২০০৬ সালে আমি তৃতীয়বার ভ্রমণ করেছিলাম। ভারতীয় সেনাবাহিনী অ্যাকাডেমির প্রশিক্ষণ সমাপ্তকরণ কুচকাওয়াজে রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে সামরিক অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য আমি দেরাদুনে গেছিলাম। সময়টা ছিল শীতকাল এবং সকালবেলার অস্পষ্ট দৃশ্যমানতার কারণে বিমানে করে সময়মতো পৌঁছনো বেশ অনিশ্চিত ছিল। রাতের বেলাও যথেষ্ট কুয়াশা পড়েছিল। ট্রেন সফদরজং থেকে দেরাদুন পর্যন্ত কোথাও না থেমে অবিরাম চলেছিল কিন্তু রেল বিভাগ যাত্রার নির্বিঘ্নতার জন্য অনেকগুলো চেকপয়েন্টের ব্যবস্থা করেছিল।
উৎফুল্ল ভাবী স্নাতকদের সঙ্গে সময় কাটানো এক আনন্দজনক অভিজ্ঞতা। বিশেষত অনেক ভাবী স্নাতক অফিসাররা আমায় প্রশ্ন করেছিলেন কীরকম ভারতবর্ষকে তাঁরা সুরক্ষা দেবেন। এই অফিসারদের দলকে আমি যখন পরিদর্শনে সীমান্ত নিকটবর্তী, উত্তরাঞ্চল সেনাবাহিনীর ইউনিটে গেছিলাম সে-কথা বললাম। সীমান্ত ওপারবর্তী পাকিস্তানি সেনাধিকারীরা আমার পরিদর্শন পুঙ্খানুপুঙ্খ লক্ষ রাখছিল। আমি বিভিন্ন ইউনিটের প্রায় দুশো তরুণ আধিকারিকদের উদ্দেশে অভিভাষণ দিয়েছিলাম। অভিভাষণের পরে বড়াখানায় যাওয়ার আগে আমি এই তরুণ আধিকারিকদের কাছে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম— প্রিয় নবীন আধিকারিকগণ, যেহেতু সৈন্যবাহিনীতে আপনাদের সামনে প্রায় ত্রিশ বছরের বেশি কর্মজীবন পড়ে রয়েছে, আপনারা আমায় বলতে পারবেন কি একজন আধিকারিক হিসেবে কী অভিনব লক্ষ্যপূরণের স্বপ্ন আপনারা দেখেন?
বর্ষীয়ান আধিকারিকরা নিশ্চুপ ছিলেন কিন্তু নবীন আধিকারিকদের মধ্যে যারা উত্তর দেবার জন্য হাত তুলেছিলেন তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে আমি বেছে নিলাম। আমায় অভিবাদন জানিয়ে তিনি বললেন, ‘স্যার আমার একটা স্বপ্ন আছে, সে স্বপ্ন হল আমাদের দেশের ভূমি যা অন্য রাষ্ট্র দখল করে নিয়েছে তা ফেরত পাওয়া।’ সমস্ত অধিবেশনে যেন তড়িৎপ্রবাহ সঞ্চালিত হল, সবাই ওই নবীন আধিকারিককে বাহবা দিলেন। এই উত্তর যখন আমি স্নাতক পরীক্ষার্থী সামরিক শিক্ষানবিশদের জানালাম সেখানেও একই প্রতিক্রিয়া দেখলাম— ‘আমরাও তাই করব স্যার।’ এসব নানা কারণে রেলযাত্রা দীর্ঘদিন আমার স্মরণে রয়ে গেছে।
.
