উপহার:
আমি অনেকবার এই ঘটনাটি বলেছি, তাই এখন খুব সংক্ষেপে বলব। আমি যখন ছোট তখন আমার বাবা জনাব আভুল পাকির জয়নুলাবেদিন আমায় এক শিক্ষা দিয়েছিলেন। সময়টা ছিল ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতালাভের ঠিক পরবর্তী সময়ে। রামেশ্বরম দ্বীপে পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছিল এবং আমার বাবা গ্রামপরিষদের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁকে এজন্য নির্বাচন করা হয়নি যে, তিনি কোনও বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়ভুক্ত অথবা বিশেষ কোনও অর্থনৈতিক স্তরের মানুষ ছিলেন। তাঁকে তাঁর চরিত্রমাহাত্ম্যে ও একজন মহৎ মানুষ হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল।
যেদিন বাবাকে সভাপতি হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল সেদিন এক ভদ্রলোক আমাদের বাড়ি আসেন। আমি তখনও স্কুলে পড়ি, সেসময় জোরে জোরে আমার পড়া তৈরি করছিলাম, এমন সময় শুনলাম দরজায় কেউ করাঘাত করছে। রামেশ্বরমে তখন কেউ বাড়ির দরজা বন্ধ করত না। এক ভদ্রলোক আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে বাবার খোঁজ করলেন। বাবা তখন সান্ধ্য নমাজ পড়তে গেছেন শুনে তিনি বললেন, বাবার জন্য তিনি কিছু নিয়ে এসেছেন, শুধালেন সেগুলো রেখে যাওয়া যাবে কি না। আমি তাঁকে সেগুলো খাটিয়ার ওপর রাখতে বলে আবার পড়ায় মন দিলাম।
বাবা নমাজ সেরে ফিরে, খাটিয়ার ওপর একটা রুপোর প্লেট এবং উপহারসামগ্রী পড়ে থাকতে দেখে আমায় জিজ্ঞেস করলেন। আমি তাঁকে জানালাম যে এক ভদ্রলোক এসে ওসব ওঁর জন্য রেখে গেছেন। মোড়ক খুলে দেখা গেল দামি কাপড়ের সঙ্গে কয়েকটা রুপোর কাপ, কিছু ফল এবং মিষ্টি রয়েছে। সেসব জিনিসপত্র দেখে বাবা দারুণ বিরক্ত হলেন ও রেগে গেলেন। সবচেয়ে ছোট সন্তান হিসেবে আমি বাবার খুব আদরের ছিলাম। বাবাকেও আমি ভীষণ ভালবাসতাম। সেদিন প্রথম আমি বাবাকে অত রেগে যেতে দেখলাম এবং সেবার প্রথম বাবার হাতে আচ্ছামতো পিটুনি খেলাম। আমি ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলাম। পরে বাবা আমায় বুঝিয়েছিলেন কেন তিনি অত রেগে গেছিলেন, এবং পরামর্শ দিয়েছিলেন কখনও কোনও উপহার ওঁর অনুমতি ছাড়া যেন গ্রহণ না করি। তিনি হাদিস থেকে উদ্ধৃতি দিলেন, ‘পরমেশ্বর যখন মানুষকে কোনও কাজে নিযুক্ত করেন তিনি তাঁর প্রয়োজনের প্রতি খেয়াল রাখেন, এর বাইরে যদি কেউ কিছু গ্রহণ করে সেটা অবৈধ।’
তিনি আমায় বলেছিলেন, উপহার নেওয়া ভাল অভ্যাস নয়। উপহারের সঙ্গে কোনও উদ্দেশ্য জড়িত থাকে যা খুব বিপজ্জনক। ঠিক যেমন বিষধর সাপকে স্পর্শ করা পরিবর্তে বিষদংশন সহ্য করা। আশি বছর বয়সেও এই শিক্ষা আজও আমার মনে দাগ কেটে রেখেছে। ঘটনাটা গভীরভাবে আমার মনে মুদ্রিত হয়ে আমার মূল্যবোধ গঠনে সাহায্য করেছিল। এখনও কেউ যদি আমায় কোনও উপহার দিতে চায় আমার শরীর আর মন শিউরে ওঠে।
