উন্নয়নকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিকাশের পথে যে-যে জটিল পুরনো আইন ও শাসনব্যবস্থামূলক কার্যপ্রণালী আছে সেগুলো শনাক্ত করা ও অপ্রয়োজনীয় বলে বাতিল করার লক্ষ্যে সংসদের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর দরুন সমাজের এক বৃহদাংশ যারা সৎ তাদের মনে কুসুমিত ও বিকশিত হওয়ার সুযোগ ও আশা জাগায়। আমি তাঁদের প্রণোদিত করেছিলাম যে ভারতবর্ষ অবশ্যই বিশ্বাসনির্ভর সুষ্ঠু প্রণালীর দিকে এগোবে এবং ওই মহান সংসদের সদস্যরাই একমাত্র সেই পরিবর্তন আনতে পারেন।
আমাদের লক্ষ্যে সাফল্য পেতে গেলে একত্রীভূত কাজের জন্য ভারতবর্ষের পাঁচটি মূল ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত সামর্থ্য আছে— ১. কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ২. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা, ৩. পরিকাঠামো: বিশ্বাসযোগ্য এবং গুণগত বিদ্যুৎশক্তি, ভাল সড়ক ব্যবস্থা এবং দেশের সমস্ত প্রান্তের জন্য অন্যান্য পরিকাঠামো, ৪. তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি, ৫. জটিল প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা।
এই পাঁচটি ক্ষেত্র ঘনিষ্ঠভাবে আন্তঃসম্পর্কিত, এবং সমন্বয় সাধনের দ্বারা যদি এদের উন্নত করা যায় তা হলে খাদ্য, আর্থিক এবং জাতীয় সুরক্ষার দিকে পথনির্দেশ করবে।
এই পাঁচটি ক্ষেত্রের মধ্যেকার মূল লক্ষ্যগুলির অন্যতম হল PURA-দ্বারা নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য আনার জন্য পরিকাঠামোর উন্নয়ন ঘটানো। এই উন্নয়নের জন্য প্রাকৃতিক, বৈদ্যুতিন এবং জ্ঞান এই তিনের সংযোগসাধন প্রয়োজন, যা অর্থনৈতিক সংযোগসাধনের পথ প্রদর্শন করে, হিসাবমতো সমগ্র রাষ্ট্রে এই PURA গুচ্ছ সংখ্যায় প্রায় ১০০০।
যখন আমাদের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান অবস্থায় রয়েছে এবং আমাদের জিডিপি (গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট) বা মোট অন্তর্দেশীয় উৎপাদন বাৎসরিক ৯ শতাংশ হারে বাড়ছে, তখন এটা সত্য যে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সংখ্যাধিক্য মানুষের জীবনযাপনের মানে সামগ্রিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলে তো অবশ্যই এমনকী শহরাঞ্চলেও। ফলে, আমরা NPI বা জাতীয় সমৃদ্ধি সূচকের উদ্ভব ঘটিয়েছি, যা প্রকৃতপক্ষে যোগফল ক. জিডিপি-র বাৎসরিক বৃদ্ধি হার খ. মানুষের জীবনযাত্রায় গুণগত মানের উন্নতি, বিশেষত যারা দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাস করে এবং গ. জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের সভ্যতাজনিত ঐতিহ্য থেকে আমরা যে মূল্যবোধ ব্যবস্থা আত্মীকরণ করি, যা এককভাবে ভারতের বৈশিষ্ট্য। অতএব ক + খ + গ বিশেষত ‘খ’ হল গৃহ, শুদ্ধজল, পুষ্টি, সুষ্ঠু নির্মলীকরণ, উৎকৃষ্ট শিক্ষা, উৎকৃষ্ট স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সম্ভাব্য কর্মসংস্থান এবং ‘গ’ হল যৌথ পরিবার ব্যবস্থা, একত্রে কাজ করার মানসিকতা স্থাপন, জীবনের সঠিক দিশায় পথপ্রদর্শন, সামাজিক অসাম্য মোচন এবং সর্বোপরি দ্বন্দ্ববিহীন সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজের গঠনক্রিয়া। এসমস্ত কিছু সূচিত হয় সম্প্রদায় এবং পরিবারের মধ্যে শান্তি, দুর্নীতি সূচকের নিম্নগমন, আদালতে মামলার সংখ্যার হ্রাসপ্রাপ্ত রূপ, শিশু এবং নারীর প্রতি হিংস্রতার দূরীকরণ এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিশ্চিহ্ন করা দ্বারা। দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যে পরিণত হওয়া উচিত। সবসময় জাতীয় অর্থনৈতিক ক্রিয়ার উন্নতির জন্য আমাদের প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের জাতীয় সমৃদ্ধিসূচক বা NPI দ্বারা পথ প্রদর্শিত হওয়া উচিত।
আমরা কীভাবে এই লক্ষ্য উপলব্ধি করব? লক্ষ্যকে উপলব্ধি করার জন্য তাত্ক্ষণিক কী কী পদক্ষেপ আমাদের গ্রহণ করা উচিত?
আপনাদের অনেকের সঙ্গে আমার আলাপচারিতা, নানা ধরনের কেন্দ্র এবং রাজ্যের কার্যক্রম, সরকারি এবং বেসরকারি সংগঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ ছাড়াও জাতীয় উন্নয়নে দেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণের অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা আমার মনে এই বিশ্বাস জাগায় যে, সমাজ এই লক্ষ্যের জন্য কাজ করতে প্রস্তুত। দুটো প্রধান কর্মসূচি প্রস্তুত করার জন্য আপনাদের একত্রে কাজ করতে আমি দুটো পরামর্শ দিতে পারি:
১. শক্তি স্বনির্ভর বিল: শক্তি সম্পদের প্রতি নির্মল পরিবেশ সহায়ক ত্রিমাত্রিক অগ্রগমন।
২. ভিশন ২০২০: ২০২০ সালের পূর্বে জাতীয় সমৃদ্ধিসূচক NPI মাপকাঠি ধরে নিয়ে সুরক্ষিত, সমৃদ্ধ, সুখী এবং অর্থনৈতিক উন্নত রাষ্ট্রে ভারতবর্ষকে রূপান্তরিত করার অঙ্গীকার গ্রহণ।
নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই বিলকে বাস্তবে রূপায়িত করার গুরুত্ব সম্বন্ধে আপনারা নিশ্চয় সহমত হবেন।
এই বিষয়গুলো আমি এতই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করি যে আমার বইয়ের পরের দিকে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
রাষ্ট্রপতি ভবনে আমার এক অভিনব অভিজ্ঞতা হয়েছিল। যখনই কোনও বিশেষ রাজ্য বা সরকারি বিভাগ বা মন্ত্রকের কোনও বিশেষ প্রতিষ্ঠান, পরিকল্পনা কমিশন বা রাজ্য সরকার থেকে কোনও নির্ভুল সর্বশেষ তথ্য প্রয়োজন হত সংশ্লিষ্ট এজেন্সি রাষ্ট্রপতির সচিবালয় থেকে কোনও তাগিদ ছাড়াই পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রেরণ করত। জাতি, সংসদ এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা, সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে অভিভাষণ রচনায় এই তথ্যসমূহ আমার পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। এই প্রক্রিয়াগত সুবিধা পূর্বে কখনও এইভাবে কাজে লাগানো হয়নি।
