নরসিংহ রাও অসম্ভব স্বচ্ছ চিন্তাশক্তিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন, দেশের উন্নয়নমূলক সমস্ত বিষয় তাঁর করায়ত্ত ছিল। একবার, তিনি যখন প্রতিরক্ষা পরামর্শদাতা কমিটির সভাপতিত্ব করছেন, তখন ASC (Army Supply Corps) জোগান এবং পরিবহণের মহানির্দেশক দুগ্ধজাত খামার-এর উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব এবং পরিকল্পনার আধুনিকীকরণ বিষয়ে একটা প্রেজেন্টেশন করছিলেন। প্রেজেন্টেশন চলাকালীন মহানির্দেশক উল্লেখ করেছিলেন, মহিষের বদলে সে জায়গায় জার্সি গোরু আনতে চান। রাও তত্ক্ষণাৎ বুঝতে পারলেন আমাদের দেশের পক্ষে মহিষ তুলনাহীন, কেননা এদের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সস্তা খোরাক ও খাদ্যে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব— পরিবর্তে পাওয়া যায় উচ্চমাত্রার প্রোটিনযুক্ত দুধ। এ ধরনের দেশীয় লাভজনক সম্পদ দেশ হারাতে পারে না। এখান থেকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্রস্তাব পুনরায় পর্যালোচিত হবে এবং সেনা দুগ্ধ খামার জরুরি সংশোধনীয় ক্রিয়া গ্রহণ করবে।
অন্য এক ক্ষেত্রে ১৯৯৫ সালে কোনও একসময় যখন আমি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আত্মনির্ভরশীলতার ওপর প্রতিবেদন পেশ করছিলাম, রাও চটজলদি পর্যবেক্ষণ করলেন যে আমরা এমন এক ব্যবস্থা রাখছিলাম যে, প্রতিরক্ষা ব্যয় যেন মোট অন্তর্দেশীয় উৎপাদন বা জিডিপি-র (গ্রস ডোমেস্টিক প্রডাক্ট) ৩ শতাংশে কম থাকে। তিনি বলেছিলেন এরকম কোনও সীমা নির্দিষ্ট করা উচিত নয়। বরং রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যা-কিছু অত্যাবশ্যকীয় তার ওপর কাজ করা উচিত। জিডিপি হয়তো ক্রমাগত পরিবর্তনশীল হবে, কিন্তু তার দরুন আমাদের ব্যয় বাড়বে-কমবে তা অভিপ্রেত নয়।
আরও একটা উদাহরণের কথা আমার মনে পড়ে— প্রযুক্তি প্রদর্শকের কার্যকলাপের অতিরিক্ত ডিআরডিও-কে অগ্নি উৎক্ষেপণ ব্যবস্থার লাগাতার অনুসন্ধান ব্যবস্থার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হত, যা সেনাবাহিনীতে যোগ করতে পারত। রাও অবিলম্বে প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এক পৃষ্ঠার প্রস্তাবনায় বিনা প্রশ্নে ৪০০ কোটি টাকা মূল্যের কার্যক্রমের অনুমোদন দিয়েছিলেন। সময়মতো কার্যনির্বাহ এবং সেনাবাহিনীতে উৎক্ষেপণ অস্ত্র প্রেরণ করার জন্য প্রয়োজনভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থার নকশা গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে, এই কার্যক্রম ড. মনমোহন সিং-এর অনুমোদন পেয়েছিল, সাধারণ নিয়মে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পৌঁছনোর আগে যাঁর কাছে পৌঁছনোর কথা। পরে এই নথি কার্যনির্বাহের নিয়মশৃঙ্খলায় ভারত সরকারের সচিবদের কাছে পৌঁছেছিল। কোনও কার্যক্রমের ধারণা, অনুমোদন এবং প্রয়োগসাধনের এ এক বিপরীত কর্মপ্রণালীর উদাহরণ।
পরবর্তীকালে, ২০০৪ সালে আমার ড. সিং-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তাঁর সমগ্র অর্থনীতি সংক্রান্ত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি বর্ধিত করেছিলেন, সাম্প্রতিককালে যা ৭ শতাংশ উচ্চতায় পৌঁছেছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে তিনি এক উষ্ণ এবং মানবিক স্পর্শ এনেছিলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ীর মধ্যে আমি যে-কোনও সিদ্ধান্তগ্রহণে তৎপরতাবোধ লক্ষ করেছিলাম। ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার প্রথম করণীয় হিসেবে তিনি আমাকে পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পাদনকার্য দিলেন। সাধারণভাবে বলা যায়, জাতীয় কোনও সমস্যা নিয়ে নিজের কাজ করার ক্ষেত্রে বাজপেয়ী দ্বিধাহীন। আমি আগেই বলেছি, ২০০২ সালের অগস্ট মাসে লালকেল্লার প্রাকার থেকে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ভারতবর্ষ ২০২০ সালের মধ্যে এক উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাবে। ১৯৯৮ সালে এইচ ডি দেবেগৌড়া প্রথমবার ইন্ডিয়া ২০২০-কে জাতীয় কার্যক্রম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
.
সৎ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ এক শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ধরনের ব্যক্তিদের সাক্ষাৎলাভে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করি।
০৯. আমার গুজরাত পরিদর্শন
৯. আমার গুজরাত পরিদর্শন
দেবদূত মুক্ত কারণ তার আছে জ্ঞান,
অজ্ঞানতার জন্য পশুও মুক্ত,
এই দুই-এর মাঝে সংগ্রাম করে মানবসন্তান।
—রুমি
আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি, উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ হল আমাদের এমন এক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে যেখানে দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল হবে এবং অশিক্ষা দূরীভূত হবে। এর পাশাপাশি আমাদের প্রয়োজন এমন এক সমাজের উদ্ভব ঘটানো যেখানে নারী এবং শিশুর বিরুদ্ধে অপরাধ থাকবে না এবং সমাজের কেউ নিজেকে বিচ্ছিন্ন ভাববে না। আমি রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করার ঠিক পরেই প্রথম গুরুতর দায়িত্বভার হিসেবে ২০০২ সালের অগস্ট মাসে যখন গুজরাত পরিদর্শনে গেছিলাম তখন এই চিন্তাগুলো আমার মনের মধ্যে প্রবলভাবে কাজ করছিল। মাত্র কয়েক মাস আগে ওই রাজ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল এবং তার দরুন হাজার হাজার মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু রাজনৈতিক সংকটাকুল পরিবেশের অনন্যসাধারণ পরিস্থিতিতে পরিদর্শনে যাওয়া হয়েছিল ফলে এটা একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর দায়িত্বভার ছিল। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, আমার লক্ষ্য হল কী হয়েছিল বা কী হচ্ছে তা দেখা নয় বরং কী হওয়া উচিত সেদিকে মনোনিবেশ করা। যা হয়েছিল তা ইতিমধ্যেই বিচারবিভাগ এবং সংসদে এক আলোচ্য বিষয়, এবং এখনও সে আলোচনা ধারাবাহিকভাবে হয়ে চলেছে।
