দু’মাসের মাঝেই বসবাসযোগ্য হয়ে গেল নতুন ঘর। সামনে বাগানের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল জানালার নিচে নিজের টেপ রেকর্ডার বসালো ডেবরা। সন্ধ্যার বাতাস এসে শীতল করে তোলে রুম। ভরে ওঠে ফ্রাঞ্জিপানি আর পইনসেটিয়ার সুভাসে।
জাবুলানিকে আরামদায়ক করে তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ডেভিড। এ সুযোগে নিজের কাজ গুছিয়ে নিল ডেবরা।
খুব দ্রুত চারপাশ সম্পর্কে সব জেনে নিল সে স্পর্শ আর অনুভূতির মাধ্যমে। মনের মধ্যে গেঁথে নিল পুরো জায়গার ছবি। সপ্তাহখানেকের মাঝেই স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন মানুষের মতো হাঁটাচলা করায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল। এছাড়া ভৃত্যদেরকেও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়া হলো যেন সেখানকার জিনিস সেখানেই রাখা থাকে। আর এই সব কাজে জুলু ল্যাব্রাডর কুকুরছানা চকচকে কালো ছায়া হিসেবে ঘুরতে লাগলরা ওর পিছুপিছু। অচিরেই বুঝে গেল যে ডেবরার প্রতি ওর সর্বক্ষণ নজর রাখা প্রয়োজন। তেমনি ভাবে ডেবরাই হয়ে উঠল তার প্রাণশক্তি।
শীঘ্রিই বুঝে গেল যে ডেবরার দিকে তাকিয়ে থাকা বা লেজ নাড়ানো অনর্থক। ডেবরার মনোযোগ পাবার জন্য ওকে কুই কুই আওয়াজ করতে হবে বা হাঁপানোর শব্দ করতে হবে। অন্যদিকে ভুলো মনা ডেবরা। কিছু বোকামি যেমন সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়া বা হাঁটার রাস্তার কোন বেকুব ভৃত্যের রেখে যাওয়া বালতিতে যে পা বেঁধে পড়ে না যায় ডেবরা তাই কাঁধ দিয়ে গুতো দেয়া বা নাক ঘষার মতো কাজগুলো করতে হয় জুলুকে।
এরই মাঝে প্রতিদিন দুপুর পর্যন্ত নিজের রুমে বসে কাজ করার অভ্যেস তৈরি গেল ডেবরার। পায়ের কাছে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতো জুলু।
ডেবরার রুমের বাইরের জানালার নিচে পাখির বড়সড় একটা গোসলের জায়গা ঠিক করে দিল ডেভিড। ফলে যে টেপ তৈরি করল তার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে শোনাতে অসংখ্য বন্য পাখির কিচিরমিচির। নেলঙ্কটে একটা টাইপিস্ট আবিষ্কার করে ফেলল ডেবরা, যে কিনা হিব্রু বলতে পারে। যতবার রসদ আনতে শহরে যেত সাথে করে ডেবরার রেকর্ড করা টেপ নিয়ে যেত ডেভিড। নিজের চিঠিপত্রের সাথে প্রতিবার আসার সময় টাইপ করা কাগজ নিয়ে আসতো ডেবরাকে পড়ে শোনানোর জন্যে।
এই কাজে একত্রে কাজ করতো তারা। জোরে জোরে প্রতিটি শব্দ ডেবরাকে পড়ে শোনাতো ডেভিড। ডেবরার কথা মতো ভুল-ত্রুটি সংশোধন করে দিত। এভাবে দেখা গেল সবকিছু চিৎকার করে পড়ার অভ্যেস হয়ে গেল ডেভিডের। খবরের কাগজ থেকে শুরু করে উপন্যাস, সবকিছুই চেঁচিয়ে পড়তে লাগল ডেভিড।
‘তুমি আশেপাশে থাকলে ব্রেইলির কী দরকার।’ মন্তব্য করে উঠল ডেবরা। কিন্তু শুধুমাত্র যে লিখিত শব্দই শুনতে চাইতো ডেবরা, তা নয়। চারপাশ সম্পর্কে প্রতিনিয়ত ডেভিডকে বলতে হতো ওর কাছে। তার জানালার নিচে পানি খেতে, গোসল করতে আসা, একটা পাখিও কখনো দেখেনি ডেবরা। কিন্তু অচিরেই প্রতিটির আওয়াজ পরিচিত হয়ে গেল তার কাছে। নতুন কোন পাখি এলে চট করে বুঝে ফেলতে।
‘ডেভিড, নতুন একটি পাখি এসেছে। কেমন দেখতে, নাম কী?
