্ভাবনী কৌশল।
ঝরনার জলে এক অভূতপূর্ব প্রদর্শন অনুষ্ঠিত হয় যেখানে ঝিকমিক করা আলো ঝরনার ঢেউয়ের মতো ফিনকি দেওয়া জলকে, রেকর্ড-করে-রাখা বা সরাসরি বাজানো মার্গসংগীতের সুরে নিখুঁত ছন্দ সমতায় আলোকিত করে। পূর্ণিমা রাত্রে, গরিমা এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক রাষ্ট্রপতি ভবনের গম্বুজকে পশ্চাদপটে রেখে উদ্যানে এক জোড়া ঝরনা রাজকীয়ভাবে দাঁড়িয়ে পবিত্রতা, উৎকর্ষতা এবং গৌরব বিচ্ছুরণ করে।
এক অপূর্ব আনন্দদায়ক মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছিল যেদিন এক পূর্ণিমা রাত্রে এই সংগীতময় উদ্যানে পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা ৫০০ জন শ্রোতার সামনে সন্তুর বাজিয়েছিলেন।
বহু বছর ধরে নানা ধরনের পাখি এবং পশুপ্রজাতি, একটা জলপ্রপাত, শৈলোদ্যান, মাছের পুকুর, খরগোশের বাড়ি, হাঁসের বাড়ি, অসুস্থ পশুর জন্য নিরালা স্থান এবং পক্ষীনিবাস যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যপূর্ণ বাগান গড়ে উঠেছিল। উদ্যান শুধুমাত্র প্রকৃতির প্রতি যত্ন এবং ভালবাসার ভাব গড়ে তোলেনি, শান্তি এবং প্রশান্তি অর্জনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে আমি একটা পরিত্যক্ত হরিণশাবক দেখেছিলাম। আমি আর ভ্রমণসঙ্গী ড. সুধীর লক্ষ করেছিলাম জন্মকালীন কোনও দৈহিক ক্ষতিগ্রস্ততার কারণে শাবকটি উঠে দাঁড়াতে পারছিল না। ড. সুধীর ওর পা দুটো পরিচর্যা করে শাবকটিকে মা-র সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হয়নি। প্রতিদিন আমি হরিণশাবকটিকে বোতলে করে দুধ পান করাতাম। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে দিয়েছিল। যখনই সে আমাকে দেখত দৌড়ে আসত আমার কাছে, দুধ পান করার জন্য। কয়েক সপ্তাহ পরে হরিণের পাল শাবকটিকে নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করল। এই ঘটনা আমার মর্মস্পর্শ করেছিল।
