‘ভাল লাগল শুনে।
‘ডেভিড, আমাদের এই জায়গাটা–বেশ শান্তির, একেবারে পরিপূর্ণ। মনে হচ্ছে ছোট্ট একটা স্বর্গোদ্যান।
‘আমরা এটিকে তাই করে তুলবো। প্রতিজ্ঞা করল ডেভিড। কিন্তু রাতের বেলা বন্দুকের আওয়াজে জেগে উঠল সে। তাড়াতাড়ি উঠে ডেবরাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
আবারো শোনা গেল। নীরব রাতে হালকা শোনাল। অনুভব করল রেগে উঠছে সে। কল্পনার চোখে যেন দেখতেও পেল লম্বা সাদা কিলিং ল্যাম্পের আলো। জঙ্গলের মাঝে ঘুরে ঘুরে হঠাৎ করে স্থির হচ্ছে কোন হতবাক অসহায় প্রাণীর উপর। অন্ধ চোখগুলো জ্বলছে রত্ন পাথরের মতো। টেলিস্কোপিক রাইফেলের জন্য চমৎকার শর্ট।
এরপরই হঠাৎ করে শোনা গেল রাইফেলের বিস্ফোরণ। মাজল ফ্ল্যাশের লম্বা ধোঁয়া। শক্ত মাটির উপর নরম শব্দে মৃতদেহ আছড়ে পড়ার শব্দ আর খুড়ের ঘসটানি আওয়াজ, তারপর আবারো চুপচাপ চারপাশ।
ডেভিড জানে যে এখন পিছু ধাওয়া করে কোন লাভ নেই। পাহাড়ের উপর নিশ্চয় বন্দুকবাজের দোস্ত থাকবে যেন কোন বাড়িতে আলো জ্বলে উঠলেই তাকে সংকেত দিতে পারে। অথবা কোন অটো ইঞ্জিন যদি জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিলিং ল্যাম্প বন্ধ করে অপহরণকারী নিঃশব্দে পালিয়ে যাবে। বৃথাই মাঝরাতে জাবুলানিতে ঘুরে মরবে ডেভিড। ধুরন্ধর শত্রু একমাত্র বুদ্ধির জোরেই কুপোকাত হবে।
আর ঘুম এলো না তার। ডেবরার পাশে জেগে বসে রইল আর শুনতে লাগল তার হালকা নিঃশ্বাসের শব্দ। মাঝে মাঝে দূরে রাইফেলের আওয়াজ। বোবা প্রাণীগুলো অসহায়ের মতো একটু পর পর ছুটে পালিয়ে গিয়েও তাকিয়ে দেখে তার দিকে ধেয়ে আসা অদ্ভুত আলোটাকে।
সারারাত রাগের চোটে এপাশ-ওপাশ করল ডেভিড। সকালবেলা দেখা গেল শুকুন উড়ছে।
ভোরের গোলাপি আকাশে কালো বিন্দু। একের পর এক আসতে লাগল। চক্রকারে ঘুরে ঘুরে নামার প্রস্তুতি নিতে লাগল।
সকুকুজা ক্যাম্পে কনরাড বার্গকে টেলিফোন করল ডেভিড। এরপর ডেবরা আর জুলুকে নিয়ে উঠে বসল ল্যান্ড রোভারে। সকালের ঠাণ্ডা বাতাসের জন্য নরম কাপড় জড়িয়ে নিল গায়ে। পাখিদের অনুসরণ করে পৌঁছে গেল যেখানে বাফেলোর দলের উপর আঘাত হেনেছে অপহরণকারীর দল।
প্রথম শবদেহের কাছে পৌঁছাতেই পাখির দল সরে গেল গাড়ির শব্দ পেয়ে। হায়েনার দল গিয়ে পালালো গাছের মাঝে। উঁকি দিয়ে তাকিয়ে আবার দেখতে লাগল কী করে গাড়ি। ছোট লাল শিয়ালগুলো রুপালি পৃষ্ঠদেশ আর সাবধানী কান তুলে সম্মানজনক দূরত্ব পার হয়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে তাকাল।
শকুনগুলো মনে হলো অধৈর্য হয়ে উঠেছে। উড়ে উড়ে খেতে লাগল যা যা সম্ভব। ল্যান্ড রোভার একেবারে কাছাকাছি না আসা পর্যন্ত ভ্রূক্ষেপ করল না। এরপর উড়ে গেল কাছের গাছের ডালে।
