ডেভিডের একেবারে পাশ ঘেঁষে বসে আছে সে। হাসছে প্রাণ খুলে, একটু পরপরই ঝুঁকে যাচ্ছে ডেভিডের দিকে। মনে হলো যেন নিজেকেই নিশ্চিত করতে চাইছে ডেভিডের উপস্থিতি সম্পর্কে।
আবারো ডেভিডের দিকে তাকাল ইলা। চাইল স্বাভাবিকভাবে হাসতে। কিন্তু অপরাধীর মতো মনে এলো আরো নানা ভাব–বিতৃষ্ণা আর অনুতাপ দানবীয় মাথাটাকে দেখলেই এমন লাগছে তার। মনে হলো প্রতিদিন এভাবে যদি বিশ বছর ধরে ও এটা দেখতে থাকে, এখনকার মতোই লাগবে তার।
ডেভিডের কোন একটা কথায় আবারো হেসে উঠল ডেবরা। মুখ ঘুরিয়ে তাকাল ডেভিডের দিকে।
বিধ্বস্ত মাথা নিয়ে ডেভিডও ঝুঁকলো ডেবরার দিকে।
অসাধারণ সুন্দর একটি মুখের উপর এরকম ক্ষত-বিক্ষত মাংসাল মুখোশটা দেখে অবাক হলো ইলা।
ঠিক কাজটাই হয়েছে। একবারের জন্য হলেও সঠিক কাজটিই করেছি আমি। ওদের দুজনকে দেখতে দেখতে কেমন হিংসা বোধ করল ইলা। এই দু’জন দুজনের কাছে পুরোপুরি বাধা পড়ে গেছে। পারস্পরিক আচরণ দিয়ে হয়ে উঠেছে অবিচ্ছেদ্য।
মন খারাপ করে ইলা ভাবল স্মৃতির কোণে থাকা প্রেমিকদের লাইনের ছায়া। মনে হলো এরকম কোন বন্ধনে যদি সে নিজেও আবদ্ধ হতে পারতো। নাক টানলো ইলা। ডেভিড আর ডেবরা দুজনেই প্রশ্নবোধক ভাবে তাকাল তার দিকে।
‘বেদনার শব্দ, ইলা ডার্লিং!’ বলে উঠল ডেভরা। আমরা স্বার্থপরের মতো আচরণ করছি। প্লিজ কিছু মনে করো না।
‘কোনই বেদনা নেই, বাছারা আমার।’ ব্যাপারটাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিল ইলা। হাত ঝেড়ে বিদায় করে দিল নিজের স্মৃতির বোঝ। আমি তোমাদেরকে নিয়ে খুশি। তোমাদের মাঝে বেশ চমকপ্রদ কিছু ব্যাপার আছে–সুন্দর, শক্তিশালী আর অসাধারণ। নিজের জীবনের মতোই একে আগলে রেখো।’
নিজের ওয়াইন গ্লাস তুলে নিল সে। আমি টোস্ট করছি। আমি তোমাদেরকে দিয়েছি ডেভিড আর ডেবরা। কষ্ট সহ্য করেই এ ভালোবাসা হয়ে উঠেছে দুর্ভেদ্য।
সিরিয়াস ভঙ্গিতে টোস্ট করল সকলে। সোনালি হলুদ সূর্যালোকের নিচে বসে সোনালি হলুদ তরল পান করতে লাগল তিনজনে। আবারো অবশ্য অ্যাড ফিরে এলো। হাসিখুশি হয়ে উঠল তিনজনে।
অবশেষে শারীরিক চাহিদা মেটার পর আত্মিক দিকে এগিয়ে গেল দু’জনে। এর আগে এভাবে কখনো কথা বলেনি দু’জনে। এমনকি মালিক স্ট্রিটের বাসাতেও বাহূল্যমণ্ডিত সব শব্দ ব্যবহার করতো।
এখন সত্যিকার অর্থেই কথা বলা শিখেছে তারা। কোন কোন রাতে একেবারেই ঘুমোতো না তারা। জেগে থেকে অন্ধকারের মাঝে আবিষ্কার করে চলল একে অন্যের শরীর আর চেতনাকে। আনন্দের সাথে আবিষ্কার করল যে এ অভিযান বোধহয় কখনো শেষ হবে না। দুজনের মানসিক গণ্ডি কোন সীমানা দ্বারা আবদ্ধ নয়।
