শুকনো নদীবক্ষ বন্যার পানির জন্যে আট ফুট গম্ভীর হয়ে আছে। এখানে পনের মিটার চওড়া ও। মেঝে ঢেকে আছে নরম সাদা বালিতে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট পাথর। বেসবলের চেয়ে বড় নয়। এটি জাবুলানিতে পৌঁছানোর জন্যে চমৎকার একটি অবৈধ রাস্তা। নরম মাটিতে এখনো দেখা যাচ্ছে আক্কারসের ট্রাকের চাকার দাগ।
স্ট্রিমের একটা বাকের মুখে ট্রাকের এগিয়ে আসার শব্দ শুনতে পেল কনরাড।
নদীবক্ষের মাঝখানে চারকোনা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কনরাড। কোমরের কাছে আড়াআড়ি ভাবে ধরে রেখেছে রাইফেল। চেষ্টা করছে নিজের নিঃশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণে আনতে। এগিয়ে আসা ট্রাক পাগলের মতো বাঁকের কাছের স্কিড করল। এরপর দ্রুত নেমে আসতে লাগল তার দিকে। রিয়ার হুইল থেকে বালির ফোয়ারা ছিটকে আসছে।
স্টিয়ারিং হুইলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে জন আক্কারস। আইব্রোর উপর নেমে এসেছে টুপি। ঘামে চকচকে সাদা হয়ে আছে চেহারা। দেখতে পেল রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে কনরাড।
‘থামো!’ রাইফেল নাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল কনরাড। থামো নয়তো আমি গুলি করব
এলোমেলো ভাবে দুলতে দুলতে এগিয়ে আসছে ট্রাক। হাসতে শুরু করল আক্কারস। হাসির দমকে তার কাঁধ কাঁপছে দেখতে পেল কনরাড। বের হয়ে গেছে বিভৎস দাঁতের সারি। ট্রাকের গতি একটুও কমলো না।
রাইফেল তুলে নিয়ে জোড়া ব্যারেল দিয়ে তাকাল কনরাড। এই রেঞ্জে একটা করে বুলেট জোহান আক্কারসের গভীরে বসানো ব্যাপারই নয়। কিন্তু মানুষটার মনে হলো এ ব্যাপারে কোন চিন্তাই নেই। মাড়ির সাথে আলগা ভাবে ঝুলন্ত দাঁত নিয়ে হেসে চলেছে সে। পঞ্চাশ ফুট দূর আছে ট্রাক। উঠে আসছে কনরাডের গায়ের উপর।
মাথা খারাপ না হলে ইচ্ছে করে একটা মানুষ আরেটা মানুষের উপর গুলি চালাতে পারে না। এটা হতে হবে সৈন্যের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অথবা আইন পালনকারী অফিসারের কাজ। অথবা কোন শিকারির হাত নতুবা বদ্ধ উন্মাদ কোন অপরাধী।
এদের একজনও নয় কনরাড বার্গ। বেশির ভাগ বিশালদেহী মানুষের মতো সেও একজন নম্র-ভদ্র মানুষ। তার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা ঘিরে আছে জীবনকে নিয়ে–ট্রিগারে চাপ দিতে পারল না সে।
ট্রাক পনের ফুট দূরে থাকতে ছিটকে একপাশে লাফ দিল কনরাড। জোহান আক্কারস ইচ্ছে করে তার দিকে চালিয়ে দিল ট্রাক।
ট্রাকের পাশের অংশ দিয়ে ধাক্কা মারলো কনরাডের কোমরে। স্ট্রিমের মাটির দিকের তীরের কাছে ছিটকে পড়ল সে। আরো একটু নিচে গিয়ে আলগা পাথরসহ আরো একবার হড়কে গেল ট্রাকের চাকা। হুইল নিয়ে যুদ্ধ শুরু করল আক্কারস। অ্যাক্সেলেটরে পা চেপে ধরে উঠে আসল নদীর বুকে। তীরে নরম বালির উপর পড়ে রইল কনরাড।
