“ঠিক আছে।’ তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেল ডাক্তার। এটা এমন কোন গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় নয় যে এখনি করতে হবে। ভবিষ্যতে যে কোন সময় আসতে পারো তুমি।’ ওয়ার্ডের দরজার কাছে চলে গেল ডাক্তার। চলো। আয়না খুঁজে বের করা যাক।
প্যাসেজের শেষে ডাবল দরজার পেছনে নার্সরুমে পাওয়া গেল একটি। রুমটা একেবারে খালি। ওয়াশ বেসিনের উপর দেয়ালের সাথে লাগানো আছে আয়নাটা।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল সার্জন। সিগারেট জ্বালিয়ে দেখতে পেল হেঁটে আয়নার সামনে গেল ডেভিড। নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে গেল হঠাৎ করে।
পায়জামার উপর নীল রঙের হাসপাতালের ড্রেসিং গাউন পরে আছে ডেভিড। লম্বা-চওড়া শরীর, সরু কোমর আর পুরুষালি শরীর।
যাই হোক, এর উপরে মাথা দেখে মনে হলো দুঃস্বপ্ন দেখছে ডেভিড। আপনাতেই হাঁ হয়ে গেল মুখ। শক্ত, ঠোঁট বিহীন মুখ, মনে হলো কোবরা।
আতঙ্কে জমে গেলেও আয়নার আরো কাছে এগিয়ে গেল ডেভিড। চুলের গোছা না থাকায় অদ্ভুত দেখাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত খুলি। কখনো আগে ভাবেনি যে চুল না থাকলে এমন দেখাবে মাথা।
মুখের চামড়া আর মাংসে হাজারো কাটাকুটির মতো চিহ্ন। গালের উপর চামড়া টানটান হয়ে আছে। অনেকটা এশিয়াটিক ভাব এসেছে চেহারায়। কিন্তু চোখগুলো দেখাচ্ছে গোলগাল, নাজুক চোখের পাতা আর ভয়াবহ ফোলা ফোলা মাংসপিণ্ড।
নাকের কোন গড়ন বোঝা যাচ্ছে না। মাথার পাশে কানের জায়গায় হাস্যকর কিছু একটা ঝুলে আছে। পুরোটাই নগ্ন আর সেদ্ধ কিছু একটা দেখাচ্ছে।
হাসতে গেলে ভয়ঙ্কর ভাবে মোচড় খায় চামড়া। তারপর আবার শক্ত হয়ে যায়।
‘আমি হাসতে পারছি না।’ বলে উঠল ডেভিড।
না।’ একমত হলো সার্জন। তোমার অভিব্যক্তির উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকবে না তোমার।
ব্যাপারটা চিন্তা করতে গেলে সত্যিই ভয়াবহ। এটা কোন মোচড় খাওয়া বা নির্যাতিত মাংসপিণ্ড নয়। দেখা যাচ্ছে যেসব সেলাইয়ের দাগ সেসবও মুখ্য নয় পুরোটা মনে হচ্ছে একটা অভিব্যক্তিহীন মুখোশ জমে যাওয়া মুখখানা দেখে মনে হলো বহু আগেই মারা গেছে সে, মানবিক কোন অনুভূতি বা উষ্ণতা ফুটে উঠল না চেহারায়।
‘ইয়াহ! কিন্তু অন্যদেরকে দেখা উচিৎ আপনার!’ নরম স্বরে জানাল ডেভিড।
‘আগামীকাল তোমার কানের পেছনে থাকা বাকি সেলাইগুলোও কেটে দেব আমরা। হাত থেকে বাকি মাংসপিণ্ডও সরিয়ে ফেলবো। এরপর ছেড়ে দেয়া হবে তোমাকে। প্রস্তুত হলেই আমাদের কাছে ফিরে এসো।
টাক মাথার উপর আলতো করে হাত বুলালে ডেভিড।
‘এখন থেকে আর চুল কাটা লাগবে না। রেজার ব্লেড ব্যবহার করতে হবে না। ডেভিডের কথা শেষ হতেই তাড়াতাড়ি উল্টো দিকে ঘুরে তাকাল সার্জন। চলে গেল প্যাসেজ ধরে। ডেভিডকে রেখে গেল নিজের নতুন চেহারার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে।
