ডেভিড এ সময় ব্যস্ত রইল কনরাডের গেমফেন্স ঠিক করার কাজে। এখনো পা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছে বেচারা। এছাড়া জাবুলানির অন্য তিন পাশেও বেড়া দেবার কাজ করতে হচ্ছে তাকে। এর সাথে আবার আফ্রিকার রেঞ্জার বাহিনীও চাপ দিচ্ছে তাদেরকে প্রশিক্ষণ দেয়ার কাজে সাহায্য করার জন্য। তাদের জন্যে বিশেষ ভাবে ইউনিফর্মের নকশা করেছে ডেভিড। এছাড়াও এস্টেটে ঢোকার সবগুলো প্রবেশপথে অডিট পোস্ট বানিয়েছে রেঞ্জারদের জন্যে। এসব কাজে কনরাড বার্গের সাথে পরামর্শ করে নেবার জন্য নিয়মিত নেলস্প্রুটে যায় ডেভিড। তার পরামর্শ মতো এস্টেটে ওয়াটার সার্ভে করা শুরু করল ডেভিড। পুল থেকে দুরে থাকা অন্যান্য নদী বা খাল দিয়ে ভ্রমণ করে এলো ডেভিড। পরীক্ষা করে দেখল বাঁধ নির্মাণের বাস্তবতা। সক্রিয় কাজে ব্যস্ত থাকায় পরিশ্রমী কৃশকার আর রোদে পোড়া ত্বকের অধিকারী হয়ে উঠল ডেভিড। তারপরেও বেশির ভাগ ঘণ্টা কাটতো ডেবরার সাহচর্যে।
৩৫-এমএম রঙিন ছবি যেগুলো জোহান আক্কাস আক্রমণ করার আগেই তুলেছিল ডেভিড, সেই বাফেলো দলের ছবিগুলো এলো প্রিন্ট হয়ে। কিন্তু দেখা গেল যে একটাও মনমতো হলো না। বিশাল বাফেলোর কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে দিগন্তের কাছে দাঁড়িয়ে আছে আর গায়ে থাকা অক্স-পেকারগুলোকে মনে হচ্ছে ছোট ছোট পোকা। হতাশায় মুষড়ে পড়ল ডেভিড। আবার নেলস্প্রুটে গিয়ে কিনে আনল ৬০০ এমএম টেলিস্কোপিক লেন্স।
যখন ডেবরা কাজ করতে বসে ডেস্কে, তার পাশে ক্যামেরা সেট করে দেয় ডেভিড। খোলা জানালা দিয়ে পাখির ছবি ভোলা হয়ে যায়। ফলাফল হলো মিশ্র। ছত্রিশটি ছবির মাঝে দেখা গেল পঁয়ত্রিশটি ফেলে দিতে হয়। কিন্তু একটা ছবি হয় অসাধারণ। ঠিক উড়ে যাবার ভঙ্গিতে ধরা পড়ল ধূসর পাখির ছবি। পাখা ছড়িয়ে উজ্জ্বল চোখে সূর্যের আলোয় চকচক করা পাখা নিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখিটা।
এ কাজে মনপ্রাণ ঢেলে দিল ডেভিড। আরো লেন্স, ক্যামেরা, ট্রাই-পড কিনে নিয়ে এলো। এরপর অভিযোগ করে উঠল ডেবরা। এই শখ পুরোপুরি দৃষ্টি শক্তির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু এক্ষেত্রে সে অক্ষম।
ডেভিড চেষ্টা করল ডেবরাকে উৎসাহী করে তুলতে। লোক পাঠিয়ে জুন স্টানার্ডের বার্ড সং কিনে নিয়ে এলো। শুনে চমকিত হলো ডেবরা। মনোযোগ দিয়ে শুনল সে। পুরো মুখ ভেসে গেল আনন্দের বন্যায় যখন পরিচিত একটা আওয়াজ শুনতে পেল সে।
তখন থেকে শুরু করল নিজের মতো করে পাখির গান রেকর্ড করা। এর সাথে যুক্ত হলো জুলুর ঘণ্টার শব্দ, ডেভিডের ল্যান্ড রোভারের গুঞ্জন, রান্না ঘরের আঙিনাতে ভৃত্যদের চেঁচামেচি, আর খুব সূক্ষ্মভাবে চকচকে স্টালিংয়ের কিচিরমিচির।
