‘শোন ও ইস্রায়েল, প্রভু আমাদের ঈশ্বর, প্রভু একমাত্র।
জোরে জোরে চিৎকার করে প্রার্থনা শুরু করল ডেভিড। আস্তে আস্তে ভেঙ্গে পড়া কাঁচের ঢাকনিতে আঘাত করতে করতে মনে হলো মৃত্যু চুঁইয়ে পড়ছে চোখ মুখ বেয়ে। হাত দিয়ে কাঁচের ফাটলকে চেষ্টা করল আরো বড় করতে। হাত কেটে রক্ত পড়তে লাগল।
‘পূজিত হোক তার নাম, যার রাজতু চিরকালের
বেশ বড় হলো মুখটা। সিট থেকে উঠতে চাইল। দেখা গেল অক্সিজেন আর রেডিও লাইন জড়িয়ে গেছে হেলমেটের সাথে। অথর্ব বাম হাত দিয়ে কিছু করতেও পারছে না সে। তাকিয়ে দেখল স্যুটের হাতা ছিঁড়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে বাঁকা হয়ে ঝুলছে বিবশ পেশী। অথচ কোন রকম ব্যথাও বোধ করল না সে।
‘তোমার প্রভু। তোমার ঈশ্বরকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসো=
ফিসফিস করল ডেভিড, ডান দিয়ে চেষ্টা করে চিবুকের স্ট্র্যাপ খুলে হেলমেট খুলে ফেলল মাটিতে। চুল বেয়ে কানের পেছন দিয়ে ঘাড়ে পড়ছে ফুয়েল। মনে পড়লো নরকের আগুনের কথা।
ব্যথায় জর্জরিত হয়ে ক্যানোপির ভাঙা অংশ দিয়ে বের হয়ে আসল ডেভিড। আর এখন এমনকি প্রার্থনার শক্তিও পারল না বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা ভয় তাড়াতে।
ঈশ্বরের রোষানলে পড়বে তুমি
পিচ্ছিল ধাতুর গা বেয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল পাখার দিকে। পড়ে গেল মাটিতে। মাটিতে মুখ দিয়ে শুয়ে রইল বহুক্ষণ। আতঙ্ক আর পরিশ্রমে নিঃশেষ হয়ে গেছে।
‘ঈশ্বরের আদেশ স্মরণ করো।’
‘ধূলিমাখা মাটির উপর মুখ দিয়ে শুয়ে থাকার সময় শুনতে পেল মানুষের কণ্ঠস্বর। অতি কষ্টে মাথা তুলে দেখতে পেল খোলা মাঠ দিয়ে দৌড়ে আসছে নারীদের দল। শব্দগুলো বুঝতে পারল হিব্রু। জেনে গেল ঘরে পৌঁছে গেছে সে।
মিরেজের ভাঙা শরীরের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে চাইল ডেভিড। ভাঙা হাত ঝুলছে পাশে। চেষ্টা করল চিৎকার করে তাদেকে থামাতে।
পিছনে যাও! সাবধান! কিন্তু গলা দিয়ে ফ্যাসফাসে আওয়াজ ছাড়া আর কোন স্বর ফুটলো না। সবাই দৌড়ে আসতে লাগল তার দিকে। শুকনো বাদামী মাটির উপর রং-বেরঙের উড়ন্ত অ্যাপ্রন আর পোশাক দেখে মনে হলো আলোর ফুলকি নাচছে।
ঘষটে ঘষটে এয়ারক্রাফটের সামনে থেকে সরেমহিলাদের কাছে যাবার চেষ্টা করতে লাগল ডেভিড।
‘পিছনে যাও!’ ব্যাঙের মতো আওয়াজ বের হয়ে এলো গলা চিরে। জি স্যুট মনে হলো হাত-পা টেনে ধরেছে আর চুলে আর মুখের নিচে হিম শীতল ফুয়েল।
জেট কমপ্রেসরের সাদা-গরম শেলের কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠল মিরেজের হাল।
