সামনের চাকাগুলো ঘুরে পড়ে গেল ড্রেনে। জানালা থেকে গ্লাস ভেঙ্গে দরজা গেল খুলে। একপাশে কাত হয়ে পড়ে গেল ট্রাক।
থ্রটল বন্ধ করলো ডেভিড। হুইল ব্রেকের উপর চেপে ধরল পা। এখানে অপেক্ষা করো।’ চিৎকার করে ডেবরাকে জানিয়েই রাস্তায় লাফিয়ে নামালো ডেভিড। ক্ষত-বিক্ষত টিস্যু জমে মুখোশের মতো সেটে আছে তার মুখে। কিন্তু চোখ জোড়া জ্বলছে ধকধক করে, এক দৌড় লাগল সবুজ ট্রাকের দিকে।
ডেভিডকে দৌড়ে আসতে দেখল আকারস। চেষ্টা করল উঠে দাঁড়াতে। দেখতে পেল ক্যাবের মাঝে পড়ে আছে তার রাইফেল। বহুকষ্টে উঠে খোলা দরজা দিয়ে চাইল সেটা নিতে। কপালে গভীর ভাবে কেটে গিয়ে রক্ত পড়তে লাগল চোখের মাঝে। মনে হলো অন্ধ হয়ে গেছে সে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছে পিটপিট করে তাকাল চারপাশে।
কাছে চলে এসেছে ডেভিড। সেচ নালা পার হয়ে তার দিকে দৌড়ে আসছে। বিধ্বস্ত সবুজ গাড়ির উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়াল আক্কারস। বেল্টে থাকা হান্টিং নাইফ নিতে উদ্যত হলো। শেফিল্ড স্টিল দিয়ে বানানো আট ইঞ্চি ফলা, হ্যান্ডেলও আছে আর রেজারের মতোই ধার।
ছুরি নিয়ে যুদ্ধ করে যারা তাদের মতোই বাগিয়ে ধরল ছুরিটা। তারপর হাতের তালু দিয়ে মুছলে চোখ।
আস্তে আগে বেড়ে ডেভিডের মুখোমুখি হলো। বিশাল হাতের মুঠির মাঝে লুকিয়ে ফেলল ছুরি।
তার একটু দূরে থাকতেই থেমে গেল ডেভিড। চোখ আটকে গেল ছুরিতে। আবারো হাসতে শুরু করল আক্কারস। এমন গুড়গুড় শব্দ হতে লাগল বোঝাই গেল যে, নিষ্ঠুরতার চরম সীমা অতিক্রম করেছে সে বহু আগেই।
কোবরার মতো মোহনীয় ভঙ্গিতে ফলা এদিক-ওদিক করতে লাগল আক্কারস। সূর্যের আলো পড়ে চকচকে করে উঠল স্ট্রিলের ফলা। তাকিয়ে থেকে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে প্যারাট্রুপারের সমস্ত ট্রেনিং স্মরণ করে নিল। ডেভিড।
দ্রুত আগে বেড়ে পোচ দেয়ার ভঙ্গি করল আক্কারস। ডেভিড সরে যেতেই আরো উঁচু শব্দে হেসে উঠল।
আবার চক্রকারে ঘুরতে শুরু করল দুজনে। মুখ অল্প খোলা রেখে অদ্ভুত ভাবে কিড়মিড় শব্দ করছে আক্কাস। তাকিয়ে আছে গভীরে বসা চোখ জোড়া দিয়ে। ধীরে ধীরে আবারো তার সামনে গেল ডেভিড। আক্কাস খেদিয়ে তাকে নিয়ে গেল ট্রাকের দিকে। এক কোণায় আটকে ফেলতে চাইল ডেভিডকে।
এরপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আহত চিতাবাঘের মতো। এতটা গতি আর শক্তি সত্যিই অবিশ্বাস্য। হিসহিস শব্দে ডেভিডের পেটের কাছে থেকে ঘুরে এলো ছুরির ফলা।
কব্জি দিয়ে ছুরিটা ধরে ফেলল ডেভিড। বাধ্য করল ছুরি ধরা হাত নিচে নামাতে। বুকে বুক ঠেকে গেছে, দুর্গন্ধ আসছে আক্কারসের নোংরা দাঁত থেকে।
নিঃশব্দে যুদ্ধ করছে দু’জনে। একে অন্যের শক্তি আর সামর্থ্যের পরীক্ষা নিচ্ছে যেন।
