এতক্ষণে চিৎকার শুরু করল সে। ঠোঁটবিহীন মুখে দেখা যাচ্ছে সব দাঁত। এই শব্দ কখনোই ভুলতে পারবে না উপস্থিত নারীর দল। চিৎকার করতে গিয়ে খুলে গেল চোখ। চোখের পাপড়ি, আই ব্রো আর পাতার বেশিরভাগ অংশই পুড়ে গেছে। ভেজা পুড়ে যাওয়া মাংসের মাঝে ঘন নীল হয়ে আছে চোখ জোড়া। চিৎকার করতে গিয়ে নাকের ফুটো থেকে রক্ত ঝরতে লাগল। যদিও নাক বলতে আর কিছুই নেই প্রায়। সারা শরীর কাঁপিয়ে ব্যথার পর ব্যথার ঢেউ আঘাত করতে লাগল তাকে।
নারীরা চেপে ধরে চেষ্টা করল তাকে শান্ত করতে। নখ দিয়ে মুখ আঁচড়াতে চাইল ডেভিড। সবাই মিলে থামাতে চেষ্টা করল।
কিব্বুইজ ডাক্তার এসে প্রেশার স্যুটের হাতা কেটে ফেলল। তখনো এক নাগাড়ে চিৎকার করে চলেছে ডেভিড। লাফাতে থাকা পেশীর উপর মরফিন ইনজেকশনের সুই ঢুকিয়ে দিল ডাক্তার।
.
প্লট থেকে রাডারের সর্বশেষ উজ্জ্বল ছবিটাকেও হারিয়ে যেতে দেখল ব্রিগ। শুনতে পেল তরুণ রাডার অফিসার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করল, কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। কমান্ড বাঙ্কারে নেমে এলো ভয়ঙ্কর এক নীরবতা।
সবাই মিলে দেখতে লাগল তাকে। প্লটের উপরে কুঁজো হয়ে দাঁড়াল ব্রিগ। পাশে ঝুলে আছে বিশাল হাত। শক্ত মুখে কোন আবেগ ফুটে উঠল না। কিন্তু চোখ দুটো জ্বলছে ধকধক করে।
মনে হলো মাথার উপরে এখনো ভাসছে দুই পাইলটের কথোপকথনের শব্দ, প্রচণ্ড যুদ্ধের মাঝে একে অন্যকে ডেকে চলেছে তারা।
কান্না আর ভয় মেশানো ডেভিডের গলা শুনতে পেয়েছে সবাই।
‘জো! না জো! ওহ্ ঈশ্বর না! সবাই জানে এর মানে কী। দু’জনকেই হারিয়েছে তারা। আর স্থানুবৎ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ব্রিগ ভাবছে কী থেকে কী হয়ে গেল।
যেই মুহূর্তে নিজের যোদ্ধাদের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সেই মুহূর্ত থেকে বুঝতে পেরেছে যে ঝড় ঘনিয়ে আসছে–আর এখন পুত্রহারা হয়ে গেছে। ইচ্ছে করল চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। অভিযোগ জানায় সবকিছুর বিরুদ্ধে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শক্ত করে চোখ বন্ধ করে রইল। খোলর পর দেখা গেল নিজের উপর আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে সে।
‘সাধারণ সতর্ক সংকেত।’ বলে উঠল ব্রিগ। “রেড” স্কেয়াড্রনের সব স্ট্যান্ডবাই জানে আন্তর্জাতিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে তারা। তারা যেখানে পড়েছে সে অংশের আকাশ কাভার করা হোক। হতে পারে পড়ে গেছে তারা। দুটি ফ্যান্টম ফ্লাইট নিয়ে ঢেকে ফেলো তাদেরকে। আমি চাই এই মুহূর্তে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে দেয়া হোক। সাথে প্যারাট্রুপার গার্ড আর মেডিকেল টিম
