‘কীভাবে হলো এমনটা? জানতে চাইল ডেভিড।
‘আমি একটা শর্ট-কাট রাস্তা দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কনরাডের কাতরতা বুঝতে পারল ডেভিড। লজুন স্ট্রিম থেকে কতদূর আপনি?
‘প্রায় তিন মাইল।
‘ঈশ্বর, পার হয়ে যাবে শয়তানটা এতক্ষণে। জানিয়ে দিল ডেভিড। ট্রাক থেকে দুই মাইল দূরে আছে। আর এমন ভাবে দৌড়াচ্ছে যেন পিছনে ট্যাক্স কালেকটর ছুটে আসছে।
‘তুমি এখনো জানো না বৃদ্ধ কনি কী করতে পারে। আমি ওখানে অপেক্ষা করব ওর জন্যে। তুমি শুধু দেখো৷ প্রমিজ করল কনরাড।
গুড লাক, ডেভিড জানাতেই যোগায়োগ কেটে গেল।
নিচে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে গেছে আক্কারস। গাছের নিচে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার টুপি। নিজের স্টারবোর্ড উইং তার দিকে তাক করে রাখল ডেভিড। ধীরে ধীরে তার উপরে চক্কর কাটছে নাভাজো।
আক্কারসকে ছাপিয়ে আরেকটা মূর্তি নজরে এলো এবার। এক মুহূর্তের জন্যে ভাবল বোধ হয় কোন জম্ভ। এরপরই রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে রইল। বুঝতে পারল ওর ভুল হয়েছে।
কী হয়েছে? ডেভিডের চিন্তা বুঝতে পেরে জানতে চাইল ডেবরা।
‘স্যাম। ওই গাধা কোথাকার। কনি বারবার বলেছে ওর জায়গা থেকে না নড়তে। ওর কাছে কোন অস্ত্র নেই—কিন্তু নিচে নেমে আসছে আক্কারস’কে ধরতে।
ওকে থামতে পারো না তুমি?’ উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইল ডেবরা। উত্তর দেবার সময়ও নেই ডেভিডের।
প্রতি উত্তরের আগে চারবার কল করল কনরাডকে। দৌড়ানোর কারণে মোটা হয়ে আসছে তার স্বর।
‘স্যাম আক্কারসের সামনে পড়তে যাচ্ছে। বোধ হয় মোকাবেলা করতে চায়।’
‘ওহ ঈশ্বর। গুঙ্গিয়ে উঠল কনরাড।
‘আমি পেলে ওকে মেরে ফেলবো।
‘দাঁড়ান, জানাল ডেভিড। আমি কাছে যাচ্ছি কী ঘটে দেখার জন্যে।
পরিষ্কারভাবে সব কিছু ঘটতে দেখল ডেভিড। মাত্র তিনশ ফুট উপরে সে। আক্কারস বুঝতে পারলো কেউ একজন দৌড়ে আসছে। পুরো থেমে রাইফেল তুলে নিল। হয়তো সর্তকবাণী দিয়েছেও; কিন্তু দৌড়ানো বন্ধ করল না স্যাম। পাথুরে জমি পেরিয়ে দৌড়ে এসে ধরতে চাইল মানুষটাকে। যে কিনা তার ছেলেমেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে।
কাঁধে রাইফেল তুলে নিল আক্কারস। ইচ্ছে করে তাক করল। রাইফেল নেচে উঠল। ভারী নরম নাকওয়ালা বুলেট আঘাত করল স্যামের গোড়ালিতে।
ছোট্ট বাদামী রঙের দেহটা গড়িয়ে পড়তে লাগল ঢালু বেয়ে।
ডেভিড দেখতে পেল রাইফেল রিলোড করল আক্কারস। নিচু হয়ে কুড়িয়ে নিল কার্টিজ শেল। এরপর চোখ তুলে তাকাল তাকে ঘিরে চক্কর দিতে থাকা এয়ারক্রাফটের দিকে। হয়তো ডেভিডের ভুল হয়েছে কিন্তু মনে হলো হাসছে আক্কারস। ভয়ঙ্কর দেখতে কুৎসিত দাঁতগুলো ঝিক দিয়ে উঠল। এরপর লাফিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল ট্রাকের দিকে।
‘কনি’ কর্কশ ভাবে নিজের হ্যান্ডসেটে বলে উঠল ডেভিড, স্যামকে খুন করেছে ব্যাঞ্চোতটা।
.
