এক মুহূর্ত চুপ করে রইল ইলা। ডেবরা এগিয়ে এলো তার কাছে। কী জানতে চাইল সে।
‘ডেভিডের প্লেন পুড়ে গেছে। আর মাথায় খুব বাজে ভাবে পোড়র আঘাত পেয়েছে সে। এখন পুরোপুরি সুস্থ। পোড়া ক্ষত শুকিয়ে গেছে কিন্তু
দ্বিধা করতে লাগল ইলা। ডেবরা ওর হাত চেপে ধরল। বলো ইলা! কিন্তু?’
‘ডেভিড আর আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মানুষটি রইল না।’
‘আমি বুঝতে পারছি না।’
‘ও আর আগের মতো দ্রুত আর প্রাণশক্তিতে ভরপুর নেই–যে কোন নারী ওকে এখন দেখতে পেলে ভালোবাসা তো দূরের কথা কাছেই যেতে চাইবে না।’
মনোযোগ দিয়ে শুনছিল ডেবরা। এখন মুখের ভাব হয়ে গেল নরম।
‘ও এখন নিজের ব্যাপারে সচেতন। লুকিয়ে যাবার মতো কোন জায়গা খুঁজছে, আমার মনে হয়। ও উড়ে যাবার কথা বলছে যেন এভাবেই পালাতে চায়। ও জানে ও এখন একা, মুখোশের কারণে পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন’
কুয়াশা দেখা গেল ডেবরার চোখে। গমগমে কণ্ঠস্বর খানিকটা শান্ত করে বলে চললো ইলা।
‘কিন্তু একজন আছে যে কখনো এই মুখোশ দেখতে পাবে না।’ মেয়েটাকে নিজের দিকে টেনে নিল ইলা। একজন কেউ ওকে আগের মতোই মনে রেখেছে। ইলার হাতে ডেবরার চাপ বাড়লো। হাসতে শুরু করল সে এটা এমন একটা অভিব্যক্তি যা একেবারে তার ভিতর থেকে উঠে আসে।
‘ওর এখন তোমাকে দরকার ডেবরা।’ নরম স্বরে জানাল ইলা। এই একমাত্র জিনিস আছে ওর জন্য। তোমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে তুমি?
‘ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো ইলা। কেঁপে গেল ডেবরার গলার স্বর। ‘যত তাড়াতাড়ি পারো ওকে আমার কাছে নিয়ে এসো।’
৫. দীর্ঘ সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে
দীর্ঘ সিঁড়ির ধাপ পেরিয়ে ইলার স্টুডিওতে উঠে এলো ডেভিড। বাইরে উজ্জ্বল সূর্যের আলো। ওর পরনে খোলা স্যান্ডেল আর ব্রোঞ্জ রঙের হালকা স্ন্যাক, চওড়া ভি-গলার খাটো হাতার শার্ট। সূর্যের আলো না পাওয়ায় বিবর্ণ হাতের রঙ। নরম ক্রীমের তুলনায় গাঢ় দেখাচ্ছে বুকের লোম। মাথার সূর্যের তাপ না লাগার জন্য আর মুখের উপর ছায়া রাখার জন্য পরে আছে চওড়া কানাওয়ালা টুপি।
থেমে গেল সে। বুঝতে পারল শার্টের নিচে ঘামছে। ফুসফুস লাফাচ্ছে। ছাদে উঠে আসতেই শারীরিক ভাবে দুর্বল বোধ করল। পা দুটো কাঁপছে, পরিত্যক্ত মনে হচ্ছে জায়গাটা। বন্ধ দরজা খুলে ভেতরের অন্ধকারে পা রাখল ডেভিড।
ঘরের মাঝখানে মেঝেতে সমরকন্দ থেকে আনা কার্পেটের উপর বসে আসে ইলা কাঁদেশ। তার পরনে সংক্ষিপ্ত বিকিনি। পদ্মাসনে বসে যোগ ব্যায়াম করছে সে। অজগরের মতো পেঁচিয়ে আছে ওর বিশাল পা দুটো। হাত দুটো সামনে তালুতে তাল ঠেকিয়ে রাখা ধ্যানস্থ হওয়ায় চোখ বন্ধ; মাথার উপরে টুপি চারটে চৌকোনা তৈরি করেছে বিচারকদের মতো।
