জোহানেসবার্গে ওঁর বাড়িতে তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া আমার পক্ষে এক বিরল সৌভাগ্য। যখন আমি করমর্দন করলাম মনে হল আমি যেন এক মহান আত্মাকে স্পর্শ করছি। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে পথ চলার লাঠিটা ছুড়ে ফেলে দিলেন, আমায় অবলম্বন করলেন। ওঁর কাছ থেকে এক বিশাল শিক্ষা পেলাম যা অন্যতম তিরুক্কুরালেও আছে, ‘যারা তোমার অনিষ্ট করতে চায় তার পরম শাস্তি হল তাদের ভাল করা।’
রেলগাড়ির সঙ্গে আমার সম্পর্ক আমাকে ছেলেবেলার দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়, যখন আমি রামেশ্বরম শহরের রেলস্টেশনে ট্রেন থেকে ছুড়ে দেওয়া সংবাদপত্র ঘরে ঘরে বিলোনোর জন্য কুড়িয়ে নিতাম। নিজের দেশকে দেখা এবং তার সুগন্ধ আঘ্রাণ করার জন্য রেলযাত্রা খুব ভাল। মাঝেমধ্যে কুয়াশাচ্ছন্ন অবস্থায় নিসর্গদৃশ্য কিছুটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যেমন, সবুজ খেত এবং গ্রামের টুকরো ছবিগুলো অনেক কাছের বলে মনে হয়। সব মিলিয়ে রেলযাত্রা যথেষ্ট আনন্দদায়ক এবং আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম যে প্রেসিডেন্সিয়াল ট্রেন আবার চালু করব।
প্রেসিনডেন্সিয়াল কক্ষ এক জোড়া জুড়ি কোচের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে— একান্তভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যবহারের জন্য। কামরার ভেতরে ভোজন কক্ষ, তার দ্বিগুণ জায়গাবিশিষ্ট দর্শনার্থীদের কক্ষ, বসবার বা অধিবেশনের জন্য কক্ষ এবং রাষ্ট্রপতির শয়নকক্ষ থাকে। এ ছাড়াও থাকে রান্নাঘর এবং রাষ্ট্রপতির সচিব ও কর্মী এবং তাঁর যাত্রাসঙ্গী রেলকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ। কামরাগুলো সেগুন কাঠের আসবাবপত্র, সিল্কের পরদা এবং কুশান ঢাকনা দিয়ে বিলাসবহুলভাবে সজ্জিত।
এই কামরাগুলো ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর প্রথম দিকে কিছু ব্যবহার হয়েছিল। একটা ঐতিহ্যও ছিল যে, রাষ্ট্রপতি তাঁর কার্যের মেয়াদকাল শেষ হলে নিউ দিল্লির বাইরে, যেখানে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসে ইচ্ছুক হবেন সেখানে ওই ট্রেনে চড়ে যেতেন। এইভাবে শেষ যে রাষ্ট্রপতি ট্রেনে চড়েছিলেন তিনি নীলম সঞ্জীব রেড্ডি, ১৯৭৭ সালে।
এর পর থেকে হয়তো সুরক্ষার কারণেই কামরাগুলো আর ব্যবহার করা হয়নি— কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ বজায় ছিল। এর আবার ব্যবহার হল ২০০৬ সালের ৩০ মে, ২৬ বছর পরে— হরনউত থেকে পটনা পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিমি রাস্তা আমি এই ট্রেনে চড়ে গেছিলাম। কামরাগুলো মেরামত করা হয়েছিল এবং আধুনিক সরঞ্জাম যেমন উপগ্রহনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল। আমি যতটা সম্ভব তার ব্যবহারের চেষ্টা করেছিলাম— সর্বমোট তিনবার।
আরও দু’বার ট্রেনযাত্রা করেছিলাম— ২০০৪ সালে চণ্ডীগড় থেকে দিল্লি এবং ২০০৬ সালে দিল্লি থেকে দেরাদুন। এই রেলযাত্রা আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার কারণে জরুরি হয়ে পরে। এ ছাড়া যাত্রাকালীন সময়ে নানা বৈঠকও সমাপন করা যায়।
হরনউত থেকে পটনা রেলযাত্রার অনেকগুলো কারণ ছিল। হরনউতে আমি নতুন রেলপথ কর্মশালার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলাম। নীতিশকুমার তখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর নিজের রাজ্যে বিশালাকারের কর্মশালা কেন্দ্র ব্যবস্থা স্থাপিত হওয়ার দরুন তিনি দারুণ খুশি হয়েছিলেন। আমার অভিভাষণে আমি হরনউতের উপস্থিত শ্রোতাকে বলেছিলাম— আমি সবেমাত্র প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র নালন্দার ধ্বংসস্তূপ থেকে আসছি। আমি আশা করি বিহার বিশ্বশান্তি প্রচার সম্পর্কিত বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন সমকালীন পাঠ্যক্রম দ্বারা এই মহান বিশ্ববিদ্যালয় পুনরুজ্জীবিত করবে।
রেলযাত্রা অসম্ভব কার্যকরী হয়েছিল কারণ আমি বিহারের পনেরোজন উপাচার্যকে আমার সঙ্গে যাত্রা করার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম এবং যাত্রাপথে ওঁদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ঘণ্টা খানেক আলোচনা করেছিলাম।
রাজ্যের উন্নয়ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে প্রাসঙ্গিক এমন পাঠ্যসূচি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর আমি সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছিলাম। বিহারের রাজ্যপাল যেসমস্ত সমস্যাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানোন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে সেগুলোর সমাধান করে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমর্যাদায় উন্নীত করার প্রতি বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। দু’বছর পরে ক্যালেন্ডারভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলনের দ্বারা দেখলাম লক্ষ্য অর্জনে তারা সফল হয়েছে।
এই ভ্রমণের এক সন্তোষজনক পাদটীকা আছে— পটনা রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে দেখি আমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা লালুপ্রসাদ যাদব এবং সংযুক্ত জনতা দলের নেতা নীতিশকুমার দু’জনেই উপস্থিত কিন্তু দু’জনেই বিপরীত দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি ট্রেন থেকে নেমেই এই দুইজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে এক জায়গায় আনলাম এবং উপস্থিত জনতাকে আনন্দ দেওয়ার জন্য পরস্পরের সঙ্গে করমর্দন করালাম।
২০০৪ সালের ৫ জানুয়ারি, আমি শিশুদের বিজ্ঞান কংগ্রেস বা Childrens’ Science Congress উদ্বোধন করার জন্য এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে অভিভাষণ দেওয়ার জন্য চণ্ডীগড় গিয়েছিলাম। পরদিন ৬ জানুয়ারি আমাকে বিশেষ কাজের জন্য দিল্লি ফিরে আসতে হয়েছিল। সকালবেলার কুয়াশার দরুন যাত্রার অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেয়ে সঠিক সময়ে দিল্লিতে পৌঁছনোর জন্য আমি ট্রেনে ফিরেছিলাম। বিজ্ঞান কংগ্রেস উদ্বোধন করতে পেরে বিশেষ আনন্দ পেয়েছিলাম। কারণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী তাদের প্রজেক্ট নিয়ে ওখানে জড়ো হয়েছিল।