সুদানে আমি এক অত্যন্ত সুন্দর এক দৃশ্য দেখেছিলাম যে নীলরঙা নীলনদ এবং সাদারঙা নীলনদ মিলিত হয়ে অন্য এক নদীতে, অন্য কোনও এক রং ধারণ করে বয়ে চলেছে, যেন এ এক সঙ্গম। বহু মিলনে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখলেও আমরাও পরিবর্তিত হই।
১১. ভারতবর্ষের হৃদয়কে পুনরুজ্জীবিত করা
১১. ভারতবর্ষের হৃদয়কে পুনরুজ্জীবিত করা
সেবামূলক চৈতন্যে উদ্দীপিত মানুষের গ্রামে বাস করতে পারা এবং
গ্রামবাসীর প্রতি সেবায় আত্ম-অভিব্যক্তি খুঁজে পাওয়ার মাধ্যমে
গ্রামীণ আন্দোলন গ্রামের সঙ্গে সুস্থ যোগাযোগ
স্থাপনার একটা প্রচেষ্টা।
—মহাত্মা গাঁধী
গ্রামেই আসল ভারতবর্ষের অধিষ্ঠান। গ্রাম থেকে তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি এবং জীবনদর্শনের উদ্ভব ঘটে। আমার জন্ম এবং বেড়ে-ওঠা গ্রামে। গ্রাম্যজীবনের ছন্দ আমি উপলব্ধি করতে পারি। সাম্প্রতিক কালে গ্রাম থেকে শহরে পরিযান অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এই পরিযায়ী মানুষগুলো শহরে এসে ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কাজ ও অর্থ রোজগারের প্রচেষ্টা করতে গিয়ে বস্তিতে বাস করে পীড়িত ও উদ্বেগজনক জীবন কাটায়। তাদের জীবন থেকে নিজস্ব সবকিছু ও ভালবাসা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আমার বিশ্বাস গ্রামে যথেষ্ট পরিমাণে উপার্জনের উপায় সৃষ্টি এবং স্বাচ্ছন্দ্যের উন্নতি সাধনের মাধ্যমে গ্রাম-উন্নয়নের বিকাশ ঘটিয়ে ভারতবর্ষের প্রকৃত পরিবর্তন আনা সম্ভব। এভাবেই শহরমুখী মানুষের পরিযান বন্ধ এবং পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশামুক্ত করা সম্ভব। এই ভাবনা থেকে উদ্ভূত হল PURA (Providing Urban Amenities to Rural Areas).
কোনও রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন তার গ্রামের উন্নয়ন। এ-বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা লাভের জন্য ২০০২ সালে ভুপাল ভ্রমণের সময় আমি একটা গ্রামীণ অঞ্চল দর্শনে যাব বলে স্থির করি। তোরনি নামক যে অঞ্চলে গেছিলাম সেখানে না আছে যথাযথ রাস্তা, না বিদ্যুৎ। যে মুহূর্তে ওই গ্রাম পরিদর্শনের ইচ্ছার কথা ঘোষণা করেছিলাম সঙ্গে সঙ্গে রাজ্য কর্তৃপক্ষ অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়ে ফেলেছিল— সর্বপ্রথমে কয়েক কিলোমিটার লম্বা, সব আবহাওয়ায় উপযোগী রাস্তা তৈরি করে ফেলেছিল। বিদ্যুৎও জেট প্লেনের গতিতে গ্রামে পৌঁছে গেছিল।
আমার ওই গ্রাম পরিদর্শন কালে গ্রামবাসীরা খুশি হয়ে তাদের জলবিভাজিকা ব্যবস্থাপনা এবং জৈব কীটনাশক ব্যবহারের নমুনা প্রদর্শন করেছিল। আমি জেলা কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম, তোরনি গ্রামের সাফল্য অর্জনের বার্তা ওই অঞ্চলের অন্যান্য গ্রামে প্রচার করতে, যাতে তারাও এই অভিজ্ঞতা থেকে লাভবান হয়। আমি রাজ্য কর্তৃপক্ষকে আরও পরামর্শ দিয়েছিলাম যে, তারা কয়েকটি গ্রাম নিয়ে এক-একটি গুচ্ছ (Cluster) গড়ে তুলে তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে। যাতে শুধুমাত্র রাস্তা বা পরিবহণব্যবস্থা নির্মাণের মাধ্যমে বাস্তব সংযোগসাধন নয়, গ্রামীণ সমষ্টির মধ্যে সাধারণ স্বাচ্ছন্দ্য যেমন স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফল-সবজির মতো দ্রুত পচনশীল দ্রব্যের সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুবিধা ঘটে। শস্য এবং কাষ্ঠভিত্তিক শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদন বহু প্রসারিত এবং আজকাল বিশাল চাহিদা। আমি মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং জেলাকর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়েছিলাম উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে গ্রামের যত জলাশয় আছে তা ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে পলিমুক্ত করার এবং যথার্থ প্রবেশ এবং নির্গমন সংযোগস্থাপন করার।