‘একটুও ভালো হচ্ছে না।’ তিক্ততায় ভরে গেল ডেবরার মন। আমি বুঝতে পারছি না জুন কীভাবে এত পরিষ্কার ভাবে রেকর্ড করতে পেরেছে।’
কয়েকটা বইপত্র পড়ে ডেবরার জন্যে প্যারাবোলিক রিফেক্টর তৈরি করল ডেভিড। দেখতে ততটা সুন্দর না হলেও কাজ করল জিনিসটা। শব্দের উৎস রেকর্ড করে সাউন্ড ওয়েভকে মাইক্রোফোনে পাঠাল।
ডেবরার স্টাডি থেকে জানালার মাধ্যমে পুরো ব্যাপারটা আরো অভিযান সুলভ হয়ে উঠল। পুলের পাশে যেখানে পাখিরা পানি খেতে আসে, আরামদায়ক আর স্থায়ী হাইড আউট বানালো ডেভিড। রেঞ্জারদের এনে দেয়া তথ্যানুযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির পাখির বাসার কাছে ও গাছের ডালে বানানো হল এমন সব হাইড আউট। এসব জায়গায় একত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাতে লাগল ডেভিড আর ডেবরা। একসাথে বসে ছবি তোলা, রেকর্ড করা হয়ে উঠল নেশার মতো। এসব সময়ে এমনকি জুলুও শিখে গেল কীভাবে ঘণ্টার শব্দ না করে চুপচাপ করে শান্ত হয়ে শুয়ে থাকতে হয়।
ধীরে ধীরে পেশাদারদের মতো দক্ষ লাইব্রেরি তৈরি হলো, যেখানে জমা হতে লাগল ছবি আর রেকর্ডি। অবশেষে সাহস করে এসব ছবি থেকে ডজনখানেক শ্ৰেষ্ঠ ছবি বাছাই করে পাঠিয়ে দিল আফ্রিকান ওয়াইল্ড লাইফ ম্যাগাজিনের কাছে। দুই সপ্তাহ পরে একশ ডলারের চেকসহ স্বীকৃতিপত্র এলো তার কাছে। এই অর্থ দেখা গেল যন্ত্রপাতির পেছনে ব্যয় হওয়া অর্থের বিশ ভাগের এক ভাগ মাত্র। তারপরেও খুশিতে আত্মহারা হয়ে উঠল ডেভিড। একই অবস্থা ডেবরার। ডিনারে দুই বোতল ভেভ ক্লিকোট পান করল দু’জনে। আর উত্তেজনা ও শ্যাম্পেনের বদৌলতে ঐ রাতে ভালোবাসা-বাসি পেল নতুন মাত্রা।
ওয়াইল্ড লাইফ’তে ডেবরার লেখাসহ ডেভিডের ছবি প্রকাশিত হবার পর অভাবনীয় সাড়া পেল দু’জনে। সারা পৃথিবীতে এ কাজে আগ্রহী এমন সব লোকজন চিঠি লেখা শুরু করল তাদেরকে। প্রকাশক নিজে অনুরোধ করল যেন জাবুলানির উপর ছবিসহ আর্টিকেল আর এ জায়গা নিয়ে মরগ্যানদের পরিকল্পনা লিখে পাঠানো হয়।
ডেভিডের ছবিতে মডেল হিসেবে কাজ করল ডেবরা। এছাড়া অনেক যত্ন করে বর্ণনা লেখা শুরু করল ডেবরা বিভিন্ন সমালোচনা আর নতুন ধারণা দিয়ে তাকে সাহায্য করল ডেভিড।
ডেবরার নতুন বইয়ের কাজ পড়ে রইল অনাদরে। কিন্তু নিজের দুঃখ ভুলে গিয়ে একসাথে কাজ করার আনন্দে মেতে উঠল সে।
অন্যান্য সংরক্ষণবাদীদের সাথে পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ হতে থাকায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন বুদ্ধি পেতে লাগল তারা। আর মাঝে মাঝেই কনরাড বার্গ আর জেন বার্গের সাহচর্য পাওয়ায় মানব সংসর্গ থেকেও বঞ্চিত হলো না। এখনো পর্যন্ত বাইরের মানুষের সাথে মেশার ব্যাপারে যথেষ্ট সংবেদশীল তারা। এভাবে ব্যাপারটা এড়িয়ে চলাও সম্ভব হলো।
