অভিভাষণের পরে সদস্যদের অনেকেই বক্তৃতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। সাধারণ পর্যবেক্ষণ হল ভারতবর্ষ এক মহান রাষ্ট্র যার মানবিকমূল্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
সমগ্র বিশ্বে মানসিক সমন্বয় প্রচারের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় সংসদে আমার অভিভাষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। ওই অভিভাষণটি অনেক রাষ্ট্রে উদ্ধৃত করা হয়েছিল এবং ইউ টিউব (You Tube)-সহ অসংখ্য ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিশ্বের শ্রোতৃবৃন্দের কাছে পৌঁছেছিল।
ভারতবর্ষে ফিরে আসার পরে সংসদে যে অভিভাষণ দিয়েছিলাম তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা লক্ষ্যে কাজ করার আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছিলাম, যেমন— শক্তিক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা এবং বিশ্ব জ্ঞানমঞ্চ নির্মাণ। এর কারণ ছিল, ভারতবর্ষ যাতে অগ্রসরের লক্ষ্যে প্রাথমিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে।
আমি যখন গ্রিসে গেছিলাম সক্রেটিস গুহায় যাত্রার এক বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছিলাম। ভ্রমণার্থীরা কদাচিৎ ওখানে যায় কারণ জায়গাটা দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। আমার অনুরোধেই যাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ওখানে গিয়ে গুহার মধ্যে আমাকে দেওয়া একটিমাত্র কাঁপাকাঁপা আলোয় কিছু মুহূর্ত আমি কাটিয়েছিলাম। ওই পাঁচ মিনিট আমি একা ছিলাম— ধ্যানস্থ ভাবে। ভাবছিলাম, জগতের শ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল ব্যক্তিদের অন্যতম সক্রেটিস কেন নিজের জীবন শেষ করে দিতে বিষ পান করেছিলেন। আমার মনে পড়ল তাঁর উক্তি যে, তাঁর সদুপদেশের মূল্য তাঁর জীবনের চাইতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সহসা সেই অন্ধকার গুহার ভেতরে একটা উজ্জ্বল আলোর মতো দেখা যেতে পারে— যেটা তাঁর এই পৃথিবীকে দিয়ে যাওয়া যুক্তির পরম্পরা।
২০০৫ সালে আমি সুইজারল্যান্ড সফরে গেছিলাম। বিমান থেকে অবতরণ করার পর আমার জন্য এক বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। উপরাষ্ট্রপতি আমায় অভ্যর্থনা জানিয়ে বলেছিলেন, আমার আগমন দিবসের স্মারক হিসেবে ২০০৫ সালের ২৬ মে দিনটি বিজ্ঞান দিবস হিসেবে রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল। সুইজারল্যান্ড সরকারের তরফ থেকে অবশ্যই এ এক অপ্রত্যাশিত ব্যঞ্জনাপূর্ণ কাজ। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে আমি এরজন্য ধন্যবাদ জানালাম। তিনি বললেন আমার লেখা দুটো বই ‘Ignited Minds’ এবং ‘India ২০২০’ তিনি পড়েছেন। লেখা পড়ে প্রভাবিত হয়ে তিনি মন্ত্রিসভায় সংক্ষিপ্তাকারে মহাকাশ এবং প্রতিরক্ষা বিজ্ঞান বিষয়ে আমার সম্পাদিত কাজ বিষয়ে বর্ণনা করেছিলেন এবং মন্ত্রিসভা স্থির করেছিল আমার সুইজারল্যান্ড পরিদর্শনের দিনটি বিজ্ঞান দিবস হিসেবে উদ্যাপিত হবে। ওখানকার বিজ্ঞান গবেষণাগার পরিদর্শন করা ও গবেষক, ছাত্র এবং অধ্যাপকের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। আমি জুরিখে স্যুইস ফেডারাল ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে গিয়েছিলাম, আইনস্টাইন জার্মানি থেকে এসে ওখানেই প্রথম পড়াশোনা করেছিলেন। ওখানে আমি বোস-আইনস্টাইন গবেষণাগারে গেছিলাম, যেখানে ৬ জন বিজ্ঞানী বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন পরীক্ষা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এখানেও আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ এবং ছাত্রদের উদ্দেশে অভিভাষণ দেবার সুযোগ হয়েছিল এবং আমি ‘প্রযুক্তি এবং জাতীয় উন্নয়ন’ বিষয়ে বক্তব্য রেখেছিলাম।
উপসংহারে ছাত্রদের আমি স্যর সি ভি রমনের উদ্বুদ্ধকারী উপদেশ শুনিয়েছিলাম, ‘আমাদের জয়ের উদ্দীপনা চাই, এমন চালিকাশক্তি চাই যা আমাদের এই পৃথিবীতে সঠিক জায়গায় বহন করে নিয়ে যাবে। এমন চৈতন্য চাই যা আমাদের গর্বিত সভ্যতার উত্তরসূরি হিসেবে এই গ্রহে সঠিক স্থান লাভ করতে সাহায্য করবে। যদি এই অপরাজেয় চৈতন্য জাগ্রত হয় তা হলে কোনও কিছুই আমাদের সঠিক ভবিতব্য অর্জনে প্রতিরোধ করতে পারবে না।’
আমি ড. নেলসন ম্যান্ডেলার কথা না বলে থাকতে পারি না। ওঁর সঙ্গে ২০০৪ সালে আমার দেখা হয়েছিল। এই মহান ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে দুটো মহৎ শিক্ষা পাওয়া সম্ভব— চৈতন্যের অপরাজয়তা এবং ক্ষমার মহত্ত্ব।
কেপটাউন মালভূমির জন্য বিখ্যাত, এর তিনটি শিখর আছে— টেবল পিক, ডেভিল পিক এবং ফেক পিক। সারাদিন ধরে এই শিখরগুলি ঘিরে অত্যন্ত মনোহর দৃশ্য দেখা যায়, যেমন লাগামছেঁড়া ভেসে থাকা মেঘ শিখরকে জড়িয়ে রেখেছে, কখনও সেগুলো কালো, কখনও-বা সাদা রঙের। আমরা হেলিকপ্টারে করে কেপটাউন থেকে রবেন দ্বীপে গিয়েছিলাম। ওখানে আহমেদ কাথরাদা আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। উনি নেলসন ম্যান্ডেলার সহবন্দি ছিলেন। দেখে আশ্চর্য লেগেছিল যে, প্রায় ছয় ফুট লম্বা ম্যান্ডেলা বর্ণবৈষম্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন বলে তাঁকে ২৬ বছর কারাগারে একটা ছোট ঘরে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। জীবনের বেশিরভাগ সময় তাঁকে ওই দ্বীপে নির্বাসিত অবস্থায় কাটাতে হয়েছে। তাঁকে কাছাকাছি কোনও পাহাড়ের পাথর খাদান থেকে পাথর তোলার জন্য প্রখর সূর্যের তাপে কয়েক ঘণ্টার জন্য নিয়ে যাওয়া হত। সেসময়ই তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এত অত্যাচার সত্ত্বেও তাঁর প্রাণশক্তি অটুট ছিল। যখন প্রহরীরা ঘুমোতে যেত সেসময় তিনি লিখতেন। এভাবেই তিনি লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত বই ‘Long walk to Freedom’।
