গাছপালার ফাঁকে ল্যান্ড রোভারকে পার্ক করে প্রধান পুলের কাছে তীরের উপর বানানো গ্রীষ্মের খড়ে ছাওয়া ঘরগুলোর দিকে নেমে গেল তারা।
পানি দেখে খুশি হয়ে উঠল জুলু। দু’জনের মাঝখানে খুশিতে লাফ-ঝাঁপ দিতে লাগল। বাতাসের মতোই পরিষ্কার পানি, কিন্তু গভীরে দেখা গেল কালো ছায়া।
মাটির মাঝে নখ ঢুকিয়ে গোলাপি একটা মোটাসোটা কেঁচো তুলে আনল ডেভিড। পানির গভীরে ছুঁড়ে ফেলতেই নিঃশব্দে উঠে এসে পানিতে আলোড়ন তুলল প্রায় তার হাতের সমান লম্বা একটা আকৃতি।
‘ওয়াও!’ হেসে ফেলল ডেভিড। চারপাশে এখনো এগুলো আছে। আমাদের উচিত ছিল সাথে করে বঁড়শি নিয়ে আসা। বালক বয়সে বহুদিন কাটিয়েছি আমি এখানে।
স্মৃতিতে পূর্ণ হয়ে আছে এ জঙ্গল। চারপাশে বেড়াতে বেড়াতে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল তার। এরপর আস্তে আস্তে চুপচাপ হয়ে গেল ডেভিড। জানতে চাইল ডেবরা : কী হয়েছে ডেভিড? বুঝলল কিছু একটা হয়েছে।
‘কোন প্রাণী দেখতে পাচ্ছি না। অবাক কণ্ঠে বলে উঠল ডেভিড। পাখি, হ্যাঁ আছে। কিন্তু একটাও পশু দেখিনি এখন পর্যন্ত। বাসা ছাড়ার পর থেকে একটাও না। একটা জায়গায় এসে থেমে গেল ডেভিড। এ জায়গাটা পানি খাবার জন্য চমৎকার ছিল। সারা দিন-রাত ব্যস্ততা থাকতো এখানে পশুর পাল সত্যিকার অর্থেই সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে।’
ডেবরাকে ছেড়ে আরো খাদের দিকে এগিয়ে গেল ডেভিড। সতর্কতার সাথে উপুড় হয়ে বসে পরীক্ষা করতে লাগল মাটি। অল্প কয়েকটা কুদু আর ছোট্ট একটা বেবুনের দল। বহু মাস ধরে এখানে বড় কোন পাল আসেনি বা বছর খানেক ধরে।
ডেবরার কাছে ফিরে আসার পর জানতে চাইল মেয়েটা, তোমাকে বিষণ্ণ দেখাচ্ছে।
‘পশুপাখি ছাড়া জাবুলানিকে কল্পনা করা যায় না। বিড়বিড় করে উঠল ডেভিড। চলল বাকি অংশে ঘুরে আসি। এখানে কিছু একটা আছে যা বোঝ যাচ্ছে না।
অলসভাবে ঘুরে বেড়াতে এসে পুরোদস্তুর শিকারির চোখে খোঁজা শুরু করল চারপাশ ডেভিড। প্রতিটি ঝোঁপ-ঝাড়ে চোখ বুলিয়ে দেখল। শুকিয়ে যাওয়া পানির নালা ধরে এগিয়ে গিয়ে হেঁটে দেখে এলো। এমনকি মাঝে মাঝেই ল্যান্ড রোভার থামিয়ে বন্য প্রাণীর সন্ধানে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল বালুভূমি।
‘এমনকি একটা ইম্পালাও নেই। উদ্বিগ্ন আর চিন্তিত স্বরে বলে উঠল ডেভিড। এখানে হাজারে হাজারে থাকার কথা ছিল। আমার মনে আছে প্রায় প্রতিটি গাছের নিচে চকচকে বাদামী আর ব্যালে ড্যান্সারদের মতোই সুন্দর সব দল থাকতো।’
ল্যান্ড রোভারকে উত্তরদিকে ঘুরিয়ে নিল ডেভিড। গাছপালার ভিড়ে একটা ট্রাক লক্ষ্য করে ছুটে চলল।
‘এখনে একটা চারণ ভূমি আছে। যেটা অক্ষত থাকার কথা।’