এবড়ো-খেবড়ো বালিময় ভূমির উপর দিয়ে বহু কষ্টে দৌড়ে এলো কনরাড বার্গ। টুপি হারিয়ে গেছে। বিশাল লাল মুখ থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে ঘাম। চোখ জ্বালা করছে, ধূসর চুলগুলো লেপ্টে আছে কপালের সাথে। পিছনে লাফাচ্ছে ওয়াকি টকির সেট। কোমরে তালে তালে দুলছে রাইফেলের বাট।
পুরো মনোযোগ দিয়ে দৌড়াচ্ছে সে। চেষ্টা করল হৃৎপিণ্ডের লাফানি ভুলে যেতে, নিঃশ্বাসের কষ্ট উপেক্ষা করতে। কাটা গাছ লেগে কেটে গেল হাতের উপরের অংশ। চামড়া দিয়ে গড়াতে লাগলো চিকন রক্তের ধারা। কিন্তু দৌড়ানো থামালো না সে।
আকাশের দিকে লাল মুখ তুলে তাকাল। দেখতে পেল ডেভিডের এয়ারক্রটাকে। তার সামনে চক্কর দিচ্ছে। খানিকটা বাম পাশে। এর মানে হলো আক্কারস সেদিকে আছে। এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে পালাবার আগে তাকে ধরতে পারবে কনরাড।
পিঠের রেডিও সেট বাজতে লাগল। কিন্তু কল ধরল না সে। এখন থামতে পারবে না সে। দৌড়ানো থামানো মানে হলো নিঃশেষ হয়ে পড়ে যাবে সে। বিশালদেহী মানুষ সে, বাতাস বেশ গরম, তিন মাইল দৌড়ে এসেছ সে, আরেকটু এগিয়ে যাওয়া মনে হচ্ছে কিছুতেই সম্ভব না। শেষ শক্তি দিয়ে দৌড়াচ্ছে সে।
হঠাৎ করেই পায়ের তলার মাটি মনে হলো সরে গেল। সামনে ঝুঁকে অর্ধেক পড়িয়ে অর্ধেক গড়িয়ে লুজানে স্ট্রিমের খাড়াই বেয়ে নেমে যেতে লাগল। সাদা নদীর বুকে এসে থামলো। পরিষ্কার একেবারে চিনির মতো। মাংসের মাঝে খোঁচা মারছে পিঠের রেডিও, বহুকষ্টে বের করল।
তখনো নদীর বুকে শুয়ে কুকুরের মতো হাঁপাতে লাগল সে। ঘামে ভেজা চোখে মনে হলো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। অনেক কসরত করে ট্রান্সমিট বাটনে চাপ দিল।
‘ডেভিড’ ব্যাঙের মতো স্বর বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। আমি স্ট্রিমের কাছে শুয়ে আছি–দেখতে পাচ্ছো আমাকে?
পুরোপুরি মাথার উপর চলে এলো এয়ারক্রাফট। তৎক্ষণাৎ শোনা গেল ডেভিডের কণ্ঠস্বর।
‘আমি দেখতে পাচ্ছি, কনি। ট্রাক থেকে একশ গজ নিচে আছেন। আপনি। আক্কারস এসে পড়েছে কনি। যে কোন মুহূর্তে চলে আসবে।
হাঁপাতে হাঁপাতে মনে হলো নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। কনরাড বার্গ হাঁটু গেড়ে উঠে বসল আর ঠিক সেই মুহূর্তে ইঞ্জিনের শব্দ শুনতে পেল। ভারী রেডিও খুলে ফেলে একপাশে ফেলে রাখল। এরপর রাইফেলও ফেলে দিল কাঁধ থেকে। ব্রিচ খুলে লোড চেক করল। নিজেকে তুলে দাঁড় করালো।
নিজের শরীরের এই দুর্বলতায় অবাক হয়ে গেছে সে নিজেও। আস্তে আস্তে এগোতে লাগল মাঝখানে।