পরবর্তীকালে আমি মনুস্মৃতি বা মনুর বিধান পড়েছি-যাকে হিন্দু ধর্মভাবনায় মূলসূত্র হিসেবে মান্য করা হয়। সেখানেও বলা হয়েছে উপহার গ্রহণ করলে ব্যক্তির অন্তর্নিহিত ঐশ্বরিক শক্তি নির্বাপিত হয়ে যায়। মনু প্রতিটা ব্যক্তিকে উপহার গ্রহণের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। কারণ উপহার স্বীকার করলে গ্রহীতা দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ হন। পরিবর্তে তিনি কোনও অনৈতিক বা অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হন।
এক সযত্নলালিত মূল্যবোধ ব্যবস্থা
কয়েক মাস আগে, আমার বড় দাদা একদিন আমায় রামেশ্বরম থেকে ফোন করেছিলেন। তাঁর তখন পঁচানব্বই বছর বয়স। তিনি আমার সঙ্গে ফোনে বার্তালাপ শুরু করেছিলেন আমেরিকাবাসী আমার এক ভারতীয় বন্ধুর কথা দিয়ে— বন্ধুটি আমার দাদার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। আলাপচারিতার মধ্যে আমার বন্ধু দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন আমাদের বাসগৃহটি কত পুরনো। উত্তরে দাদা জানিয়েছিলেন বাড়িটা একশো বছরেরও আগে আমার বাবা তৈরি করেছিলেন। আমার ছোট ভাই এবং উপার্জনশীল নাতিরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন পুরনো বাড়িটা ভেঙে ওই জায়গায় নতুন বাড়ি করার। আমার বন্ধুটি বলেছিলেন ওরকম ঐতিহাসিক স্থান ধ্বংস করা তাঁর মনঃপূত নয়। তাঁর ইচ্ছা কোনও অছির মাধ্যমে এমন একটা ব্যবস্থা করা যাতে বাসগৃহটা জাদুঘর ও গ্রন্থাগারে রূপান্তরিত হয়, পাশাপাশি আমার ভাই এবং তাঁর পরিবারের জন্য বিকল্প বসবাসের বন্দোবস্ত করা সম্ভব। দাদা আমায় ফোন করেছিলেন জানানোর জন্য যে, তিনি এই প্রস্তাবের বিরোধী— ‘আমি যে বাড়িতে বড় হয়েছি এবং ৯৫ বছর ধরে বাস করছি সে বাড়িতেই আমি থাকতে চাই। আমার যাবতীয় কিছু দিয়ে ওই জায়গাতেই একটা নতুন বাড়ি তৈরি করতে চাই— এ ছাড়া অন্য কোনও বন্দোবস্ত আমার পছন্দ নয়। তুমি তোমার বন্ধুকে সুন্দরভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে দিয়ো।’ দাদার কথায় আমি অভিভূত হয়ে পড়লাম যে, একজন মানুষ যিনি নিজের শর্তে বাঁচবেন এবং কারও কাছ থেকে কোনও সাহায্য নেবেন না, যতই তা অর্থবহ হোক-না কেন— আমার কাছে এ এক পরমশিক্ষা এবং বড়দাদার মধ্যে আমি আমার বাবার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছিলাম। বাবা একশো তিন বছর বয়স অবধি বেঁচে ছিলেন এবং আমাদের মধ্যে এই ধরনের ঐতিহ্য বদ্ধমূল গেঁথে দিয়েছিলেন।
এক হজ তীর্থযাত্রা
ব্যস্ত একটা দিন। লোকজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার, ফাইলপত্র পর্যালোচনা করার কাজকর্ম চলছিল। সেইসময় আমার দাদার নাতি মক্কা থেকে ফোন করল। ও আমার জীবনের অন্যতম এক মহান উদ্দেশ্য চরিতার্থ করেছিল। আমার পরিবারের তিনজন সদস্য এক স্মরণীয় আধ্যাত্মিক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিন প্রজন্মের তিনজন সদস্য ছিলেন— নব্বই বছর বয়সি আমার দাদা, তাঁর মেয়ে এবং নাতি। এই তিনজন ২০০৫-এর ডিসেম্বর মাসে চেন্নাই থেকে হজ তীর্থ করতে যাত্রা করেছিলেন।