দুপুরের একটু আগে ধুলায় ভর্তি পাকা রাস্তায় পৌঁছালো গাড়ি। জাবুলানির উত্তর সীমান্ত দিয়ে ছুটে চলেছে এ রাস্তা। রাস্তার পাশের বেড়া দেখা গেল ভাঙা। মাঝে মাঝেই কিছু কিছু অংশ আবার বোঝা গেল যে মাটি থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে।
‘হেল, নরক শুলজার হয়ে আছে চারপাশে। বেড়ার দিকে তাকিয়ে ডেবরাকে উদ্দেশ করে বলে উঠল ডেভিড। সীমান্ত ঘেঁষে আরো দুই মাইল এগিয়ে চলল।
এমনকি পাথরের পিলারের উপর ব্রোঞ্জের সাইনবোর্ড, যেটা ডেভিডের বাবা শখ করে লাগিয়েছিল ও যেটা নিয়ে বেশ গর্ব বোধ করতো ডেভিড— ভেঙে চুড়ে ঝুলে আছে।
‘ওয়েল, অনেক কাজ করতে হবে এখানে আমাদেরকে। নিশ্চিন্তির স্বরে বলে উঠল ডেভিড।
গেইটের বাইরে অর্ধেক মাইল গিয়েই হঠাৎ করে তীক্ষ্ণ একটা মোড় নিল গাড়ি। দুপাশে লম্বা লম্বা ঘাস। বালুময় রাস্তার পুরোটা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল কুদু ষড়। ভূতের মতো বিবর্ণ আর সারা গায়ে মনে হলো চক দিয়ে লাইন টেনে রাখা হয়েছে। একনজরেই বোঝা গেল কতটা শক্তি এর গায়ে। উঁচু মাথা, কালো শিং আছে এতে, বিশাল কান দুটো এমনভাবে ঝুলে আছে যে বোঝা গেল মনোযোগ দিয়ে কিছু শুনছে সে।
মাত্র সেকেন্ডের জন্যে দেখা গেল এ ভঙ্গি, এরপরই ল্যান্ড রোভার দুইশ গজ দূরে থাকলেও ধোয়ার মতো মিলিয়ে যাবার জন্য উধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করল জটা। এত দ্রুত ঘটে গেল ব্যাপারটা যে মনে হলো স্বপ্ন দেখছে ডেভিড। ডেবরাকে সবটুকু বর্ণনা করে সে।
‘আমাদেরকে দেখার সাথে সাথে চলে গেল। আমার মনে আছে আগে। ওরা কতটা শান্ত টাইপের ছিল। আমরাই বরঞ্চ লাঠি নিয়ে সবজি ক্ষেত থেকে তাড়া করতাম ওদেরকে।
আবারো মূল ট্র্যাকে ফিরে এলো ডেভিড। এরপর আরো একটা নতুন পথে চালিয়ে নিয়ে এলো ল্যান্ড রোভারকে। নতুন গজানো চারাগাছগুলো ইতিমধ্যেই ঘন আর লম্বা হয়ে উঠেছে। ছোট্ট গাড়িটা নিয়ে এগুলোর উপর দিয়ে চলতে লাগল তারা।
‘কী করছোটা কী তুমি? গাছের ডাল ভাঙার শব্দে চিৎকার করে উঠল ডেবরা।
‘এদেশে রাস্তা থেকে নেমে পড়লে তোমাকেই তোমার রাস্তা তৈরি করে নিতে হবে।
আরো চার মাইল যাবার পর, জাবুলানির পূর্ব সীমান্তে চলে এলো তারা; তাদের আর ন্যাশনাল পার্কের মাঝের বিভেদ রেখা, যে পার্ক কিনা গোটা ইস্রায়েল ভূমির চেয়েও বড়। মিলিয়ন একর পর্যন্ত বনভূমি এখনো পুরোপুরি অক্ষত। তিনশ পঁচাশি কি.মি. লম্বা আর আশি কি. মি. চওড়া এ বনভূমি এক মিলিয়নের বেশি বন্যপ্রাণীর আবাসভূমি। এটিই আফ্রিকাতে বেঁচে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভয়ারণ্য।
