মানসিক সমন্বয়ের লক্ষ্যে আমাদের সকলের কাজ করা খুব প্রয়োজনীয় বলে আমি বিশ্বাস করি। অন্যের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি এবং অন্যের জীবনযাত্রা বা ধর্মের প্রতি ঘৃণা বৃদ্ধি বা এই মনোভাবের বিভিন্নতা মানুষের বিরুদ্ধে যখন নীতিহীন হিংসার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তাকে কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না। আমাদের সবাইকে পরিশ্রম করতে হবে এবং ব্যক্তির অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টায় সক্রিয় হতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের এই ভিত্তিকে আমি আমাদের সভ্যতার ঐতিহ্য বলে মনে করি যা আমাদের দেশের পরমাত্মা।
দু’দিনের সফরসূচির শেষে প্রচারমাধ্যম আমার কাছ থেকে একটা বার্তা আশা করেছিল, তাই এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। আমি এক বক্তব্যের মাধ্যমে আমার মনোভাব প্রকাশ করেছিলাম যে, সাম্প্রদায়িক এবং অন্যান্য যাবতীয় দ্বন্দ্বকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার জন্য এক ঐকান্তিক আন্দোলনের এবং মানসিক সমন্বয় সাধনের প্রয়োজন আছে।
.
প্রত্যেক ব্যক্তির তার নিজের ভাষা-সংস্কৃতি এবং ধর্মবিশ্বাসের অনুশীলন করার মৌলিক অধিকার আছে। আমরা কোনওভাবে তা বিঘ্নিত করতে পারি না।
১০. প্রবাসে সমান স্বচ্ছন্দ
১০. প্রবাসে সমান স্বচ্ছন্দ
আমি বিশ্বনাগরিক।
প্রতিটি নাগরিক আমার আত্মীয়॥
কর্মজীবনের আগাগোড়া যেহেতু আমি নানা ধরনের সময়সীমা নির্দিষ্ট জাতীয় কর্মভারে ব্যস্ত ছিলাম তাই সেভাবে আমি কখনও বিদেশভ্রমণ করতে পারিনি। যাই হোক, দেশের প্রথম নাগরিক হিসেবে বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের ভারতে অভ্যর্থনা জানানো এবং বিদেশি রাষ্ট্র পরিদর্শনের মাধ্যমে আমাদের প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন সরকারি কার্যকলাপের মধ্যে পড়ে। যখনই বিদেশি প্রতিনিধিরা আমাদের দেশে এসেছেন তখনই রাষ্ট্রপতি ভবনের উৎসাহী কর্মীবৃন্দ অক্লান্ত পরিশ্রমের দ্বারা তাঁদের আতিথেয়তা প্রদর্শনে কোনও অভাব রাখেননি এবং আমাদের দেশের অর্জিত নৈপুণ্য তাঁদের প্রদর্শন করেছেন। আমার কাছে এই ধরনের সফরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতা কীভাবে জ্ঞাপন করা হবে এবং আমাদের নিজেদের উপকারের জন্য কীভাবে অন্য দেশের রীতিনীতি শিখব। এর থেকেই বিশ্ব জ্ঞানমঞ্চের ধারণার জন্ম হয়, যা আমার মধ্যে জাগ্রত হয়েছিল অনেক বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার ফলস্বরূপ। পরিবেশের অবনমনজনিত উদ্বেগ-চিন্তা ভাগ করে নিয়েছিলাম এবং শক্তিক্ষেত্রে স্ব-নির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা আমরা আলোচনা করেছিলাম। আমরা বিদেশি অতিথিদের ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি, ই-গভর্ন্যান্স এবং ভেষজ শিল্পে সক্ষমতা দেখিয়েছিলাম। প্রতিটি সাক্ষাৎ পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক বা নানাদিক সমন্বিত লাভজনক প্রায়োগিক কার্যক্রমের দিকে পরিবর্তিত হত দেখে আমি খুশি হয়েছিলাম।
আমার প্রতিটি বিদেশভ্রমণ তার নিজের কারণে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সুদানে, দেশের দক্ষিণাংশ থেকে রাজধানী খার্টুম অবধি একটা জ্বালানি তেলের পাইপলাইন নির্মাণকেন্দ্রিক আলোচনা হয়েছিল। এর জন্য খরচের হিসাব ধরা হয়েছিল প্রায় এক বিলিয়ন ডলার, যাতে ভারতের সহযোগিতা থাকবে। আজ সুদান থেকে ভারতে তেল পরিবাহিত হচ্ছে। ইউক্রেনে প্রচণ্ড ব্যস্ত কর্মসূচি ছিল। ইউক্রেন পরিদর্শন মহাকাশ ক্ষেত্রে সহযোগিতায় অগ্রগমন ঘটিয়েছিল। যাই হোক, আমি এইসমস্ত সফরের শুধু কিছু তাৎপর্যময় ঘটনাবলি পরিবেশন করব। আমি ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়েছিলাম, রাষ্ট্রপতি Thabo Mbeki-র জোহানেসবার্গে প্যান আফ্রিকীয় সংসদ ভবনে আমায় অভিভাষণ দিতে অনুরোধ করেছিলেন, ওই সংসদ তিপ্পান্নটা আফ্রিকান রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেছিল। আমি সন্তুষ্টচিত্তে এই অনুরোধ স্বীকার করেছিলাম এবং যখন আমি বা আমার সঙ্গীরা বক্তৃতা তৈরি করছিলাম তখন ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় কর্মদক্ষতাগুলির সঙ্গে আফ্রিকা জাতিকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে আমরা কী নিবেদন করতে পারি বিবেচনা করতে হয়েছিল। এই ঘটনা সমগ্র আফ্রিকান ই-নেটওয়ার্ক ধারণার উদ্ভব ঘটাল, যা ভারত এবং আফ্রিকার বারোটা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সতেরোটা স্পেশালিটি হাসপাতালের থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং ই-গভর্ন্যান্স পরিষেবা নিবেদন করতে পারে, এ ছাড়া প্যান আফ্রিকীয় রাষ্ট্রগুলোর সব রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে যোগাযোগ সংস্থাপন করতে পারে যাতে তাঁরা পারস্পরিক ধ্যানধারণা বিনিময় করতে পারেন।
বিশেষজ্ঞরা ই-নেটওয়ার্ক স্থাপনা করতে প্রাথমিক সম্ভাব্য ব্যয় ৫০ মিলিয়ন ডলার থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার নির্দেশ করেছিলেন। প্যান আফ্রিকান সংসদে প্রস্তাবনা পেশ করার আগে আমি প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং-কে সংক্ষিপ্তাকারে সব জানিয়েছিলাম। তিনিও মনে করেছিলেন এ প্রস্তাবনা ভারত সরকারের ফোকাস আফ্রিকা (Focus Africa) বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্যান আফ্রিকার রাষ্ট্রসমূহ ও ভারতবর্ষের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম।
প্যান আফ্রিকান ই-নেটওয়ার্ক প্রজেক্ট এখন যথেষ্ট পরিমাণে গতিবেগ অর্জন করেছে যা ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছে। আজকের দিনে আন্তর্জাতিক সামাজিক দায়িত্ব পালনে ই-নেটওয়ার্ক একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
