হাতে প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে কেনাকাটা শুরু করল ডেভিড। একটু পরেই দেখা গেল ভারী হয়ে উঠেছে ব্যাগটা। এরপর তো উপচে ওঠার জোগাড় প্রায়।
‘রুটি আর হয়েছে। অনেক কিছু হয়ে গেছে। আর লাগবে না। নিজের মনেই ফর্দতে টিক চিহ্ন দিচ্ছে ডেবরা।
ইউকালিপটাস গাছের নিচ দিয়ে পাহাড়ের নিচে গেল দুজনে। পোতাশ্রয় দেয়ালের দিকে রঙিন ছাতার নিচে বসল একটা টেবিলে।
এমন ভাবে বসল যেন একে অন্যকে স্পর্শ করে রাখা যায়। পেশতা বাদাম খেতে খেতে ঠাণ্ডা বীয়ার পান করতে লাগল। সবকিছু সম্পর্কে কেমন উদাসীন মনে হলো তাদের। যদিও চারপাশের টেবিল ভরে আছে টুরিস্টে। চকচক করছে লেকের পানি। নরম আর গোলাকৃতি পাহাড়গুলোকে মনে হচ্ছে একেবারে কাছে। একবার উপত্যকার ওপাশে নামল একটা ফ্যান্টম প্লেন। খুব নিচু দিয়ে উড়ে গেল রহস্যজনকভাবে। এরপর কোন কিছু ছাড়াই আবার চলে গেল দক্ষিণে।
সূর্য নিচে নেমে এলে নোঙ্গড়ে বাঁধা স্পিডবোটের কাছে গেল দুজনে। হাত ধরে ডেবরাকে নামতে সাহায্য করল ডেভিড। তাদের উপরের দেয়ালে বসেছিল একদল টুরিস্ট। হতে পারে প্যাকেজের আওতায় তীর্থে এসেছে।
মোটর স্টার্ট দিয়ে দেয়াল থেকে সরে আসতে লাগল ডেভিড বোট নিয়ে। ষ্টিয়ারিং ধরে পোতাশ্রয়ের মুখে নিয়ে যাচ্ছে স্পিডবোট। পাশে বসে আছে ডেবরা। নরম স্বরে শব্দ করতে লাগল বোট।
বড়সড় লালমুখো একটা টুরিস্ট তাকাল দেয়ালের উপর থেকে নিচে। মনে করল মোটরের গুঞ্জনে চাপা পড়ে যাবে তার গলার স্বর। এমন ভাবে বলে উঠল স্ত্রীকে।
‘দু’জনের দিকে তাকিয়ে দেখো মেবিস। বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট, তাই না?
‘বাদ দাও বার্ট। তারা হয়তো বুঝতে পারবে।’
‘আরে ধূর! ওরা শুধুমাত্র হিব্রু বোঝে।
ডেবরা অনুভব করল তার হাতের নিচে শক্ত হয়ে গেল ডেভিডের হাত। বুঝতে পারল ঝটকা মেরে ছাড়া পেতে চাইছে ডেভিড। বুঝতে পারল রেগে উঠছে। কিন্তু শক্ত করে হাত ধরে শান্ত করতে চাইল ডেবরা।
‘চলো ডেভি, ওদের কথা ছাড়ো ডার্লিং, প্লিজ।
এমনকি কটেজের নিরাপত্তায় একা হবার পরেও চুপচাপই রইলো ডেভিড। শরীরে টেনশনের আভাস পেল ডেবরা। বাতাসও ভারী হয়ে আছে এতে।
একই ভাবে চুপচাপ নিঃশব্দে চিজ, রুটি, মাছ আর ফিগ দিয়ে রাতের খাবার শেষ করল দু’জনে। কী বলে ডেভিডের মন ভালো করে দেবে বুঝতে পারল না ডেবরা। কেননা শব্দগুলো তাকেও সমান ভাবে আঘাত করেছে। এরপর শুয়ে পড়ল তারা। দু’জনেই জানে জেগে আছে তারা। ডেবরাকে না ছুঁয়ে দুই হাত পাশে রেখে শুয়ে পড়ল ডেভিড। আর সহ্য করতে পারছে না ডেবরা। পাশ ফিরে ডেভিডের মুখে হাত বুলাতে লাগল। এখনো জানে না কী বলবে। কিন্তু নীরবতা ভাঙলো প্রথমে ডেভিড।
‘আমি মানুষের কাছ থেকে দূরে চলে যেতে চাই–আমাদের কাউকে দরকার নেই, তাই না?