আর শুধু পাখা নয়, প্রতিটি খুঁটি-নাটি জিনিস বর্ণনা করতে হলো ডেভিডকে। এছাড়াও তাদের নতুন বিল্ডিং দেখতে কেমন হয়েছে, জুলুর কথা, ভৃত্যদের সুস্পষ্ট চলন বলন, জানালা দিয়ে দেখা বাইরের দৃশ্য সবকিছু মিলিয়ে নতুন জীবনের শত শত প্রশ্নের নিরন্তর উত্তর দিয়ে চলতো ডেভিড।
সময় মতো দালানের কাজ শেষ হলো আর অপরিচিত লোকজন জাবুলানি ছেড়ে চলে গেল। কিন্তু ইস্রায়েল থেকে মালিক স্ট্রিটের বাসার ফার্নিচার আর অন্যান্য জিনিস না এসে পৌঁছানো পর্যন্ত মনে হলো সত্যিকার অর্থে ঘর করা শুরু হলো না তাদের।
ডেবরার কাজ করার ঘরের জানালার নিচে পাতা হলো জলপাই কাঠের টেবিলটা।
‘আমি ঠিকভাবে কাজ করতে পারছিলাম না, মনে হচ্ছিল কী যেন নাই’ টেবিলের চারপাশে কারুকার্যের উপর হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠল ডেবরা,–এখন পর্যন্ত।
টেবিলের পাশের দেয়ালের শেষ্যে রাখা হলো ওর সব বই। আর নতুন লাউঞ্জে চামড়ার সোফা সুন্দর মানিয়ে গেল পশুর চামড়ার রাগ আর উল দিয়ে বোনা কার্পেটের সাথে।
ফায়ারপ্লেসের উপর ইলা কাদেশের আঁকা ছবিটাকে ঝুলিয়ে দিল ডেভিড। স্পর্শ করে করে এটার সঠিক অবস্থান মনের মাঝে গেঁথে নিল ডেবরা।
‘তোমার মনে হয় না এটা আরেকটু উপরে উঠলে ভালো হতো?
আর কোন কথা বলবে না মরগ্যান। আমাকে জানতে হবে যে এটি ঠিক কোথায় আছে।
এরপর বেডরুমে পাতা হলো বিশাল খাট। ঢেকে দেয়া হলো আইভরি রঙের বিছানার চাদর দিয়ে। এর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খুশি খুশি কণ্ঠে ডেবরা বলে উঠল।
‘এখন এখানে শুধু আরেকটা জিনিস বাকি আছে।’ ঘোষণা করল ডেবরা।
কী?’ ছদ্ম উদ্বিগ্নতার স্বরে জানতে চাইল ডেভিড। জরুরি কিছু?
এসো, এদিকে। হাত নেড়ে ডেভিডকে ডাকলো ডেবরা। “আমি তোমাকে দেখাচ্ছি এটা কতটা জরুরি।
.
এ ক’দিনের দৌড় ঝাঁপের মাঝে বাসা ছেড়ে আর কোথাও যায়নি তারা। কিন্তু হঠাৎ করেই এখন থেমে গেল সমস্ত কাজ।
‘আঠারো হাজার একর আর অসংখ্য চারপেয়ে প্রতিবেশী আছে আমাদের। চলো দেখে আসি সবাইকে।’ পরামর্শ দিল ডেভিড।
ঠাণ্ডা লাঞ্চের প্যাকেট সাথে নিয়ে নতুন ল্যান্ড রোভারে উঠে বসল তিনজন। জুলুকে জোর করে বসিয়ে রাখা হলো পেছনের সিটে। রাস্তাটা নেমে গেছে মুক্তোর ছড়ার দিকে। কেননা এস্টেটের সমস্ত প্রাণীর জীবনের কেন্দ্র হলো এটিই।