ভয়ঙ্কর গর্জন করে ঘন লাল রঙের ধোঁয়া ছড়িয়ে বিস্ফোরিত হলো মিরেজ। বাতাস বাইরের দিকে ধেয়ে নিয়ে গেল ধোয়া। জ্বলন্ত আগুনের মাঝে এগোতে চেষ্টা করল ডেভিড।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে রইল সে যদি এমনটা না করতো তাহলে ফুসফুস ফুটো করে দিত ধোঁয়া। চোখ বন্ধ করে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে লাগল ডেভিড। শরীরে ফায়ারপ্রুপ প্রেশার স্যুট পরা। বুট আর গ্লাভও আছে–কিন্তু মাথা উন্মুক্ত আর ফুয়েলে ভিজে আছে।
দৌড়ানোর সময় মাথা জ্বলতে লাগল মশালের মতো। কুঁচকে গেল সব চুল। গন্ধের সাথে সাথে ধোয়া ছড়িয়ে মাথার চামড়া, মুখ আর ঘাড় হয়ে পড়লো উন্মুক্ত। আগুনের শিখায় পুড়ে গেল কান আর নাকের বেশির ভাগ অংশ। চামড়ায় পড়ল অসংখ্য ফোঁসকা। তারপরই দেখা গেল ফোঁসকা গলে তাজা মাংস। পুড়ে গেল ঠোঁট, দাঁত বের হয়ে গেল। চোয়ালের হাড় দেখা গেল। চোখের পাতা পুড়ে গেল। গাল থেকে মাংস পুড়ে খসে পড়তে লাগল।
জ্বলন্ত বাতাস আর ধোঁয়ার মাঝে পড়ে গেল ডেভিড। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো যে এতটা ব্যথাও সহ্য করা যায়। চিন্তা-চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে এলো। কিন্তু জানে যে চিৎকার করা চলবে না। চোখ বন্ধ করে রইল শক্তভাবে। কানের উপর মনে হলো ড্রাম বাজাতে লাগল বাতাস। চামড়া পুড়ে নরকের কথা মনে এলো তার। কিন্তু জানে যে এই ভয়ঙ্কর আগুন শরীর ছুঁতে দেয়া যাবে না। তাই চিৎকার না করেই এগিয়ে চলল সে।
ফল বাগান থেকে দৌড়ে আসা নারীরা এসে পড়ে। ওরা দেখল সামনে ধোয়ার দেয়াল, এয়ারক্রাফটের শরীর পুড়ে যাচ্ছে আর এই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে দৌড়ে আসতে চাইছে পাইলট!
তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে উত্তাপ আর ঘন ধোয়ার দেয়াল। বাধ্য হলো তারা পিছু হটতে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল লেলিহান শিখা।
হঠাৎ করেই বাতাসের একটা ঝাপটা এসে ধোয়ার তেলতেলে পর্দাটা দিল সরিয়ে। এর ভেতর থেকে বের হয়ে এলো পুড়ে যাওয়া ধোঁয়াওয়ালা মাথা নিয়ে ডেভিড!
অন্ধের মতো বের হয়ে এলো ধোঁয়ার দেয়াল ভেদ করে। একটা হাত ঝুলছে নরম মাটির উপর। পা ঘষে প্রায় হামাগুড়ির মতো ভঙ্গি করে এগিয়ে আসছে মানব দেহ। ভয় পেয়ে জমে গেল নারীর দল।
এরপরই সাহস সঞ্চয় করে বাদামী দেহত্বকের মাথা ভর্তি চুল নিয়ে চিৎকার করে সামনে এগিয়ে ডেভিডের কাছে এলো একটি মেয়ে।
দৌড়াতে গিয়েই নিজের মোটা উলের স্কার্ট খুলে ফেলল। শক্তিশালী বাদামী পা হয়ে পড়লো উলঙ্গ। ডেভিডের কাছে পৌঁছে মাথায় পেঁচিয়ে দিল স্কার্ট। মাংস কামড়ে থাকা শিখাগুলো নিভে গেল। অন্য নারীরাও এগিয়ে এসে নিজেদের কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলল ডেভিডকে। মাটিতে শুয়ে পড়ল ডেভিড।