ডেভিডের জন্য খুঁজে পেতে যে পোশাক আনা হলো তা হলো বেশ সস্তা আর ঢিলেঢালা। স্লাকস, খোলা গলার শার্ট, হালকা জ্যাকেট আর স্যান্ডেল। মাথা ঢাকার জন্যে কিছু একটা চাইল ডেভিড। খুলির এই নতুন গড়ন অন্তত যেন ঢেকে রাখা যায়। একজন নার্স কাপড়ের টুপি এনে দিল তাকে। এরপর জানাল হাসপাতাল সুপারিনটেন্ডেন্টের অ্যাপার্টমেন্টে একজন অপেক্ষা করছে ডেভিডের সাথে দেখা করার জন্য।
মিলিটারি প্রভোস্ট মার্শাল অফিস থেকে এসেছে একজন মেজর। হালকা পাতলা গড়ন, ধূসর চুল, ঠাণ্ডা ধূসর চোখ আর শক্ত কঠিন মুখাবয়ব। হ্যান্ড শেকের কোন প্রস্তাব না করেই নিজের পরিচয় দিল মেজর। এরপর সামনে রাখা ডেস্কে একটা ফাইল খুললো।
‘আমাকে অফিস থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন ইস্রায়েলী এয়ারফোর্সের তোমার কমিশনে পদত্যাগপত্র নিয়ে যাই। শুরু করল মেজর। হা করে তাকিয়ে রইল ডেভিড। গভীর যন্ত্রণাদায়ক জ্বরতপ্ত রাতগুলোতে মনে হলো আরেকবার ওড়ার সুযোগ পেলে হাতে স্বর্গ পাবে সে।
বুঝতে পারলাম না আমি। তোতলাতে লাগল ডেভিড। সিগারেটের জন্য হাত বাড়ালো। প্রথম দিয়াশলাই ভেঙে গেলে দ্বিতীয়টি দিয়ে তাড়াতাড়ি আগুন জ্বেলে নিল। আপনি আমার পদত্যাগপত্র চাইছেন কিন্তু যদি আমি দিতে অস্বীকৃতি জানাই?
‘তাহলে কোর্ট মার্শাল ডাক ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই আমাদের হাতে। অভিযোগ হবে শত্রু সম্মুখে উপরওয়ালার আইনাদেশ অমান্য করেছো তুমি।
‘তাই। ভারী মনে মাথা নাড়ল ডেভিড। সিগারেটে টান দিল। চোখে ঢুকে গেল ধোয়া।
মনে হচ্ছে আমার কোন অপশন নেই।
‘আমি প্রয়োজনীয় কাগজ তৈরি করে এনেছি। এখানে আর এখানে স্বাক্ষর দাও, সাক্ষী হিসেবে আমি স্বাক্ষর করব।
কাগজগুলোর উপর নিচু হয়ে স্বাক্ষর দিল ডেভিড। নীরব রুমে কলমের ঘসঘস শব্দই শোনাল জোরালো হয়ে।
‘ধন্যবাদ।’ কাগজগুলো তুলে নিজের ব্রিফকেসে গুছিয়ে রাখল মেজর। ডেভিডের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে দরজার দিকে হাঁটা ধরল।
‘তো এখন আমি অচ্ছুত। আস্তে করে বলে উঠল ডেভিড। থেমে গেল মেজর। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল দুজন দুজনের দিকে। এরপরই বদলে গেল মেজরের অভিব্যক্তি। ধূসর চোখ দুটো হয়ে উঠল হিংস্র।
‘তোমার কারণে দুটো যুদ্ধ প্লেন এমনভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে যে কিছুই করার নেই। অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে আমাদের। তোমার কারণে মৃত্যু হয়েছে ভ্রাতৃসম অফিসারের। তোমার কারণে একটা যুদ্ধ প্রায় শুরু হবার উপক্রম, যাতে মূল্য দিতে হবে আরো হাজারো তরুণের জীবন হয়তো আমাদের অস্তিত্বই নড়ে উঠবে। আমাদের আন্তর্জাতিক বন্ধুদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে তুমি। শক্তি দিয়েছো শত্রুর হাতে।’ থেমে গিয়ে লম্বা করে শ্বাস নিল মেজর। ‘আমার অফিস থেকে সুপারিশ করা হয়েছিল যেন তোমাকে ট্রায়ালে ফেলা হয় আর বিচার বিভাগ মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে যেন। কিন্তু শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ আর মেজর জেনারেল মোরদেসাই তোমাকে বাঁচিয়েছে এর হাত থেকে। আমার মনে হয় ভাগ্যকে দোষ না দিয়ে নিজেকে তোমার ভাগ্যবানই ভাবা উচিত।’
