আমার দাদা যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়েছিলেন বলে এই পরিকল্পনাটা আমার হৃদয়ের খুব কাছের ছিল এবং তাঁর ধর্মবিশ্বাসই ছিল তাঁদের হজ তীর্থযাত্রায় পাঠানোর মূল চালিকাশক্তি। সৌদি আরবে আমাদের রাষ্ট্রদূত এই তীর্থযাত্রা সম্পর্কে জানতে পেরে আমায় রাষ্ট্রপতি ভবনে টেলিফোন করেছিলেন, এবং যে-কোনওরকম সাহায্যদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, রাষ্ট্রদূত মহাশয়, শুধু একটা অনুরোধ— আমার দাদার ইচ্ছে তিনি কোনও সরকারি সাহায্য ব্যতিরেকে একজন সাধারণ নাগরিকের মতো হজ তীর্থযাত্রায় যান। এ তাঁর ব্যক্তিগত মনোবাসনা। তীর্থযাত্রার জন্য হজ কমিটি যে সাধারণ পদ্ধতিতে যাত্রী নির্বাচন করেন আমার দাদা সে পদ্ধতির মাধ্যমেই নির্বাচিত হওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর নাতি নিজে গিয়ে নির্বাচন দপ্তরে দরখাস্ত জমা দিয়েছিলেন এবং কমিটির প্রচলিত যদৃচ্ছ নির্বাচন পদ্ধতিতে, ঈশ্বরের আশীর্বাদে তাঁদের বেছে নেওয়া হয়েছিল।
এই তীর্থযাত্রা নানা স্থানে, নানা ধর্মীয় অবশ্যকরণীয় কর্তব্যপালনের মধ্য দিয়ে পঞ্চাশ দিন ধরে চলেছিল।
দাদার সঙ্গে ওঁর কন্যা এবং নাতি ছিলেন, তীর্থযাত্রায় দাদাকে সাহায্য করার জন্য আমি ওঁদের দাদার সঙ্গে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু দাদা সব রকমের অসুবিধে আর অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হওয়ার জন্য বিশেষ প্রাণোচ্ছলতা এবং মানসিক জোর দেখিয়েছিলেন। তিনি শান্ত সমাহিতভাবে নাতিকে সমস্ত সিদ্ধান্ত নিতে অনুমতি দিয়েছিলেন এবং তার নির্দেশ কোনও অদলবদল না করে মেনে চলেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তীর্থযাত্রার সময় ওঁর নাতি প্রচণ্ড জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। দাদা ওই পরিস্থিতিতে সব দায়িত্বভার নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন, পরিবারের কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে যা তিনি সর্বদা করে থাকেন। মসজিদ দর্শন, খাওয়াদাওয়ার সমন্বয়সাধন, প্রয়োজন অনুসারে ডাক্তার তলবের দায়িত্বভার নিয়েছিলেন। ওঁর নাতি আমায় বলেছিল জ্বরের ঘোরে যতটুকু মনে পড়ে রাত্রে দাদা ওর বিছানার পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে অন্ততপক্ষে তিন ঘণ্টা ধরে প্রার্থনা করতেন। যখন নাতি সুস্থ হয়ে উঠল আবার তখন পূর্বেকার ছন্দে শান্তভাবে প্রার্থনায় ফিরে গেলেন।
ওঁর নাতি আমাকে শেষ ক’দিনে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তা বুঝিয়ে বলেছিল। মিনায় তাঁবুতে দিনযাপন করে আরাফতের দিকে তাঁরা এগিয়েছিলেন, আরাফত এমন একটা জায়গা যেখানে ৫০ লক্ষ তীর্থযাত্রী একত্রিত হয়। আমি বেশ কল্পনা করতে পারি দাদা আকাশের দিকে দু’ হাত তুলে প্রার্থনা করছেন।