ষোলটা মৃত বাফেলোর দেহ দেখা গেল। দলটা পালিয়ে যাবার চেষ্টা করছিল। এক লাইনে পড়ে আছে সব। প্রতিটি মৃত পশুর পেট দেখা গেল উন্মুক্ত। তারপর কোমরের মাংস কেটে নেয়া হয়েছে নিপুণ হাতে।
কয়েক পাউন্ড মাংসের জন্যে খুন করল এ অবোধ পশুগুলোকে। অবিশ্বাসীর ভঙ্গিতে বলে উঠল ডেবরা।
‘হম, তাই’, চিন্তিত স্বরে জানাল ডেভিড। কিন্তু এটা হয়তো এতটা খারাপ নয়–কখনো কখনো তো ওয়াইল্ড বিস্টকে মেরে ফেলে লেজ দিয়ে ফ্লাই উইক বানাতে আর জিরোফকে গুলি করে হাড়ের মাঝে থাকা মজ্জার জন্যে।
‘আমি বুঝতে পারছি না। নিরাশ ভঙ্গিতে বলে উঠল ডেবরা। একটা মানুষ কীভাবে এমনটা করতে পারে? মাংসের এত তো অভাব পড়ে যায়নি।
‘না’, একমত হলো ডেভিড। এর কারণ আরো বড়। এই ধরনের হত্যা করতে সাহস লাগে। এই মানুষটা হত্যার আনন্দেই হত্যা করে। দেখে মজা পায় কীভাবে অসহায় প্রাণীটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করে তাজা রক্তের গন্ধ পছন্দ করে’–গলা ধরে গেল তার। এই একবার তুমি ঈশ্বরকে ধন্যবান জানাতে পারো যে তুমি চোখে দেখতে পারো না। নরম স্বরে জানাল ডেভিড।
কনরাড বার্গ দেখতে পেল তাদেরকে। নিজের রেঞ্জারদেরকে পাঠিয়ে দিল পশুদের মৃতদেহগুলো পরিষ্কারের কাজে। এত মাংস নষ্ট করার কোন মানে হয় না। অনেক লোকের খাদ্যের সংস্থান হবে এতে।
এরপর স্যামকে ডাকলো। পা গুনে দেখা গেল চারজন এসেছিল। একজনের পায়ে ছিল হালকা রাবারের সোলওয়ালা জুতা। বাকিদের খালি পা।
‘একজন সাদা লোক, কেননা লম্বা পা আর বড়সড় শরীর বোঝা যাচ্ছে। কালো তিনজন মাংস বহন করে নিয়ে গেছে। এখানে-সেখানে রক্ত পড়ে আছে ফোঁটায় ফোঁটায়।
সবাই স্যামকে অনুসরণ করে আস্তে আস্তে উঠে এলো জঙ্গল থেকে বাইরের রাস্তায়।
এখান থেকে পিছন দিকে গেছে তারা। পর্যবেক্ষণ করে জানাল স্যাম। চিন্তিত স্বরে ব্যাখা করল কনরাড।
‘পুরাতন কৌশল ব্যবহার করেছে তারা। সীমান্ত না পার হওয়া পর্যন্ত পেছন দিকে গেছে। বেড়ার কাছে গেলে তোমার মনে হবে তারা অন্যপথে গেছে- ভেতরে ঢোকেনি। তাই তাদের পিছু নিতে চাইবে না তুমি।
বেড়ার কাছে গিয়ে দেখা গেল একটা অংশে কিছু নেই। রাস্তা পার হয়ে পেছনে উপজাতিদের গ্রাম। বোঝা গেল সেখানে কোন একটা মোটর ভেহিকেল পার্ক করা ছিল। এরপর বালির রাস্তা ধরে আবারো মহাসড়কে গিয়ে মিশেছে চাকার দাগ।
‘টায়ারের দাগ প্লাস্টার কাস্ট করা যায় না? জানতে চাইলে ডেভিড। ‘সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু হবে না। মাথা নাড়াল কনরাড। তুমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারো যে প্রতিবার বের হবার আগে চাকা বদলায় তারা। আর এ সেট বিশেষ ভাবে এ কাজের জন্যে। কাজ শেষ হবার পর লুকিয়ে রাখবে।
