ঘুরে হাঁটা ধরল মেজর। পাথরের মেঝেতে জুতার শব্দ শোনা গেল পরিষ্কার।
হাসপাতালের সরু লবিটাতে দাঁড়িয়ে হঠাৎ করেই ডেভিডের ইচ্ছে হলো কাঁচের সুইং ডোর ঠেলে চলে যায় বাইরে, বসন্তের নরম রোদের তাপ পোহাতে। আগে একবার শুনেছিল যে বহুদিন ধরে কয়েদ থাকা কয়েদীর যখন মুক্তির সময় হয়ে আসে তখন নাকি এমন লাগে।
দরজার কাছে পৌঁছে পাশ ফিরে দেখল হাসপাতালের ছোট্ট প্রার্থনার জায়গা। নীরব চৌকোনো হলের এক কোণায় গিয়ে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো ডেভিড। অনেক উঁচু পর্যন্ত উঠে গেছে কাঁচের জানালা। রঙিন কাঁচের ভেতরে দিয়ে এসে পড়েছে সূর্যের আলো হলের মেঝেয়। একটুখানি শান্তি আর জায়গাটার সৌন্দর্য ভরে তুললো তাকে। সাহস করে উঠে দাঁড়াল ডেভিড। হেঁটে বের হয়ে চলে এলো রাস্তায়। জেরুজালেমগামী একটা বাসে উঠে বসে। পড়ল।
বাসের মাঝবরাবর জানালার পাশে একটা সিটে বসে পড়ল ডেভিড। আস্তে আস্তে চলতে লাগল বাস। পাহাড়ের উপর উঠে ছুটে চলল শহর। অভিমুখে।
একটু পরেই খেয়াল হলো যে তাকে কেউ দেখছে তাকিয়ে তাকিয়ে। মাথা তুলতেই দেখতে পেল তার সামনের সিটেই দুই বাচ্চা নিয়ে বসে আছে এক তরুণী মা। মলিন কাপড় পরিহিত তরুণীকে দেখে বোঝা গেল তার জীবনের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বহু ঝড় বয়সের আগেই তাকে বুড়ো বানিয়ে দিয়েছে। কোলের কাছে ধরা ছোট্ট শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে। দ্বিতীয় বাচ্চাটার চেহারা একেবারে স্বর্গদূতদের মতো। বয়স হবে চার কী পাঁচ। বড় বড় কালো চোখ আর মাথাভর্তি ঘন কোঁকড়া চুল। সামনের সিটে বসলেও পেছন ফিরে ডেভিডের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। বুড়ো আঙুল পুরে দিয়েছে মুখের ভেতর। মনোযোগ দিয়ে ডেভিডের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটা। পর্যবেক্ষণ করছে শিশুসুলভ কৌতূহল নিয়ে। হঠাৎ করেই মেয়েটার প্রতি কেমন মায়া জেগে উঠল তার মনে। মানুষের সংস্পর্শে আসার তাগিদ অনুভ করল। এত মাস ধরে এর অভাব বোধ করেছে সে।
ঝুকে সামনের দিকে গেল ডেভিড। হাসার চেষ্টা করে এক হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করল মেয়েটাকে।
মুখ থেকে হাত বের করে তাড়াতাড়ি সরে গেল মেয়েটা। মায়ের দিকে ফিরে হাত ধরে মুখ লুকালো মায়ের ব্লাউজের ভেতর।
পরের স্টপেজে বাস থেমে নেমে গেল ডেভিড। রাস্তা ছেড়ে পাথুরে পাহাড়ের পথ বেয়ে ওঠা শুরু করল।
দিনটা বেশ উষ্ণ আর কেমন ঝিম ধরা ভাব চারপাশে। পীচ্ ফলের বাগান থেকে মৌমাছির গুঞ্জন আর ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে। ছাদে উঠে গেল ডেভিড। কিনারের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বুঝতে পারল কাঁপছে; অস্থির লাগছে তার। মাসের পর মাস হাসপাতালে কাটানোতে বহুদূর পর্যন্ত হাঁটার অভ্যেস নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু শুধু এটাই যে কারণ নয় তাও বেশ বুঝতে পারল। বাচ্চা মেয়েটার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাটুকু তাকে বেশ নাড়া দিয়েছে।
মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো ডেভিড। একেবারে পরিষ্কার উজ্জ্বল নীল রঙে ছেয়ে আছে চারপাশ। উত্তরের দিকে অনেক উঁচুতে খানিকটা মেঘ। মনে হলো ওখানে যেতে পারলেই শান্তি খুঁজে পেত সে।
মালিক স্ট্রিটের উপর একটা ট্যাক্সি নামিয়ে দিয়ে গেল ডেভিডকে। সদর দরজা খোলা। তালায় চাৰি ঢোকানোর আগেই ধাক্কা দিতেই খুলে গেল।
বিস্মিত আর সতর্ক হয়েই লিভিং রুমে পা দিল সে। ঠিক তেমনটিই আছে যেমনটা সে বহু মাস আগে রেখে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ এসে নিয়মিত ঝাড় দিয়েছে, পরিষ্কার করেছে। জলপাই কাঠের টেবিলের উপরে রাখা ফুলদানিতে তাজা ফুল-হলুদ আর বেগুনি রঙের ডালিয়া ফুলের বড়সড় একটা তোড়া।
খাবারের গন্ধ পেল ডেভিড। গরম গরম আর মসলাদার। হাসপাতালের দিনগুলোর তুলনায় একেবারে ভিন্ন আবহ এখানে।
“হ্যালো।’ ডেকে উঠল ডেভিড। কে এখানে?
‘ওয়েলকাম হোম! বন্ধ বাথরুমের দরজার ভেতর থেকে পরিচিত কণ্ঠে কথা বলে উঠল কেউ। আমি ভাবিনি তুমি এত তাড়াতাড়ি আসবে–আমার স্কার্ট উপরে আর প্যান্ট নিচে।
এরপর বজ্রগর্জনে বাথরুমের ফ্লাস টানা হলো আর দরজা গেল খুলে। জমকালো ভাবে বের হয়ে এলো ইলা কাঁদেশ। তার বিশাল কাফতানগুলোর একটা পরনে, প্রাথমিক রংগুলোর মিশেল দেখা গেল তাতে। মাথার টুপিতে আপেল সবুজ রঙ, পাশের আবার একটা মুরগির পাখা গোঁজা। মনে হলো যেন অস্ট্রেলিয়ান বুশ হ্যাট। সাথে আরো আছে বিশাল জেড পাথরের ব্রোচ আর উটপাখির পালকগুচ্ছ।
স্বাগত জানানোর ভঙ্গিতে নড়ে উঠল বিশাল হাত দুটো। মুখে ভেসে উঠল সন্দেহের হাসি। ডেভিডের দিকে এগিয়ে এলো ইলা। সন্দেহ চলে গিয়ে উজ্জ্বল ছোট ছোট চোখে দানা বাঁধলো ভয়। চলার গতি হয়ে গেল শ্লথ।
‘ডেভিড?’ অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে উঠল ইলা। এটা তুমি, ডেভিড?
‘হ্যালো ইলা।’
“ওহ, ঈশ্বর। ওহ, ঈশ্বর। ওরা কী করেছে তোমার সাথে, হে তরুণ দেবতা
‘শোন ত্যাঁদড়ের ছানা কর্কশ স্বরে বলে উঠল ডেভিড, যদি এরকম বিড়বিড় করা শুরু করো তাহলে সিঁড়ি দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেবো।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করল ইলা। চোখে আসা পানি চেষ্টা করল আবারো ফেরৎ পাঠাতে। কিন্তু ঠোঁট কেঁপে উঠল, গলা ভারী হয়ে এলো। নাক টেনে এগিয়ে এসে বিশাল হাতে বুকে চেপে ধরল ডেভিডকে।
‘রেফ্রিজারেটরে এক কেস ঠাণ্ডা বীয়ার রেখে দিয়েছি আর আমাদের জন্য কারী রান্না করেছি। আমার রান্না পছন্দ হবে তোমার। এই কাজটা আমি সত্যিই ভাল পারি।’