এরকম এক দিন, দাদার নাতি মূল মসজিদের ওপরের তলে প্রার্থনা সেরে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসছিল। তীর্থযাত্রীদের সিঁড়ি ব্যবহার করতে হত, কেননা দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য চলমান সিঁড়ি বা এসকেলেটর বন্ধ করে দেওয়া হত। যদিও ওই মারাত্মক ভিড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামা যথেষ্ট কষ্টকর ছিল। ফলে ভিড়ের চাপে নাতির দেওয়ালে পিষে যাওয়ার উপক্রম হল। ওর শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, ছটফট করছিল। হঠাৎ ওর মনে হতে লাগল চারদিকের বাতাসের রুদ্ধচাপ একটু যেন হালকা হয়ে গেল এবং ওর চারদিকটা ফাঁকা হয়ে গেল। আসলে ওকে শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে দেখে আফ্রিকা থেকে আগত এক তীর্থযাত্রী এগিয়ে এসেছিলেন। নিজের শক্তসমর্থ চেহারা দিয়ে উপচে পড়া ভিড় থেকে আড়াল করে নাতিকে বাঁচিয়েছিলেন। যখন তাঁরা নীচের তলায় পৌঁছলেন ধন্যবাদ জানানোর সুযোগটুকু না দিয়ে ওই তীর্থযাত্রী কোথাও উধাও হয়ে যান।
দ্বিতীয় ঘটনাটা আরও উৎসাহজনক। আরাফতে প্রার্থনা জানানো হলে ওঁরা মিনায় ফিরলেন। সমস্ত ৫০ লক্ষ তীর্থযাত্রীকে একই দিনে টানা ১৫ কিমি রাস্তা ফিরতে হয়। দাদারা যে গাড়িতে ফিরছিলেন তার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র বিকল হয়ে গিয়েছিল। মরুভূমিতে তীব্র গরম অথচ আমার দাদা একবিন্দু জল বা খাবার গ্রহণ না করে সারা রাস্তা প্রার্থনা করছিলেন। প্রতি আধঘণ্টায় গাড়ি একটু একটু করে এগোচ্ছিল এবং তাঁরা টানা আট ঘণ্টা ধরে গাড়িতে ছিলেন। শেষপর্যন্ত গাড়ির চালক প্রস্তাব করল যেহেতু গন্তব্যস্থল আর আধঘণ্টাটাক পায়ে হাঁটার রাস্তা সুতরাং ওটুকু রাস্তা হেঁটে যাওয়াই ভাল। দাদার কাছে এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে মনে হল। নাতি দাদার আপত্তি সত্ত্বেও তাঁকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলল। যেতে যেতে রাস্তার একটা ফাটলের কাছে এসে তাঁরা আটকে গেলেন— এবার দাদাকে হুইলচেয়ার থেকে নেমে ফাটল পার হতে হবে। দু’জন তীর্থযাত্রী সমস্যা বুঝতে পেরে দাদাকে ইশারায় হুইলচেয়ারে বসে থাকতে বললেন। এমনকী তাঁর নাতি কিছু বলার আগেই দু’জন এসে হুইলচেয়ার দাদা-সহ তুলে ফাটলের ওপারে পার করে দিয়ে চলে গেলেন। এবারও তাঁরা ধন্যবাদ জ্ঞাপন করার সুযোগটুকু পেলেন না।
মাঝদালিফা নামক এক জায়গায় তীর্থযাত্রীদের খোলা প্রাঙ্গণে রাত্রিযাপন করতে হয়েছিল। মরুভূমিতে শীতের রাত্রে, খোলা আকাশের নীচে মাটিতে শুধু মাদুর পেতে শুতে হয়েছিল। পরনের হালকা কাপড় শীতে যথেষ্ট আরামদায়ক ছিল না। ভোরবেলায় শৌচাগারের সামনে সুদীর্ঘ লাইন। যারা বচসা করে সুযোগ পেতে অপারগ তারা শান্ত হয়ে ধৈর্যসহকারে প্রতীক্ষা করছিল। এরকম একটা লাইনে একজন মহিলা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় এক অল্পবয়সি মেয়ে এগিয়ে এসে ওঁর কাছে প্রার্থনা করল—শৌচাগারে ওকে আগে যেতে দেওয়া হোক, লাইনের আর সকলে ব্যাপারটা মহিলার সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিল। ভদ্রমহিলা সেই মেয়েটিকে যেতে দিলেন। একটু পরে আরও একজন বৃদ্ধা মহিলা এসে ওঁকে একই অনুরোধ জানালেন, ওখানে যারা উপস্থিত ছিল তারা প্রত্যেকেই ভাবছিল এতক্ষণ ধরে অপেক্ষায় থাকা ভদ্রমহিলা হয়তো দ্বিতীয়বার কাউকে সুযোগ দেবেন না। কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে দ্বিতীয়বারও ভদ্রমহিলা ওই বৃদ্ধা মহিলাকে তৎক্ষণাৎ যেতে দিলেন। একথা এখানে মনে রাখতে হবে যে, তাঁরা কিন্তু একে অপরের ভাষা জানেন না, আকারে ইঙ্গিতে তাঁরা মনের ভাব প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু এই ঘটনাংশ আমাদের শেখায় ছোট্ট ছোট্ট ব্যঞ্জনাপূর্ণ কাজ আমাদের জীবনকে মহৎ করে তোলে।
