চেটেপুটে সব সাবাড় করে দিল ডেভিড। ঠাণ্ডা বীয়ার দিয়ে এমন ভাবে খেলো যেন কতদিনের অনাহারী সে। শুনতে লাগল সাথে ইলার বকবকানি। মরণার মতো ছিটকে বের হতে লাগল শব্দের বহর। ইলা চেষ্টা করল এর মাধ্যমে নিজের অস্বস্তিকে ঢেকে রাখতে।
‘তারা আমাকে তোমার সাথে দেখা করতে দেয়নি। কিন্তু আমি প্রতি সপ্তাহে ফোন করে খবর নিয়েছি। সিস্টার আর আমার মাঝে বেশ বন্ধুত্বও হয়ে গেছে। সে আমাকে জানিয়েছে যে তুমি আজ আসবে। তাই আমি চেষ্টা করেছি তোমার জন্য তৈরি থাকার
এমন ভাবে কথা বলছে ইলা যেন সরাসরি ডেভিডের দিকে তাকাতে না হয়। তারপরেও চোখে চোখ পড়লেই দেখা গেল ছায়া। যদিও সেটা লুকাতে সদা সচেষ্ট ইলা। অবশেষে খাওয়া শেষ করল ডেভিড। জানতে চাইল ইলা; ‘এখন তুমি কী করবে ডেভিড?’
‘আমার যেটা ইচ্ছে তা হলো ফিরে গিয়ে আকাশে উড়ে যাওয়া। এটা করতেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি আমি–কিন্তু তারা আমাকে বাধ্য করেছে। কমিশন থেকে পদত্যাগ করতে। আমি আইন অমান্য করেছি। জো আর আমি ওদের অনুসরণ করে সীমান্ত পর্যন্ত গিয়েছিলাম তাই তারা আমাকে আর চায় না।’
‘যুদ্ধ প্রায় শুরু হয়েই যাচ্ছিল ডেভিড। তুমি আর জো সত্যিই পাগলামী করেছে।
মাথা নাড়ল ডেভিড। আমি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আমি সেদিনের পর থেকে সোজা ভাবে আর কিছুই ভাবতে পারছিলাম না– ডেবরা_
তাড়াতাড়ি থামিয়ে দিল ইলা। হ্যাঁ, আমি জানি। আর একটা বীয়ার নেবে?
বাধা দেবার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল ডেভিড। ও কেমন আছে, ইলা?’ পুরো সময় ধরে এই প্রশ্নটাই করতে চাইছে সে।
‘ও ভালো আছে। ডেভি। নতুন বই শুরু করেছে আর মনে হয় প্রথমটার চেয়েও ভালো হবে। আমার মনে হয় ও খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক হয়ে উঠবে।
‘ওর চোখ? কোন উন্নতি হয়েছে?
মাথা ঝাঁকালো ইলা। ও এটা মেনে নিয়েছে। এখন মনে হয় না এতে কিছু আর যায় আসে। যেভাবে তুমিও যা হয়েছে তাকে মেনে নেবে’।
কিছুই শুনছিল না ডেভিড। ইলা এই সময়টুকুতে, যতদিন আমি হাসপাতালে ছিলাম শুধু এটুকুই আশা করেছি যে–আমি জানি যে এটা অনর্থক কিন্তু তারপরেও আশা করেছি ও আমার সাথে কথা বলবে। একটা কার্ড, একটা শব্দ–’
‘ও জানেই না ডেভি।
জানে না?’ তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল ডেভিড। টেবিলের ওপাশ থেকে বঁকে ইলার হাতের কব্জি চেপে ধরল, এর মানে কী?
‘জো মারা যাবার পর ডেবরার বাবা অনেক রেগে গেছে। সে বিশ্বাস করে যে এর জন্য তুমিই দায়ী।
মাথা নাড়ল ডেভিড। মুখের শূন্য মুখোশেও ফুটে উঠল অপরাধবোধ।
‘ডেবরার বাবা ওকে জানিয়েছে যে তুমি ইস্রায়েল ছেড়ে চলে গেছে। আমরা সবাই প্রতিজ্ঞা করেছি যে এ ব্যাপারে নীরব থাকবো। ডেবরা এটাই বিশ্বাস করে এখন।
ইলার কব্জি ছেড়ে দিল ডেভিড। নিজের বীয়ারের গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিল।
‘তুমি এখনো আমার প্রশ্নের উত্তর দাওনি ডেভিড? এখন কী করবে তুমি?