ডেভিড অনুভব করে তার হাতের মাঝে ধরা ছুরি হাত মোচড় খাচ্ছে। মানুষটার হাত বাহু যেন স্ট্রিল দিয়ে তৈরি। আর বেশি সময় আক্কাসকে ধরে রাখতে পারবে না বুঝলো সে। সেকেন্ডের মাঝেই মুক্ত হয়ে যাবে হাত আর পেটের মাঝে ঢুকে যাবে।
এবার লোকটার পা আটকে একপাশে কাত করে ফেলতে চেষ্টা করল ডেভিড। ফলে খানিকটা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ল আক্কারস। আরেক হাত দিয়ে ধরে ফেলল ছুরির হাত। কিন্তু দুই হাত দিয়েও ধরে রাখতে পারছে না সে।
দুজনেই হাপাচ্ছে, পড়ে না যাওয়া পর্যন্ত আটকে রইল ট্রাকের গায়ে। উত্তপ্ত ধাতব শরীর থেকে আসছে তেলের গন্ধ।
ছুরির উপরই নিজের মনোযোগ আটকে রাখল ডেভিড। কিন্তু বুঝতে পারল আরেকটা হাত দিয়ে ওর গলা ধরতে চাইছে আক্কারস। মাথা দিয়ে কাঁধের উপর বাড়ি মারলো তাকে ডেভিড। চিবুক দিয়ে বুকে খোঁচা মারলো। কিন্তু হুড়কোর মতো আটকে যাওয়া আঙুল কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না ছুরি থেকে। মনে হলো গলার মাংসে বিধে গেল আক্কারসের হাতের আঙুল। চেষ্টা করল তার জীবন টেনে বেরে করে আনতে।
মরিয়া হয়ে ছুরি ধরা হাতে হেঁচকা টান মারলো ডেভিড। বুঝতে পারল কাজ হয়েছে। কেননা আক্কারস এখন মনোযোগ দিয়েছে ওর গলা চেপে ধরার কাজে।
ডেভিডের কাঁধের পাশেই খোলা উইন্ডস্ক্রীন দেখা যাচ্ছে। কাঁচ ভেঙ্গে গেছে আগেই। কিন্তু ধাতব খাঁচার মতো চারপাশ রয়ে গেছে। দেখতে লাগছে ভয়ঙ্কর করাতের মতো।
গলার মাঝে আঙুলের চাপ বাড়ছে অনুভব করল ডেভিড। চেষ্টা করছে। ব্রেইনে যাওয়া ধমনীকে ভেঙ্গে ফেলতে। চোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার। মনে হলো ডগ ফাইটে এইট জির সাথে লড়ছে সে।
শেষ চেষ্টা স্বরূপ ভাঙা কাঁচের গায়ে ধাক্কা দিলো ডেভিড ছুরি ধরা হাতকে। নিচে নামিয়ে টেনে নিল কাঁচের ভাঙা কিনারের দিকে।
চিৎকার করে ডেভিডের গলা ছেড়ে দিল আক্কারস। আগে-পিছে করে হাত চেপে ধরল ডেভিড ভাঙা কাঁচের উপর। ছেঁড়া গোলাপ পাপড়ির মতো ক্ষত তৈরি হতে লাগল মাংস কেটে। আঙুল থেকে খসে পড়ল ছুরি। মেয়েদের মতো নাকিকান্না জুড়ে দিল আক্কারস।
ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিল ডেভিড। হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়েও কান্না করে যেতে লাগল আক্কারস। নিজের গলায় হাত বুলিয়ে নিল ডেভিড। নিঃশ্বাস নিয়ে অনুভব করল ব্রেইনে পৌঁছালো তাজা রক্ত।
ঈশ্বর জেসাস, আমি মারা যাচ্ছি, রক্ত পড়েই মারা যাবো আমি। ওহ, সুইট জেসাস, আমাকে সাহায্য করো!’ চিৎকার করে উঠল আক্কারস। পেটের কাছে ধরে রাখল আহত হাত। সাহায্য করো, ওহ ঈশ্বর, আমাকে মরতে দিও না। আমাকে বাঁচাও জেসাস, আমাকে বাঁচাও।