সাধারণ সংকেত জারি করায় তৎপর হয়ে উঠল কমান্ড বাঙ্কার।
‘প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলব আমি। অনেক রকমের ব্যাখ্যা দিতে হবে তাকে। মূল্যবান কয়েকটা সেকেন্ড ব্যয় করল ডেভিড মরগ্যানের উপর গালিবর্ষণ করে।
***
ডেভিডের ক্ষত আর পুড়ে যাওয়া মাথার দিকে তাকিয়ে এয়ারফোর্সের ডাক্তার বলে উঠল, ‘একে বাঁচাতে পারলে নিজেদেরকে ভাগ্যবানই বলতে হবে।’
হালকা করে ভ্যাসলিনের ব্যান্ডেজ করে দিল ডাক্তার ডেভিডের মাথায়। বাগানে অপেক্ষারত বেল ২০৫ হেলিকপ্টারের স্ট্রেচারের উপর তাড়াতাড়ি উঠানো হলো কম্বল মোড়া শরীর।
হাদ্দামা হাসপাতালের নিচে হেলিপ্যাডে নামল হেলিকপ্টার। একটা মেডিকেল দল প্রস্তুত হয়েই আছে। হাসপাতালের তৃতীয় তলার বিশেষ বার্ণ ইউনিটে ঢুকলো ডেভিড। সেচ নালায় মিরেজ ভেঙ্গে পড়ার এক ঘণ্টা তিপ্পান্ন মিনিট পর। শান্ত, গোছানো একটি পৃথিবী যেখানে সবাই মাক্স পরে আছে। গায়ে লম্বা সবুজ বোব। বাইরের পৃথিবীর দেখা পাওয়া যাবে একমাত্র কাঁচের জানালা দিয়ে। এমনকি নিঃশ্বাস নেবার বাতাসটুকুও পরিষ্কার করা হয়েছে।
হালকা মরফিনের কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে ডেভিডের চেতনা। তার উপর ঝুঁকে কাজ করতে থাকা মুখোশ পরিহিত মুখগুলোর গলার শব্দ তাই কিছুই বুঝতে পারল না সে।
‘পুরো অঞ্চলের উপর তিন ডিগ্রি
‘এটা স্থির না হওয়া পর্যন্ত পরিষ্কার করার বা ছোঁয়ার কোন চেষ্টাই করা যাবে না সিস্টার। আমি ইপিগার্ড স্প্রে করে দিচ্ছি। এছাড়া চার ঘন্টা পর পর ইন্ট্রী মাসকুলার টেটরাসাইক্লিন দেবব আমরা–যাতে ইনফেশন না হয়।’
‘দুই সপ্তাহ কাটলে তবেই আমরা ছুঁতে পারব।’
‘ঠিক আছে ডাক্তার।
‘ওহ, আরেকটা কথা সিস্টার। প্রতি ছয় ঘণ্টায় ১৫ মিলিগ্রাম মরফিন। একে নিয়ে অনেক ব্যথা সহ্য করতে হবে।’
এই ব্যথার বোধ মনে হলো কখনো শেষ-ই হবে না। সীমাহীন সমুদ্রে ব্যথার ঢেউ একটু পরপর ধাক্কা মারছে ডেভিডের হৃদয়ের বালুতটে। অনেক সময় এমন মনে হয় যে ব্যথার চোটে বুদ্ধি-বিবেচনা সব লোপ পেয়ে যায়। মাঝে মাঝে আবার এমন সময় আসে যখন কিছুটা কম থাকে ব্যথার বোধ। মনে হয় যেন ভাসতে ভাসতে মরফিনের কুয়াশার চাদরে হারিয়ে যায় সে। এরপরই আবার মনে হয় কুয়াশার চাদর ভেদ করে মাথার উপর চলে পড়ে সূর্যের তেজ। চিৎকার করে ওঠে ডেভিড। মাথা মনে হয় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
এরপরই হঠাৎ করে মাংসের মাঝে ঢুকে যায় সুইয়ের মাখা। কুয়াশা এসে ঘুমের দেশে নিয়ে যায় তাকে।
‘এর দিকে তাকাতে পারি না আমি। কালচার নিয়েছি আমরা সিস্টার?”
হ্যাঁ ডাক্তার।
‘কেমন মনে হচ্ছে?
আমার ভয় হচ্ছে জীবাণু বেড়ে যাচ্ছে।
‘হ্যাঁ আমারো তাই মনে হয়। আমার মনে হয় ক্লোক্সাসিলিনে ফেরা উচিৎ-দেখা যাক ভাল কোন ফলাফল পাওয়া যায় কিনা।