না। ফিসফিস করল সে। আমাদের কাউকে দরকার নেই।’
জাবুলানি নামে একটা জায়গা আছে। আফ্রিকান জঙ্গলের মাঝে, কাছের শহরটাও বেশ দূরে। ত্রিশ বছর আগে আমার বাবা এটা কিনেছিল হান্টিং লজ হিসেবে। এখন এটা আমার…।’
‘বলো এ সম্পর্কে। ডেভিডের বুকের উপর মাথা রাখল ডেবরা। চুলে হাত বুলাতে বুলাতে কথা বলতে লাগল ডেভিড। কিছুটা শান্ত হয়ে এসেছে এখন।
অনেক বড় একটা সমভূমি অঞ্চল আছে। যেখানে খোলা জায়গায় জঙ্গলের মতো জন্মে থাকে মোপানি, মোহোবাহোবা, মোটাসোটা বাবারস আর কয়েকটা আইভরি তাল। এছাড়াও আছে হলুদ রঙের ঘাস। সমভূমির শেষে পাহাড়ের সারি। দূর থেকে দেখতে মনে হয় নীলের সারি। পাহাড়ের মাথাগুলো দেখে মনে হবে রূপকথার কোন প্রাসাদের গ্রানাইটের চূড়া। পাহাড়ের মাঝে আছে ঝরনা; যার জল কখনো শুকায় না; আর পানিও বেশ পরিষ্কার আর মিষ্টি
‘জাবুলানি কথাটার অর্থ কী? জানতে চাইল ডেবরা।
এর মানে আনন্দের জায়গা। জানাল ডেভিড।
‘আমি যেতে চাই ওখানে তোমার সাথে।
‘আর ইস্রায়েল? তুমি মিস করবে না?’ ডেবরার উত্তরে প্রশ্ন করল ডেভিড।
না। মাথা নাড়ল ডেবরা। দেখো আমার সাথেই যাবে এটি, আমার হৃদয়ে থাকবে।’
তাদের সাথে জেরুজালেমে গেল ইলা। গাড়ির পেছনের সিটের পুরোটা জায়গাই দখল করল সে। বাসা থেকে কোন কোন ফার্নিচার নেয়া হবে সে ব্যাপারে মনস্থির করতে ডেবরাকে সাহায্য করবে ইলা। পরে সেগুলো বেঁধে জাহাজে তুলে দেয়া হবে। বাকি আসবাবপত্র ওদের হয়ে বিক্রি করে দেবে ইলা। অ্যারন কোহেন বাড়ি বিক্রির তদবির করবে। ডেভিড আর ডেবরা দু’জনেরই মন খারাপ হয়ে গেল এটা ভেবে যে তাদের ঘরে থাকবে অন্য কেউ।
বাড়িতে মহিলাদের রেখে মার্সিজিড নিয়ে ইন কারেমে গেল ডেভিড। বাগানের পাশের দেয়ালের কাছে পার্ক করে রাখল গাড়ি।
আঙ্গিনার কাছের ঘরটাতে ওর জন্য অপেক্ষা করছিল ব্রিগ। দরজার কাছে ডেভিডের সম্ভাষণের উত্তরেও ঠাণ্ডা ভাবে তাকিয়ে রইল ব্রিগ। লৌহকঠিন অবয়বের মাঝে কোন সহজ ভাব নেই। নিষ্ঠুর যোদ্ধার চোখগুলোতে নেই কোন আন্তরিকতার চিহ্ন।
‘আমার ছেলের রক্ত হাতে নিয়ে এখানে এসেছো তুমি। বরফের মতো জমে গেল ডেভিড ব্রিগের চাহনি দেখে আর কথা শুনে। কিছুক্ষণ পরে দেয়ালের সাথে লাগানো উঁচু পিঠওয়ালা চেয়ার ইঙ্গিত করে দেখাল ব্রিগ। আড়ষ্ট পায়ে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসল ডেভিড।
‘যদি তুমি আরেকটু কম ভুগতে তাহলে আমি হয়তো আরো একটু বলার সুযোগ পেতাম। জানাল ব্রিগ। কিন্তু তুমি বুঝতেই পারছো যে প্রতিশোধ আর ঘৃণা কোন কাজের কথা নয়।’