‘আমি জানি না ইলা। আমাকে ভাবতে হবে মনে হয়।
পাহাড়ের দিক থেকে বয়ে আসছে গরম বাতাসের হল্কা। লেকের দিকটা প্রায় কালোই দেখাচ্ছে। নোঙ্গরে বাঁধা অবস্থায় দুলছে ফিশিং বোটগুলো। ঝুলিয়ে রাখা জালের সারি উড়ছে নববধূর ওড়নার মতো।
ডেবরার চুলে এসে লাগল বাতাসের ঝাপটা। খুলে গিয়ে মনে হলো মেঘ জমেছে। শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে গায়ের সিঙ্কের পোশাক।
ক্রুসেডার দুর্গের ছাদের উপর দাঁড়িয়ে নিজের লাঠির মাথার উপর হালকা ভাবে রাখল দুই হাত। তাকিয়ে রইল পানির দিকে। যেন সত্যিই দেখতে পাচ্ছে সে।
পাশে বসে আছে ইলা। মিস্ত্রিদের ফেলে যাওয়া একটা ব্লকের উপর বসে আছে ইলা। কথা বলার সময় এক হাত দিয়ে ধরে রাখল মাথার টুপি। ডেবরার মুখের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ওর মনোভাব বুঝতে চাইল ইলা।
‘একটা সময় মনে হয়েছিল এরকম করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। আমিও রাজি হয়েছিলাম সত্যিটা তোমার কাছে থেকে লুকিয়ে রাখার পক্ষে। কারণ আমি চাইনি যে তুমি নিজেকে কষ্ট দাও–
তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠল ডেবরা আর কখনো এরকম করবে না।
মাথা নেড়ে একমত হয়ে বলে চলল ইলা, আমার জানার কোন উপায় ছিল না যে ও কতটা আঘাত পেয়েছে। কেউ আমাকে ওর সাথে দেখা করতে দেয়নি।
রাগতভাবে মাথা নাড়ল ডেবরা। কিন্তু চুপ করে রইল। ইলা আবারো অবাক হলো দেখে যে দৃষ্টিহীন চোখেও এতটা অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে পারে। ইলার দিকে মাথা নাড়তেই মধুরঙা চোখের বিদ্যুৎ স্পষ্ট বোঝা গেল।
‘এ সময় তোমাকে আঘাত করা উচিত ছিল। তাই না ডিয়ার? তুমি এত সুন্দর ভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছো–বই নিয়ে কাজ করছে। আমার মনে হয়েছে তোমাকে বলে কোন লাভই হবে না। আমি তাই তোমার বাবার সাথে সাহায্য করার প্রতি মনস্থির করেছি। দেখো কেমন করে সব হয়ে গেল।
‘তাহলে এখন কেন বলছো আমাকে’, জানতে চাইল ডেবরা। তাহলে এখন কেন তোমার মত পরিবর্তন করেছ? কী হয়েছে ডেভিডের?
‘গতকাল দুপুরবেলা হাদ্দাসা হাসপাতালে থেকে রিলিজ দেয়া হয়েছে ওকে।
হাসপাতাল? হতভম্ভ হয়ে গেল ডেবরা। তুমি নিশ্চয়ই বলতে চাইছে না যে ও এতদিন হাসপাতালে ছিল? নয় মাস–এটা অসম্ভব!
‘এটাই সত্যি।
‘তার মানে ও অনেক আঘাত পেয়েছে। ডেবরার রাগ পরিণত হয়ে গেল উদ্বিগ্নতায়। “ও কেমন আছে ইলা? কী হয়েছে? এখন সুস্থ হয়েছে?