দিনের বেলা অন্ধ মেয়েটা ডেভিডকে শেখাতে লাগল কেমন করে দেখতে হয়। ডেভিড বুঝতে পারল যে নিজের চোখ আসলে কখনো ব্যবহারই করেনি সে। এখন দু’জনের হয়ে দেখার কাজ করার জন্য চোখকে সর্বোচ্চ ভাবে ব্যবহার করা শিখে গেল সে। প্রতিটি রঙ, গড়ন আর চলন হতে হবে একেবারে নিখুঁত। কেননা ডেবরার দাবি অগ্রাহ্য করা যাবে না। সবকিছু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই তার।
অন্যদিকে ডেভিড, যার নিজের আত্মবিশ্বাসই প্রায় টলে উঠেছিল, মেয়েটাকে শেখাতে থাকল কেমন করে নিজের উপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে হয়। ডেভিডের উপর বিশ্বাস বেড়ে যেতে লাগল ডেবরার আর ওর চাহিদা পূরণে সচেষ্ট হলো ডেভিড। সাহস নিয়ে গর্বিত ভঙ্গিতে ডেভিডের পাশে চলতে থাকল ডেবরা। জানে স্পর্শ বা ছোট্ট শব্দ দিয়ে তাকে পথ দেখাবে, সতর্ক করবে ডেভিড। ওর জীবন নির্দিষ্ট হয়ে গিয়েছিল কটেজ আর জেটি–এটুকুর মাঝে। এখন ডেভিড পাশে থাকায় আবারো বাইরের দুনিয়ায় আসার সাহস পেল মেয়েটা।
তারপরেও প্রথমে প্রথমে সাবধানে বের হতে লাগল দুজনে। একসাথে লেকের পাশে বেড়ানো বা পাহাড় বেয়ে নাজারেথের দিকে উঠে যাওয়া। প্রতিদিন সবুজ লেকের পানিতে সাঁতার কাটা আর মশারি ঘেরা বিছানায় আলিঙ্গন।
আবারো কৃশকায়, শক্তপোক্ত আর সান ট্যানড় হয়ে উঠল ডেভিড। মনে হলো তারা পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এমন একদিন ইলা জানতে চাইল
‘ডেবরা, নতুন বইয়ের কাজ শুরু করবে কবে?’ হেসে হালকা স্বরে উত্তর দিল ডেবরা।
‘আগামী এক বছরের মাঝে যে কোন সময়ে।
এক সপ্তাহ পর ডেভিডের কাছে জানতে চাইল, এখন তুমি কী করবে, ঠিক করেছে ডেভি?
‘ঠিক এখন যা করছি, তাই।’ উত্তর দিল ডেভিড। তাড়াতাড়ি ডেবরাও সায় দিল। সব সময়। ঠিক এভাবেই কাটবে চিরকাল।
এরপর এ সম্পর্কে কোন কিছু না ভেবেই, নিজেদেরকে এর জন্য প্রস্তুত না করেই গির্জা, যেখানে আরো অনেকের সাথে তাদের দেখা হবে যাবার প্রস্তুতি নিল তারা।
স্পিডবোট ধার নিল ডেভিড। ইলার কাছ থেকে নিল বাজারের ফর্দ। পরিকল্পনা করল লেক থেকে তিবেরিয়াসে যাবে।
লিডোর ছোট্ট পোর্টে নোঙ্গর করল তারা। তারপর হেঁটে প্রবেশ করল শহরে। ডেবরার সাহচর্যে এতটাই উৎফুল্ল ছিল ডেভিড যে তার চারপাশে খানিকটা উৎসুক দৃষ্টির ভিড় দেখলেও গ্রাহ্য করল না।
সিজন এখনো ভালো ভাবে শুরু হয়নি। তারপরেও শহর ভরে গেছে ভ্রমণার্থীতে। পাহাড়ের পায়ের কাছে স্কয়ারে পার্ক করে রাখা আছে অনেক বাস। লেকের সামনেও বাস আছে। তাই বোঝা গেল এ রাস্তা ভর্তি হয়ে আছে ভ্রমণার্থিতে।
