ল্যান্ড রোভার থামালো ডেভিড। ইঞ্জিন বন্ধ করে লাফ দিয়ে নামল। কিছু সময় রেগেমেগে চুপ করে থাকার পর হঠাৎই হেসে উঠল সে।
কী দেখে এত খুশি হয়ে উঠেছো তুমি? জানতে চাইল ডেবরা।
‘দেখো_শুধু দেখো একবার। বলে উঠল ডেভিড।
‘পারলে তো তাই করতাম।
সরি ডেবস্। খেলার বেড়া একটা। আট ফুট লম্বা একটা বেড়া। উপরের দিকে শক্ত কাঠের পোলটা বেশ চওড়া।
‘ওরা আমাদের জন্য বেড়া দিয়েছে। ন্যাশনাল পার্কের লোকজন আমাদের জন্য বেড়া দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে এখানে কোন জন্তু জানোয়ার নেই।
বাসার দিকে ফিরতে ফিরতে ডেবরাকে ব্যাখ্যা করল ডেভিড যে গার ন্যাশনাল পার্কে আগে কোন বেড়া ছিল না। সবাই একসাথে মিলেমিশে থাকতে। জাবুলানির মিষ্টি পানি খেয়ে শুকনো মৌসুমে টিকে থাকতে জানোয়ারের দল।
বন্যপ্রাণীদের এই বিষয়টা মনে হচ্ছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে তোমার কাছে। চুপচাপ ডেভিডের কথা শোনার পর জুলুর গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে উত্তর দিল ডেবরা।’
হ্যাঁ, হঠাৎ করেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ব্যাপারটা। ওরা যখন ছিল, আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে সব সময় থাকবে। কিন্তু এখন নেই। এই না থাকাটা সত্যিই গুরুতৃপূর্ণ’ তিক্ত স্বরে হেসে উঠল ডেভিড।
‘আমার অবাক লাগছে যে আফ্রিকাতে এরকমটা সচরাচর হয় না– ব্যাপারটা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।’
আরো প্রায় এক বা দুই মাইল এগিয়ে গেল তারা কোন কথা না বলে। এরপরই দৃঢ়স্বরে জানিয়ে দিল ডেভিড : ‘আমি ওদেরকে বাধ্য করব এই বেড়া। সরাতে। ওরা আমাদের সাথে এভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। আমি এখনি হেড ওয়ার্ডেনের সাথে কথা বলব।’
ছেলেবেলার ছবি মনে করে কনরাডবার্গের কথা স্মরণ করল ডেভিড। সে সময় পার্কের দক্ষিণাংশের ওয়ার্ডেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে ভদ্রলোক। কিন্তু তখনো প্রধান হয়নি। মানুষটা সম্পর্কে বছরের পর বছর ধরে অনেক কল্প-কাহিনী গড়ে উঠেছে। এর মাঝে দুটো গল্পই পরিষ্কার বলে দেবে লোকটা কেমন।
রাত নামার পর পার্কের জনমানবহীন একটা জায়গায় ট্রাক নষ্ট হয়ে যায় কনরাডের। এরপর হেঁটে ঘরে ফেরার সময় প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সিংহ আক্রমণ করে তাকে। ধস্তাধস্তির মাঝে ভয়ঙ্কর ভাবে আহত হয় কনরাড। পিঠের অর্ধেক মাংস খুবলে তুলে সিংহ। এছাড়া কাঁধের হাড় আর হাতও কামড়ে দেয় জঘন্য ভাবে। তারপরেও মাত্র ছোট্ট একটা ছুরি দিয়ে পশু রাজকে মেরে ফেলে কনরাড। গলার মাঝে উপর্যুপরি আঘাতে প্রধান শিরা কেটে যায়। এরপরও আবার উঠে দাঁড়িয়ে পাঁচ মাইল হেঁটে ঘরে ফিরে আসে কনরাড। পেছন পেছন এসেছে হায়েনার দল, কখন সে পড়ে যাবে এই আলায়। যদিও সে পড়ে যায়নি।
অন্য আরেকটা ঘটনায় পার্কের পাশের এক এস্টেটের মালিক বার্গের একটা সিংহকে গুলি করে মেরে ফেলে। সীমান্তের অর্ধেক মাইলের মাঝে ঘটে এ ঘটনাটা। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কাজ করতে লোকটা। বেশ প্রভাব প্রতিপত্তি ছিল। কনরাডের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে উঠল।
‘এ ব্যাপারে তুমি কী করবে? বন্ধু। চাকরিটা তোমার পছন্দ নিশ্চয়ই?