ট্রাকের ধাক্কা খাবার সাথে সাথে কনরাড বুঝতে পারল কোমরের কাছের হাড় ভেঙ্গে গেল গ্লাসের মতো। পাজরের খাঁচার সাথে ধাতুর ঘর্ষণে ফুসফুস থেকে বের হয়ে গেল সবটুকু বাতাস।
একপাশে কাত হয়ে বালির উপর শুয়ে রইল সে। ধীরে ধীরে মুখ থেকে বের হয়ে এলো রক্তের ধারা। তিক্ত লবণাক্ত স্বাদ। বুঝতে পারল ভাঙা পাজর বর্শার মতো আঘাত করেছে ফুসফুস। শরীরের অনেক গভীর থেকে বের হয়ে আসছে রক্ত।
মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পেল দশ কদম দূরে পড়ে আছে রেডিও সেট। নিজেকে টেনে হেঁচড়ে এগোতে লাগল এর দিকে। ভেঙ্গে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া পা ঝুলছে পেছনে।
‘ডেভিড, মাইক্রোফোনে ফিসফিস করে উঠল কনরাড। আমি থামাতে পারি নি। চলে গেছে। সাদা বালির উপর থু দিয়ে ফেলল মুখ ভর্তি রক্ত।
লুজানের পাকা ব্রিজের নিচ থেকে নদীবক্ষ পেরিয়ে উঠে এলো ট্রাক, দেখতে পেল ডেভিড। ড্রেন পার হয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে এলো রাস্তায়। দ্রুত গতি বাড়ালো, পশ্চিমে ধেয়ে চলল ব্যান্ডেলিয়ার পাহাড় আর মহাসড়কের দিকে। সবুজ চেসিসের পেছন থেকে ধুলার মেঘ উড়তে লাগল। পরিষ্কার চিহ্ন রেখে গেল ডেভিডের জন্যে।
সুজান পার হবার পর রাস্তা তীক্ষ্মভাবে মোড় নিয়ে পাথুরে জায়গা পার হলো। তারপর ধনুকের মতো হয়ে এগোলো আরো দুই-মাইল।
নিজের ল্যান্ডিং গিয়ার নামিয়ে থ্রটল পেছনে টানলো ডেভিড। নাভাজো নেমে এলো মাটির উপর। ধুলি মাখা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল যেন এটা একটি ল্যান্ডিং স্ট্রিপ।
ঠিক সামনেই ট্রাকের ধুলা দেখা যাচ্ছে। সোজাসুজি এগিয়ে চলেছে পরম্পর। কিন্তু ডেভিড চাইছে গাছের উঁচু দেয়ালের মাঝে সরু লেনের মধ্যে নামিয়ে আনতে প্লেনকে। আস্তে আস্তে কথা বলল ডেবরার সাথে। নিশ্চয়তা নিয়ে ব্যাখা করল ও কী করতে চলেছে।
সরু রাস্তায় আস্তে করে মাটি স্পর্শ করল নাভাজো। এরপর আবারো থ্রটল খুলে দিল। রাস্তার মাঝ বরাবর এগিয়ে গেল। নাভাজোকে আবার উঠিয়ে নেয়ার মতো প্রয়োজনীয় গতি আছে। যদি আক্কারস আত্মসমর্পণ না করে সংঘর্ষ বাধাতে চায়।
তাদের সামনে রাস্তার আরেকটা বাঁক। এর দিকে দ্রুত এগিয়ে যেতেই হঠাৎ করে ধেয়ে আসতে লাগল ট্রাক। খুব বেশি হলে একশ গজ দূরত্ব।
দুইটি বাহনই একে অপরের দিকে মুখোমুখি এগিয়ে যাচ্ছে। যৌথভাবে গতি হবে ঘণ্টায় দুইশ মাইল। আর এই ধরনের দৃশ্য তো জোহান আক্কারসের কল্পনারও বাইরে।
রাস্তার ঠিক মাঝখানে এয়ারক্রাফট। প্রোপেলারের ঘূর্ণনশীল অবস্থা দেখে ভিরমি খাবার জোগাড় হলো তার।
হুইল শক্ত করে টেনে ধরল সে। শুকনো মাটিতে স্কিড করে উঠল ট্রাক। অল্পের জন্যে মিস করল নাভাজোর পোর্ট-উইংয়ের মাথা।
