৪. একবার যদি তিনটি সংযোগসাধন সংঘটিত হয়, উপার্জনের সামর্থ্য এরা বৃদ্ধি করে। PURA-কে একটা লক্ষ্য হিসেবে ধরে আমরা গ্রামগুলো সমৃদ্ধ জ্ঞানকেন্দ্রে বিকশিত করতে পারি এবং গ্রামবাসীরা উদ্যোক্তা হিসেবে উত্থিত হতে পারে।
পেরিয়ার PURA প্রতিষ্ঠানটি পেরিয়ার ওয়াল্লামের মানিয়াম্মাই কলেজ অফ টেকনোলজি ফর ওমেন দ্বারা পথপ্রদর্শিত হয়েছিল। আমি ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখে এর উদ্বোধন করেছিলাম এবং ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আর-একবার ওখানে গিয়েছিলাম। ২০০৩ সালে এই PURA-র পঁয়ষট্টিটির বেশি গ্রামসমষ্টি নিয়ে গঠিত, ২০০৩ সালে যেখানে লোকসংখ্যা ১০০,০০০-এর বেশি ছিল। এর তিনটি সংযোগসাধন অর্থনৈতিক সংযোগসাধনের দিকে নিয়ে গেছিল। প্রতিবার পরিদর্শনকালে সমষ্টির অখণ্ড উন্নয়নকে সম্ভব করার জন্য স্থানীয় অধিবাসী এবং যুবসমাজের উৎসাহে আমি পরম আশ্চর্য হই। যুবসমাজ এই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং উদ্ভাবনী দক্ষতাকে প্রদর্শন করেছিল। এই পদক্ষেপের দরুন ১,৮০০ স্বনির্ভর সম্প্রদায়ের সক্রিয় সমর্থনে অসংখ্য উদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়েছিল এবং বৃহদায়তন কর্মসংস্থানের উপায় সৃজন হয়েছিল। দু’শো একর পতিত জমি উদ্ভাবনী জল ব্যবস্থাপন পরিকল্পনার মাধ্যমে চাষযোগ্য ভূমিতে উন্নীত করা হয়েছিল। পেরিয়ার মনিয়াম্মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত পেরিয়ার মানিয়াম্মাই কলেজটি কলেজের ছাত্রছাত্রী এবং বিভাগীয় সদস্যদের স্থানীয় বাসিন্দাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে PURA-র উন্নয়নের কাজে নিযুক্ত করেছে। এরা এক গ্রাম এক উৎপাদন, পরিকল্পনা রূপায়িত করার ফলে গ্রামগুলি থেকে পঁয়তাল্লিশটা দ্রব্য নির্বাচন সম্ভব হয়েছে যার আন্তর্জাতিক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষা-সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্টতা পঁয়ষট্টিটি গ্রামে অগ্রসরমান গ্রামীণ উন্নয়নে সক্ষম হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে।
নানাজি দেশমুখ এবং দীনদয়াল রিসার্চ ইন্সটিটিউট বা ডিআরআই-এ ওঁর টিম সদস্যরা মধ্যপ্রদেশে চিত্রকূট PURA স্থাপন করেছিল। ডিআরআই এক অভিনব প্রতিষ্ঠান যা ভারতের পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত এক গ্রামীণ উন্নয়ন মডেলের প্রয়োগ ও বিকাশসাধন করেছিল।
এই প্রতিষ্ঠান বুঝতে পেরেছিল মানবশক্তি রাজনৈতিক শক্তির তুলনায় কার্যকর, স্থিতিশীল ও সহনশীল। নিপীড়িত ও অনুন্নতদের মধ্যে একাত্ম হতে পারলে তবেই সে শাসনব্যবস্থা ও শাসনপদ্ধতির বিশ্লেষণী অন্তর্দৃষ্টি লাভ করে। তরুণসমাজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস এবং উৎকর্ষতার মানসিকতার সঞ্চারণ দ্বারাই একমাত্র সামাজিক অগ্রগতি এবং সমৃদ্ধিলাভ সম্ভব। এই নীতিকে ব্যবহার করে ডিআরআই এক কোটি গ্রামীণ গুচ্ছ উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছে যেগুলোর মোটামুটিভাবে পাঁচটি গ্রাম চিত্রকূট ঘিরে রয়েছে। তারা এর মধ্যেই ৪০টি গ্রামের উন্নতিসাধন করেছে, যেখানে প্রায় ৫০,০০০ গ্রামবাসী নিয়ে ১৬টি গুচ্ছ আছে।
পাটনি নামক একটি গ্রামে ডিআরআই দেশজ ঐতিহ্যগত প্রযুক্তি, জ্ঞানব্যবস্থা এবং স্থানীয় প্রতিভাভিত্তিক সক্ষম উন্নয়ন ঘটিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রসমীক্ষার মাধ্যমে গবেষণার দ্বারা গ্রামের স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্য অবিকল অনুকৃতিযোগ্য ও সুনির্দিষ্ট আদর্শের উন্নয়ন সহজসাধ্য হয়েছে। এই কার্যক্রম লক্ষ্য স্থির করে— মূল্য সংযোজনের ফলে আয়ের বৃদ্ধি, উদ্ভাবনী কৃষিসংক্রান্ত অনুশীলনী, গ্রামবাসীদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক মনোভাব তৈরি করা, স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য-বিধির উন্নতি ঘটানো এবং একশো শতাংশ সাক্ষরতার জন্য প্রচেষ্টা। উন্নয়নমূলক কার্যকলাপের বাইরে এই প্রতিষ্ঠান সংযোগশীল, দ্বন্দ্ববিহীন সমাজ গড়ে তোলা সহজসাধ্য করে। এর ফলে চিত্রকূটের চারদিকে আশিটি গ্রাম মামলা-মোকদ্দমা মুক্ত। গ্রামবাসীরা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কোনও বচসা আদালত পর্যন্ত গড়াবে না। গ্রামে বসেই তার বন্ধুত্বপূর্ণভাবে সমাধান হবে। এর কারণ হিসেবে নানাজি দেশমুখ বলেছিলেন যে, যদি মানুষ একে অপরের সঙ্গে শুধু লড়াই চালিয়ে যায় তবে তারা উন্নয়নের জন্য সময় পাবে না। তারা নিজেদের জন্য অথবা সম্প্রদায়ের জন্য কোনও কাজ করতে পারবে না। এই বার্তা সেখানকার লোকেরা বুঝতে পেরেছিল।
আমার মনে হয় গ্রামীণ ভারতের উন্নয়নের জন্য চিত্রকূট প্রকল্প এক পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। এটি এমন সমাজ নির্মাণের দিকে লক্ষ্য রাখে যা পারিবারিক বন্ধন, ভারতীয় সংস্কৃতির গৌরব, আধুনিক শিক্ষা ও ভারতীয় প্রাজ্ঞতার মেলবন্ধন, সামাজিক উদ্বেগ মোচন, প্রত্যেকের বিশেষত মহিলাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সকলের জন্য স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা, সমাজের সমস্ত স্তরে সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। এই ধারণা আমার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পূর্ণ মিলে যায়। আমিও মনে করি উন্নত ভারত মানে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, শিল্প ও সাহিত্যে, মানবতাবাদ এবং চিন্তাভাবনায় মহত্ত্ব, সবের সমষ্টিগত উন্নয়ন ও সর্বোপরি পাঁচ হাজার বছরের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে ভারতবর্ষের উন্নয়ন সম্ভব।
