আমার দাদার মেয়ে নাজিমা এবং নাতি গুলাম কে মউনুদ্দিনের কথাবার্তা থেকে আমার এই উপলব্ধি হয়েছিল, যদি সুযোগ দেওয়া হয়, মানুষের প্রতি ভালবাসার অবারিত নদী বিভেদের সব চিহ্নকে মুছে ফেলতে পারে।
ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ’
আমি যখন ২০০৬-এ কোয়েম্বাটুর পরিদর্শনে গেছিলাম তখন ফিল্ড মার্শাল-এর কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনে একটা টেলিফোন এসেছিল। যখন আমায় সংবাদ প্রেরণ করা হল আমি বলেছিলাম, ওয়েলিংটনে সেনাবাহিনীর হাসপাতালে আমি অবশ্যই ওঁর সঙ্গে দেখা করব। ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপের কথা বলি—
১৯৯০-র নাগাদ একবার আমি যখন ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিমানে চড়ে যাচ্ছিলাম, আমার সহযাত্রী ভদ্রলোক ছিলেন ফিল্ড মার্শাল এম এইচ এফ জে ‘স্যাম’ মানেকশ’। আমি নিজের পরিচয় দিয়েছিলাম রক্ষামন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে। তাঁকে এ কথা বলাতে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কি অতি সজ্জন ব্যক্তি?’ তাঁর পরের প্রশ্ন ছিল, ‘আপনার বয়স কত?’ উত্তরে জানালাম আমার বয়স উনসত্তর বছর। শুনে তিনি বললেন, ‘আপনি তো নেহাতই বাচ্চা!’ আমি কখনও ভাবিনি যে আমি ফিল্ড মার্শালকে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বময় কর্তা হিসেবে পাব। যে মুহূর্তে আমি ওঁর ঘরে ঢুকলাম উনি সবাইকে বাইরে যেতে বললেন। আমায় উনি কাছে বসতে বলে আমার হাত দুটি ধরে বললেন, ‘কী অসাধারণ রাষ্ট্রপতি আপনি, আমি যখন ক্ষমতায় নেই আপনি তখন একজন সৈনিককে সম্মানিত করছেন।’ আমায় দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন। বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, শয্যাশায়ী, তবুও তখনও তাঁর মনে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কার্যোপযোগিতা সম্বন্ধে ভাবনাচিন্তা বজায় আছে। তিনি বললেন যে, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রতিপক্ষ এবং উদ্ভাবনী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কারণে সর্বদা শক্তিশালী করে রাখতে হবে। তিনি আমায় এক কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন করলেন, ‘কালাম আপনি কি বলতে পারেন আর এক দশকের মধ্যে বর্তমান অস্ত্রগুলি কি বরবাদ হয়ে যাবে এবং বৈদ্যুতিন আর সাইবার যুদ্ধপ্রযুক্তি তার জায়গা নেবে?’ ফিল্ড মার্শালের কাছ থেকে শোনা এই প্রশ্ন আমার মনে বারবার ঘুরে ফিরে আসছিল এবং আমি যখন কোনও এক মহান আধ্যাত্মিক নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পৃথিবী থেকে পারমাণবিক অস্ত্রসমূহ নির্মূল করা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলাম তখন আমার ভেতর থেকে প্রশ্নটা বেরিয়ে এসেছিল। আমি যখন ফিল্ড মার্শালকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কি আপনার জন্য কিছু করতে পারি?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি জানি না, কিন্তু একটা কথা আমি বলতে চাই— আমাদের দেশের ফিল্ড মার্শাল বা তার সম-পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে দেশের কাছে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে।’ এই মন্তব্য আমার মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে গেছিল।
দিল্লি আসামাত্রই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমার অন্যান্য কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য বৈঠক ছিল। আমি তাঁকে বলেছিলাম ফিল্ড মার্শাল মানেকশ’ দেশের জন্য যে মহান কর্তব্য করেছিলেন তার প্রতি আমাদের উপযুক্ত সম্মান জানানো উচিত। ওইদিন সাক্ষাৎকারপ্রার্থী উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের জন্য রাত্রিকালীন ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে সেনাবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর প্রধানদের কাছে আমি ফিল্ড মার্শাল মানেকশ’ এবং বিমানবাহিনী প্রধান অর্জুন সিং-এর উপযুক্ত সম্মানজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিলাম। তৎক্ষণাৎ আমার সচিব পি এম নায়ারকে ডেকে পাঠালাম। অতীতের ঘটনাবলি পর্যালোচনা করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে নোট তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠাতে বললাম। দেশের প্রতি তাঁর অবদানের প্রকৃতি বিবেচনা করে সরকার খুব সন্তুষ্টচিত্তে তাঁর বেতন পুনর্নির্ধারণ করলেন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম যে ফিল্ড মার্শাল স্যাম মানেকশ’-এর জীবদ্দশায় এই স্বীকৃতি প্রদান সম্ভব হয়েছিল।
অদ্বিতীয় খুশবন্ত
খুশবন্ত সিং-এর সঙ্গে পরিচয় হওয়া আমার কাছে এক মস্ত অভিজ্ঞতা, উনি এখন নব্বই বছর পার করেছেন। আমি ওঁর লেখা কিছু বই পড়েছি এবং ‘হিন্দুস্থান টাইমস্’ সংবাদপত্রে ওঁর কলামের (Column)-এর একজন উৎসাহী পাঠক। অনেকে প্রশ্ন করেছিলেন কেন আমি বিশেষ করে ওঁর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। আমার উত্তর ছিল আমি বই এবং তার লেখকদের পছন্দ করি। খুশবন্ত সিং একজন মহান লেখক এবং পঁচানব্বই বছর বয়সেও তিনি অবিরাম লিখে চলেছেন। তিনি ২০০৭ সালে তাঁর কলামে আমাকে নিয়ে লিখেছিলেন। আমি তার একটা সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে দিচ্ছি। এতে ঈশ্বর সম্বন্ধে ওঁর এবং আমার যে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণিত হয়েছিল, সেগুলো আমার চিন্তানুযায়ী যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক ছিল।
‘আর কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের প্রজাতান্ত্রিক দেশের একাদশতম রাষ্ট্রপতি আবদুল কালাম পাঁচ বছরের পূর্ণ মেয়াদকাল সমাপ্ত করে অবসরগ্রহণ করবেন। সর্বোচ্চ পদাধিকারী হিসেবে তিনি ছিলেন মুসলিম ধর্মের তৃতীয় ব্যক্তি। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে আমাদের দাবির এটাই এক সুষ্ঠু প্রমাণ এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের কাছে শিক্ষণীয়।
আমার কোনও ধারণা নেই অবসর গ্রহণের পর তিনি তাঁর গবেষণায় ফিরবেন, কি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবেন, না সন্ন্যাসধর্ম গ্রহণ করবেন। তিনি সত্তর বছর বয়স পার করেছেন। আমার একবার ওঁর সঙ্গে আধঘণ্টা কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। আমার গৃহে এসে তিনি আমায় সম্মানিত করেছিলেন। রাষ্ট্রের প্রধান যখন সাধারণ একজন কেরানির সঙ্গে দেখা করতে আসেন তখন তাঁর বিনম্রতাই প্রকাশ পায়।
