মনে হয় ২০০৬ সাল নাগাদ, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সভাপতি Josep Borrell Fontelles-এর সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ভবনে আমার দেখা হয়েছিল। কথোপকথনের সময় তিনি এমন একটা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন যা আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। আলোকপ্রাপ্ত নাগরিকের বিকাশ বা Evolution of Enlightened Citizens বিষয়ে তিনি আমার ওয়েবসাইট থেকে জেনেছিলেন। তিনি এ-বিষয়ে অসংখ্য প্রশ্ন করেছিলেন। সেগুলো ছিল সুগভীর, সুচিন্তিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ। আলোচনা শেষে তিনি আমায় ইউরোপীয় সংসদে অভিভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। সংসদে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭৮৫ জন সদস্য সাতাশটা সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। সংসদ হল একমাত্র প্রতিষ্ঠান যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্বারা সরাসরি নির্বাচিত। তিনি আমায় তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদকাল ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হওয়ার আগে অভিভাষণ দেবার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন। যাই হোক, ২০০৬ সালে আমার নানা পূর্বনির্ধারিত প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যস্ততার কারণে সে অনুরোধ রাখতে পারিনি। শেষপর্যন্ত ২০০৭ সালের ২৫ এপ্রিল আমি অভিভাষণ দিয়েছিলাম, তখন ইতিমধ্যে Hans Gert Pottering রাষ্ট্রপতি হিসেবে Fontelles-এর হাত থেকে কর্মভার নিয়েছিলেন।
যেহেতু এই অভিভাষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল তাই ভ্রমণসূচি ঘোষণা করবার অনেক আগে থেকে আমি প্রস্তুতি নিতে শুরু করে দিয়েছিলাম। বন্ধু, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা, বিজ্ঞানী এবং তরুণদের সঙ্গে আমার চিন্তাউদ্রেককারী অধিবেশন হয়েছিল। বিশেষ করে এই উপলক্ষে আমি একটি কবিতা রচনা করেছিলাম ‘ধরিত্রীমাতার বার্তা’ বা ‘Message from Mother Earth’। এই কবিতাটিতে প্রতিফলন ঘটেছিল কীভাবে ইউরোপীয় জাতিগুলি একে অপরের সঙ্গে হিংস্র যুদ্ধে রত ছিল এবং পরে সাফল্যের সঙ্গে ইউরোপীয় সংঘে পরিণত হল— প্রতিটি সদস্যরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, শান্তি ও আনন্দের প্রতি লক্ষ্য রেখে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে অবশ্যই এ এক অগ্রণী পদক্ষেপ।
যখন ২৫ এপ্রিলের ভোরে আমি ইউরোপীয় সংসদে পৌঁছলাম তখন রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর সহকর্মীরা আমায় স্বাগত জানালেন। ইউরোপীয় সংঘের ৭৮৫ জন প্রতিনিধি এবং সংসদে দর্শনার্থীর ভিড়ে উপচে পড়া গ্যালারি সত্যি সত্যি মনকে অভিভূত করার মতো দৃশ্য।
ওই উপলক্ষে আমার অভিভাষণের শিরোনাম ছিল ‘জাতির ঐক্যের গতিময়তা’ বা ‘Dynamics of Unity of Nations’। ভারতবর্ষের ইতিহাসগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সভ্যতাসমূহের দ্বন্দ্বের পরিবর্তে তাদের একত্রে প্রবাহিত হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। আমার বক্তৃতা আলোকপ্রাপ্ত নাগরিকত্বের বিকাশের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছিল, যার তিনটি অংশ ছিল— মূল্যবোধব্যবস্থা-সহ শিক্ষা, ধর্মের আধ্যাত্মিকতায় রূপান্তর, এবং জাতীয় উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সমাজের রূপান্তর।
এ ছাড়াও আমি ভারতবর্ষ এবং ইউরোপে শক্তিক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলাম এবং একে বাস্তবায়িত করার পদ্ধতির রূপরেখা অঙ্কিত করেছিলাম। আমার বক্তৃতা পর্যায়ক্রমে অভিনন্দিত হয়েছিল অভিভাষণের শেষে, সমস্ত সদস্যর অনুমতি নিয়ে আমি এই উপলক্ষে রচিত আমার কবিতা পাঠ করেছিলাম—
ধরিত্রীমাতার বার্তা
মনোরম পরিবেশ
সুন্দর মনের দিশা দেখায়;
সুন্দর মন তৈরি করে,
সতেজতা আর সৃষ্টিশীলতা।
তৈরি করেছে দেশ ও সমুদ্র অনুসন্ধানকারীর দল,
তৈরি করেছে আবিষ্কার করার মন,
তৈরি করেছে বৈজ্ঞানিক মানসিকতা,
সব জায়গায় তৈরি করেছে, কেন?
অনেক আবিষ্কারের জন্ম দিয়েছে,
খুঁজে পেয়েছে এক মহাদেশ আর
অনেক অজানা দেশ,
অনেক না-জানা পথের সন্ধান পেয়েছে,
কত নতুন রাজপথ তৈরি করেছে।
সবচেয়ে ভাল মনের ভেতরে
শয়তানও জন্ম নেয়;
যুদ্ধ ও ঘৃণার বীজ জন্মায়
শত শত বছর ধরে চলে যুদ্ধ আর রক্তক্ষয়।
আমার লক্ষ লক্ষ অপূর্ব সন্তানেরা
কত দেশ ও সাগরে হারিয়ে গেছে;
অশ্রুজলে প্লাবিত হয়েছে কত দেশ
দুঃখের সাগরে লুপ্ত হয়েছে কত লোক।
তারপর, তখন এল ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বপ্ন
তারা শপথ নিল,
মানবের জ্ঞানকে কখনওই
আমাদের অথবা অন্যদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাব না।
তাদের এই চিন্তার সমন্বয় প্রচেষ্টা,
কাজ করেছে।
ইউরোপকে সমৃদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ করতে,
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্ম হল।
ওই খুশির তরঙ্গগুলি মোহিত করেছিল
সকল জায়গার সকল মানুষকে।
হে! ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তোমার লক্ষ্য
সর্বত্র ছড়িয়ে দাও, শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাস যেমন
ছড়িয়ে যায়।
কবিতাপাঠ শেষ হওয়ার পর সাংসদদের আলোড়ন এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় আমি অভিভূত হয়ে গেছিলাম। শ্রোতারা উঠে দাঁড়িয়ে যে অভ্যর্থনা আমায় জানালেন তা নিঃসন্দেহে আমাদের দেশের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। প্রত্যুত্তরে আমি ভারতবর্ষের একশো কোটি নাগরিকের শুভেচ্ছাবার্তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রসমূহকে জানালাম। আমার অভিভাষণের পরে রাষ্ট্রপতি পটারিং উপসংহারে যা বললেন আমি তা উদ্ধৃত করছি, ‘মাননীয় রাষ্ট্রপতি আবদুল কালাম, ইউরোপীয় সংসদের পক্ষ থেকে, সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎসাহব্যঞ্জক বক্তৃতার জন্য আমি আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। এরকম অসাধারণ বক্তব্য আমরা কখনও কোনও রাষ্ট্রনায়ক, বৈজ্ঞানিক এবং কবির কাছ থেকে কখনও শুনিনি। এ বক্তৃতা অতুলনীয়। মহান দেশ ভারতবর্ষের শুভেচ্ছা কামনা করি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মহান রাষ্ট্র ভারতবর্ষের মধ্যে সহযোগিতার শুভেচ্ছা কামনা করি এবং রাষ্ট্রপতির শুভেচ্ছা কামনা করি।’
