বন্যার মতো রক্ত বইছে হাত থেকে। ভিজে গেল ট্রাউজারের সামনের অংশ। চিৎকারের সাথে মুখ থেকে খসে পড়ল নকল দাঁত। চকচকে মুখের মাঝে দেখাচ্ছে কালো গন্ধের মতো। তুমি আমাকে মেরে ফেলেছে। আমি রক্ত পড়ে মারা যাচ্ছি!’ ডেভিডের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল সে। ‘আমাকে বাঁচাও আমাকে মরতে দিও না।’
ট্রাক থেকে উঠে দাঁড়ালো ডেভিড। দুই কদম দৌড়ে গেল আক্কারসের কাছে। এরপর ডান পা ঘুরিয়ে সারা শরীরের শক্তি দিয়ে লাথি মারলো আক্কারসের চিবুকের নিচে। মাথা ঝুলে গেল পিছন দিকে লোকটার।
পিছনের দিকে পড়ে গিয়ে নিস্তব্ধ হয়ে রইল আক্কারস। উঠে দাঁড়িয়ে শ্বাস টানলো ডেভিড।
.
রায় ঘোষণার জন্যে সুপ্রিম কোর্টের মি: জ্যাস্টিস বার্নাড প্রাক্তন চারটা ব্যাপার মাথায় রাখালো–এর মাঝে দু’টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের আওতায়, একটি দুঃসাহসিক প্রচেষ্টায় প্রাণহরণ ও চতুর্থটি ইচ্ছেকৃত ভাবে শারীরিক ক্ষতি।
জোহান আক্কাসকে বন্যাপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হলো। এই কারণে জরিমানার ব্যবস্থা না রেখেই তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলো। কেননা এ কাজে মোটর ভেহিকেল আর গোলা-বারুদও ব্যবহার করেছে সে।
ইচ্ছেকৃতভাবে আক্রমণের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের আরো সশ্রম কারাদণ্ডের শাস্তি পেল সে।
শারীরিক ক্ষতি করার অপরাধে অভিযুক্ত জোহান আক্কাসকে পাঁচ বছরের কারাবাসের শাস্তি দেয়া হলো।
সবশেষে খুনের দায়ে অপরাধী জোহান আক্কারসকে জাস্টিস বার্নাড খোলা কোর্টরুমে সবার সামনে শাস্তি প্রদান করলেন:
‘এই অপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা উচিত হলেও একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়েছে যে হতভাগ্য লোকটা ফাঁদে আটকা পড়া পশুর ন্যায় আচরণ করে ছিল।
এক্ষেত্রে দণ্ড হলো আঠারো বছরের কারাবাস আর সব শাস্তিই একের পর এক ভোগ করতে হবে তাকে।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে প্লাস্টার করা পা আর এক হাতে ওল্ড বাক জিনের গ্লাস নিয়ে কনরাড বার্গ জানাল, যাই হোক আগামী আটাশ বছর এই বাঞ্চোতকে নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না আমাদের। আমি ক্ষমা চাইছি মিসেস মরগ্যান। উনত্রিশ বছর, প্রিয়তম আমার, দৃঢ় কণ্ঠে তাকে শুধরে দিল জেন কনরাড বার্গ।
.
