আমাদের দু’জনের মধ্যে খুব সামান্যই মিল আছে। তিনি তামিল আর আমি তামিল ভাষায় মাত্র দুটো শব্দ জানি—ওয়ানাক্কাম আর আই-আই-য়ো। তিনি বিজ্ঞানসাধক হওয়া সত্ত্বেও অত্যন্ত ধার্মিক। আমি একজন অজ্ঞেয়বাদী এবং বিশ্বাস করি বিজ্ঞান এবং ধর্ম একসঙ্গে পথ চলতে পারে না। একটা হল যুক্তিনির্ভর, আর একটা হল বিশ্বাসনির্ভর। ওঁর সঙ্গে কথা বলে এবং ওঁর লেখা পড়ে মনে হল মহাত্মা গাঁধীর মতোই এঁর ধর্মবিশ্বাস। বাপুর সব মতবাদ গ্রহণ করার অক্ষমতা সত্ত্বেও আমি নিজেকে গাঁধীবাদী বলি। কালামও বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে কোনও দ্বন্দ্ব দেখেন না। যখন আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম যে তিনি কি “শেষ বিচারের দিন” এবং আমাদের সকলকে জীবনের পরে পুরস্কার অথবা শাস্তি নিতে হতে পারে এই বিষয়টি বিশ্বাস করেন, তিনি পাশ কাটানো উত্তর দিলেন, ‘স্বর্গ এবং নরক মনের মধ্যে থাকে…।’
সুতরাং ঈশ্বর সম্পর্কে কালামের মত তা হলে কী? আল্লাহ বনাম ঈশ্বর, খোদা বনাম ভগবান তো নয়। তাঁকে মসজিদ বা মন্দিরে খুঁজে পাওয়ার নয়। তাঁকে যুদ্ধ করে বা আত্মোৎসর্গে খুঁজে পাওয়া যায় না— যেমন আমাদের দেশের বিভিন্ন ধর্মের মূল প্রচারকরা করে থাকেন। তাঁরা একে অপরের রক্তপাত করার পর ঈশ্বরসম কণ্ঠে বজ্র ঘোষণা ওঠে:
আলোক থেকে সহসা বজ্রনিনাদ গর্জিত হল
‘শোনো সবাই! আমি তোমাদের কারও নই!
প্রেম ছিল আমার ব্রত, আর তোমরা ঘৃণায় তা অপচয় করেছ,
আমার হর্ষকে হনন করে, জীবনকে শ্বাসরোধ করে।
জেনো: খোদা আর রাম
উভয়েই এক, ভালবাসায় তাঁরা প্রস্ফুটিত।’
কোনও যুক্তিবাদী ঈশ্বরত্ব সম্বন্ধে কালামের দৃষ্টিভঙ্গি সমালোচনা করতে পারবেন না। কেউ ঈশ্বরকে দেখেন সত্যরূপে, কেউ প্রেমরূপে। কালামের কাছে ঈশ্বরত্ব হল সহানুভূতি…।’
আমি ওঁর রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিলাম, কারণ আমি মনে করি খুশবন্তের মতো লেখকের আমার লেখা নিয়ে অতটা সময় ধরে পর্যালোচনা করা এবং ঈশ্বর, ধর্ম ও সৎ মানুষ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক গুণ সম্পর্কে আমার অভিমত নিবেদন করা আমার বিবেচনায় খুব বিরল সৌভাগ্য।
দানেই আমাদের প্রাপ্তি
অবশ্যই আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ ধনসম্পদে সৌভাগ্যবান। আমি এখানে এমন এক ব্যক্তির কথা বলব যিনি মুক্তহস্তে দান করেছেন এবং সারা বিশ্বে আনন্দ বিতরণ করেছেন। ২০০৭ সালে আমি শ্রীশ্রীশিবকুমার স্বামীগালুর শততম বার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠান উদ্বোধন করার অনুরোধ নিয়ে সিদ্ধগঙ্গা মঠে এক ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ পেলাম। ওখানে পৌঁছে দেখলাম লক্ষ লক্ষ ভক্ত আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন স্বামীজিকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য জমায়েত হয়েছে। মঞ্চে অনেক রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মগুরুও আসীন ছিলেন। তাঁদের বক্তব্য রাখা হয়ে গেলে স্বামীজি এলেন। কোনও লিখিত বিবৃতি ছাড়াই ভক্তকুলের উদ্দেশে তাঁর আশিসবাণী তাত্ক্ষণিক বক্তৃতার মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলেন। আমি ওই দৃশ্য দেখে পরমবিস্মিত হয়েছিলাম। একশো বছর বয়সি ওই মহান নেতা ঋজু শরীরে, হাসিমুখে বক্তৃতা দিচ্ছেন এই দৃশ্য আমায় নিজেকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছিল কীভাবে তিনি নিজের শক্তি এবং উৎসাহ এত সুন্দরভাবে বজায় রেখেছেন। এর একমাত্র কারণ আমি মনে করি, তিনি মুক্ত হস্তে দান করেছেন। শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অগুনতি অনাথাশ্রম এবং প্রতিদিন হাজার হাজার দুঃস্থ মানুষকে খাদ্যদানের মাধ্যমে প্রভূত দান করেছেন। ওঁর অক্লান্ত সেবাব্রত এবং অশিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য বিলোপসাধনের প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে ওই অঞ্চলের অনেক মানুষকে উন্নীত করেছিল। আমি এটা লিখতে অনুপ্রাণিত হলাম—
আমি কী দিতে পারি?
হে আমার সহ-নাগরিক বন্ধু,
তুমি দিয়ে দেহমনে অশেষ আনন্দ পাও।
তোমার দেবার সবকিছু আছে।
যদি তোমার জ্ঞান থাকে, বণ্টন করো।
যদি তোমার সংস্থান থাকে, নিঃস্বকে দান করো।
হৃদয় আর মস্তিষ্ক ব্যবহার করে
পীড়িতের যন্ত্রণা দূর করো
ব্যথিত হৃদয়কে উৎফুল্ল করো,
দেবার বদলে পাবে অপার আনন্দ।
সর্বশক্তিমান তোমার সমস্ত কর্মোদ্যোগ আশীর্বাদ করবেন।
প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে ধ্যানধারণার আদানপ্রদান
ডিআরডিএল-এর অধিকর্তা প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা, ক্যাবিনেটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা হিসেবে এবং ভারতের রাষ্ট্রপতি পদমর্যাদাকালে অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে ধ্যানধারণা আদানপ্রদানের সৌভাগ্য আমার হয়েছে, যেমন-ড. সতীশ ধাওয়ান, ড. রাজা রামান্না, ড. ভি এস অরুণাচলম, আর ভেঙ্কটরামন, পি ভি নরসিংহ রাও, এইচ ডি দেবেগৌড়া, আই কে গুজরাল, অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং ড. মনমোহন সিং। এই যোগাযোগ ভীষণ অর্থবহ ছিল এবং আমার হৃদয়ে এক চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে গিয়েছিল। আমার ঊর্ধ্বতন কর্তা এবং ইসরো প্রধান ড. সতীশ ধাওয়ানের কাছ থেকে শিখেছিলাম কোনও জটিল লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে হলে সবসময় তার চ্যালেঞ্জ এবং সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি বলতেন কখনও কোনও সমস্যা যেন তোমার নিয়ামক না হয়। তুমি হবে সমস্যার পরিচালক। সমস্যাকে পরাজিত করো ও সাফল্য লাভ করো। কোনও জটিল কর্ম সম্পাদনে নিযুক্ত যাঁরা, তাঁদের কাছে এ এক মহৎ শিক্ষা। ড. রাজা রামান্না এবং ড. অরুণাচলম কোনও ব্যক্তির যোগ্যতা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে এবং জটিল কর্ম সম্পাদনের উপযুক্ত ব্যক্তি নিযুক্ত করার কুশলতা প্রদর্শন করেছিলেন। আর ভেঙ্কটরামন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমাদের দেশের প্রতিরক্ষার জন্য ব্যাপকাকারে সশস্ত্র বহুগুণক ব্যবস্থার চাহিদা আন্দাজ করে এ কার্যক্রমে উত্তরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, যা আজকের দিনে বহুল পরিমাণে কাজে আসছে।