দরজার কাছে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়াল ডেভিড। কিন্তু নিঃশ্বাস নেবার আগেই হাসতে শুরু করল। শুরু হলো ছোট্ট বুদবুদের মতো হিসহিস শব্দ করে; তারপর হঠাৎ করেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল সে। হাসির দমকে কাঁপতে লাগল সে। বুঝতে পারল আগের মতো আর ফিট নয় সে। এভাবেই বেঁচে থাকা শিখতে হবে তাকে।
ইলা বুঝতে পারল সবকিছু। নড়াচড়া না করলেও আনন্দরত বুদ্ধের ন্যায় ছোট্ট একটা চোখ খুলে তাকাল। এখন ব্যাপারটা হয়ে গেল আরো মজাদার আর হাস্যকর। দরজা থেকে গড়িয়ে হাসতে হাসতে একটা চেয়ারের উপর। পড়ে গেল ডেভিড।
‘তোমার আত্মা একেবারে শুকনো, ডেভিড মরগ্যান’, বলে উঠল ইলা। ‘তোমার কোন সৌন্দর্য বোধ নেই, সমস্ত আকর্ষণ শুধুমাত্র- বাকিটুকু আর বলতে পারল না সে। হাসতে হাসতে জেলির মতো গলে যেতে লাগল। প্রায় হেঁচকি ওঠার মতো অবস্থা হলো দু’জনের।
‘আমি জমে গেছি। অবশেষে থামলো ইলা। সাহায্য কর ডেভি’, ওফ
তাড়াতাড়ি ইলার দিকে এগিয়ে গেল ডেভিড। হাঁটু গেড়ে বসে চেষ্টা করল ভাঁজ করা পা খুলে দিতে। একটু পরেই নানা কসরতের পর খুলে গেল পা। মট করে শব্দ হয়েই কার্পেটের উপর পড়ে গেল ইলা। একই সাথে খিকখিক করে হাসতেও লাগল।
‘সরো এখান থেকে।’ তাড়াতাড়ি বলে উঠল ইলা। আমাকে শান্তিতে একটু মরতে দাও। যাও তোমার নারীর কাছে, জেটির উপরে আছে।
তাকিয়ে দেখল দ্রুতপায়ে চলে গেল ডেভিড। বহু কষ্টে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গেল ইলা। হাসি থামিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, আমার ছোট্ট দুটো বিড়াল ছানা-ভেবে অবাক লাগছে ঠিক কাজটাই করেছি কিনা। চেহারায় খানিকটা চিন্তার ছায়া এসেও মুছে গেল। যাই হোক, দেরি হয়ে গেছে কাঁদেশ, আর হাত দিও না এতে। আগেই ভাবা উচিত ছিল যা ভাবার।
.
রঙিন তোয়ালে আর বীচ্ জ্যাকেট পড়ে আছে জেটির উপর। আরো আছে উঁচু ভলিউমে বাজাতে থাকা একটা ট্রানজিষ্টার রেডিও। ভারী রক টিউন বেজে উঠছে। খানিকটা দূরে উপসাগরে একা সাঁতার কাটছে ডেবরা, স্থির হয়ে শক্ত ভাবে উলটো সাঁতার কাটছে সে। প্রতিটি স্ট্রোকের সাথে সূর্যের আলোয় ঝিক করে উঠছে ওর বাদামী পা। পায়ের শব্দে পানি ছিটছে ফোয়ারের মতো।
থেমে ভেসে রইল ডেবরা। গোসলের টুপি একেবারে সাদা। ডেভিড দেখতে পেল খানিক থেমে রেডিওর শব্দ শুনল ডেবরা; আবার সাঁতার কাটতে লাগল। সরাসরি-জেটির দিকে ফিরে আসছে এখন।
পানি থেকে উঠে এসে মাথার টুপি খুলে চুল ঝাড়া দিল। শরীরের ত্বকের রং হয়ে গেছে গাঢ়, সূর্যের তাপে নিশ্চয়ই এই অবস্থা আর সারা শরীরে মুক্তোর মতো পানির ফোঁটা। দেহের প্রতিটি পেশী শক্ত আর দৃঢ়। আত্মবিশ্বাসীর ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছে সে। প্রতি পদক্ষেপে ফুটে উঠল মানসিক শক্তির পরিচয়।