নাকি? কিন্তু উপরের সব রকম চাপ অগ্রাহ্য করেও নিজের পক্ষে প্রমাণ সংগ্রহ করে বার্গ। কোর্ট থেকে শুনানীর আদেশ আসে। কোর্টের তারিখ যত কাছে আসে, চাপ ততই বাড়ে। কিন্তু দমবার পাত্র নয় বার্গ। অবশেষে কোর্টে দাঁড়িয়ে সাফাই দেয় সেই গুরুতুপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা। আদেশ ধার্য হয় এক হাজার পাউন্ড ফাইন অনাদায়ে ছয় মাস সশ্রম কারাদণ্ড।
পরে বার্গের সঙ্গে করমর্দন করে লোকটা। জানায়, সাহসের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। হয়তো এই একটি কারণে এখন প্রধান ওয়ার্ডনের দায়িত্বে আছে বার্গ।
টেলিফোনে কথা বলার পর গেম ফেন্সের কাছে ডেভিডের সাথে দেখা করার জন্য সম্মত হয়েছে বার্গ। বড়সড়, চওড়া আর লম্বা কনরাড বার্গ পেশীবহুল হাতে এখনো বহন করছে সিংহের কামড়ের দাগ। মুখের চামড়া রোদে পড়া লাল রঙের। পার্ক সার্ভিসের পক্ষ থেকে সানট্যান আর লম্বা টুপি পরে আছে সে। পরনের পোশাকে সবুজ ব্যাজ।
পেছনে সবুজ রঙের শেভি ট্রাক। দরজায় পার্কের স্মারক চিহ্ন আঁকা। পেছনে বসে আছে দু’জন কৃষ্ণ গেম রেঞ্জার। একজনের হাতে ভারী রাইফেল।
কোমরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে বার্গ। টুপি পেছনে ঠেলে রাখা আর চাহনিতে ভয়ঙ্কর ভাব। বোঝাই গেল নিজের অঞ্চলের উপর শক্ত হাতে রাশ টেনে রেখেছে লোকটা। ডেবরার উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে উঠল ডেভিড, এই রে, সমস্যা এসেছে।
বেড়ার ধার ঘেঁষে গাড়ি পার্ক করল ডেভিড। এরপর ডেবরাসহ নেমে এগিয়ে গেল।
মি. বার্গ। আমি ডেভিড মরগ্যান। আমার বাবা যখন জাবুলানি ক্রয় করেছিল তখন আপনাকে দেখেছিলাম আমি। আমার স্ত্রীর সাথে পরিচিত হলে খুশি হবো আমি।
একটু হতচকিত হয়ে পড়ল বার্গ। বোঝাই যাচ্ছে জাবুলানির নতুন মালিক সম্পর্কে অনেক কিছুই শুনেছে সে। এ জায়গাটা একেবারে বিচ্ছিন্ন চারপাশ থেকে। আর তার কাজই হলো সব খবর রাখা। তারপরেও এই বিভৎস চেহারার তরুণ আর তার অন্ধ কিন্তু সুন্দরী স্ত্রীর জন্য প্রস্তুত ছিল না কনরাড।
টুপি খুলতে গেল কনরাড। তারপর মনে হলো কী দরকার, মেয়েটা তো দেখতে পাবে না। বিড়বিড় করে কিছু একটা উচ্চারণ করল বার্গ। হাত বাড়িয়ে দিল ডেভিড। চিন্তিত ভঙ্গিতে হাতটা ধরল বার্গ।