জুলাই মাসে আ প্লেস অব আওয়ার ওন-এর আমেরিকা সংস্করণ প্রকাশিত হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় অন্যান্য অনেক ভালো বইয়ের মতোই হারিয়েও গেল। কেউ কোন উচ্চবাচ্য করল না। একটুও সাড়া পেল না ডেবরা।
ববি ডুগান, আমেরিকাতে ডেবরার লিটারির এজেন্ট জানাল সে কতটা দুঃখিত, কতটা হতাশ। আশা করেছিল অন্তত সমালোচকরা কিছু লিখবে।
ব্যক্তিগত ভাবে অপমানিত বোধ করল ডেভিড। সপ্তাহখানেক ধরে নিজের ঘরে রেগেমেগে ঘুরে বেড়ালো সে। এক পর্যায়ে তো মনে হলো যে আমেরিকাতে গিয়ে হয়তো দেশটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে–একক ভাবে ভিয়েতনাম হয়ে উঠবে সে।
‘এগুলো গাধার দল ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিবাদ করে উঠল সে। এরকম সুন্দর বই আর কখনো লেখা হয়নি।’ ‘ওহ ডেভিড!’ নরম স্বরে বোঝাতে লাগল ডেবরা।
“হুম, এটাই সত্যি! আমার ইচ্ছে করছে সেখানে গিয়ে বই দিয়ে তাদের নাক ঘষে দিতে।
ডেবরা কল্পনাতে দেখতে পেল যে নিউইয়র্কের সব প্রকাশকের দরজা হাট করে খুলে গেল। আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিল সকলে। উঁচু দালানের জানালা দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো বা ডেভিডের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে পালালো মেয়েদের টয়লেটে।
‘ডেভিড মাই ডার্লিং, তুমি আমার কাছে অনেক সুন্দর। খুশিতে খিকখিক করে হেসে উঠল ডেবরা। কিন্তু সে ও আঘাত পেয়েছে। সত্যি অনেক আঘাত পেয়েছে। ভেতরে মনে হলো দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ইচ্ছে করছে কিছু একটা গরম গরম লিখতে।
নিজেরে ডেস্কে ঠোঁটের কাছে মাইক্রোফোন নিয়ে বসল ডেবরা। শব্দগুলো জুড়িয়ে গেল না। চিন্তাগুলো একে অন্যের সাথে হারিয়ে গেল না। আগে যেখানে মনে হতো সব কিছুই চোখের সামনে ঘটতে দেখছে সে। দেখছে তার চরিত্রগুলো হাসছে, কাঁদছে, গান গাইছে। এখন সেখানে সেখানে শুধু কালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে তার চোখে। বর্ণহীন আকারহীন।
মাঝে মাঝে ঘণ্টার পর পর ঘণ্টা এমনিই ডেস্কে বসে কাটিয়ে দেয় ডেবরা। চুপচাপ বসে শুনতে থাকে জানালার নিচে পাখির ডাক।
ওর হতাশা বুঝতে পারল ডেভিড। চেষ্টা করল ডেবরাকে সাহায্য করতে। ডেস্কে বসে কিছু না করার চেয়ে ডেভিড চাইল ডেবরা উঠে যাক সেখান থেকে। ডেবরাকে নিয়ে নতুন বেড়ার ধারে বেড়াতে যেতে চাইল সে। অথবা বলল পুলে বড় নীল মোজাম্বিক মাছ ধরতে যেতে।
এতদিনে বাসা আর এর আশে-পাশের পুরো পরিবেশ মুখস্ত হয়ে গেছে ডেবরার। ডেভিড চাইল ডেবরার পৃথিবী যেন আরো বড় হয়। প্রতিদিন একসাথে হেঁটে পুল পর্যন্ত বেড়াতে যায় তারা। ফলে এ রাস্তাটুকুও চিনে নিতে শুরু করল ডেবরা। ডেভিডের তৈরি করে দেয়া ওয়াকিং ষ্টিক নিয়ে হেঁটে হেঁটে সব চিনে নিতে লাগল ডেবরা। এ কাজে নিজের কর্তব্য ঠিক করে নিল জুলু। ডেভিডের পরিকল্পনা মতো জুলুর গলায় বেঁধে দেয়া হলো রুপালি ঘণ্টা। ফলে ডেবরা সেই শব্দ শুনে সহজেই অনুসরণ করে চলল। কয়েকদিনের মাঝেই ডেভিডকে ছাড়াই বের হওয়া শুরু করল ডেবরা। জুলুকেও তেমন বলতো না কোথা ও যেতে চায়। এভাবে নিজের পরীক্ষা নিজেই নিতে লাগল ডেবরা।
