ব্যথার মাঝেই নতুন এক ধরনের গন্ধ পেল ডেভিড। অনেক আগে মারা যাওয়া কোন কিছুর গন্ধ, নোংরা কম্বলে পোকার গন্ধ, বমি আর বিষ্টার গন্ধ। আর ভেজা আবর্জনার গন্ধ। অবশেষে পেল নিজের মাংস পচার গন্ধ। ব্যাকটেরিয়া এসে আক্রমণ করেছে উক্ত টিস্যুকে।
ঔষধ দিয়ে ব্যাকটেরিয়ার সাথে যুদ্ধে নামল ডাক্তারের দল। ইনফেকশনের ফলে জ্বর আসায় কমে গেল ব্যথা। পোড়ার অংশে দগদগে ঘাকে কোন তরলই শুকাতে পারছে না।
জ্বরের সাথে এলো দুঃস্বপ্ন। কল্পনার রাজ্যে বহু দূরে ভেসে যেতে লাগল ডেভিড।
‘জো’ আক্ষেপে চিৎকার করে উঠে ডেভিড। সূর্যের দিকে এগিয়ে যাও, জো। বাম দিকে ব্রেক কষে যাও! যাও!’ এরপরই কেঁদে ওঠে, ভাঙা গলায় বলে ওঠে, “ওহ, জো! ওহ, ঈশ্বর? না! জো।
রাতে ডিউটিরত সিস্টার সহ্য করতে পারে না। এগিয়ে আসে সিরিঞ্জ নিয়ে। চিৎকার পরিণত হয় বিড়বিড়ানিতে, এরপর আস্তে আস্তে গুঙ্গিয়ে উঠে ওষুধের ঝাঁঝে ঘুমিয়ে পড়ে ডেভিড।
‘এখন ড্রেসিং শুরু করব আমরা সিস্টার।
প্রতি আটচল্লিশ ঘণ্টায় ড্রেসিং করার সময় পুরো মাথায় জেনারেল অ্যানেসথেশিয়া দেয়া হতো। কাঁচা মাংস, বাচ্চাদের ড্রইংয়ের মতো টাক মাখা। চুল নেই, কান নেই, নিষ্ঠুর সব আঁক টানা।
‘ক্লোক্সাসিলিন মনে হয় কাজ করছে। আগের তুলনায় বেশ ভালো দেখাচ্ছে। তাই না সিস্টার?
চোখের পাতার নগ্ন চামড়া নতুন করে ভরতে শুরু করেছে। গোলাপি গোলাপের মতো পাঁপড়ি বের হয়েছে। চোখের কোটরে হলুদ মলম লাগিয়ে আরাম দেয়ার ব্যবস্থা করেছে ডাক্তারেরা। মাথার ইনফেকশন যাতে চোখে না ছড়িয়ে পড়ে সেটাও একটা কারণ। মলমের কারণে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেছে।
‘আমার মনে হয় এখন আমরা পেটের ব্যাপারে কিছু একটা করতে পারি। বিকেলে থিয়েটার তৈরি করে রাখবেন প্লিজ, সিস্টার?
এখন ছুরি চালানোর সময় হয়েছে। ডেভিড শিখতে চলেছে যে ভয়ঙ্কর পাপের মাঝে ছুরি আর ব্যথা একত্রে বাস করে। পেট থেকে বড়সড় এক টুকরো চামড়া তুলে নিল ডাক্তারেরা। মোটাসোটা সসেজের মতো করে রোল করে নিল। এরপর ভালো হাত বেঁধে ফেলল। এরপর সসেজের এক অংশ হাতের এক অংশে লাগিয়ে রক্ত চলাচলের ব্যবস্থা করল। এরপর থিয়েটার থেকে নিয়ে আসা হলো তাকে।
যাক বাবা, দুটো চোখই বাঁচাতে পেরেছি আমরা।’ গর্বিত স্বরে ঘোষণা করল একটি কণ্ঠ।
প্রথম বারের মতো চোখ মেলে তাদেরকে দেখতে পেল ডেভিড। তার চারপাশে এসে জড়ো হয়েছে সবাই। সবার মাথা, নাক আর মুখে সার্জিক্যাল মাস্ক। কিন্তু মলমের কারণে এখনো ঝাপসা হয়ে আছে দৃষ্টি।
‘এখন চোখের পাতার ব্যবস্থা করতে হবে।’
আবারো সক্রিয় হলো ছুরি। চোখের পাতা কেটে-ছেটে, সেলাই করে, ছুরি আর ব্যথা কাজ করে চলল একত্রে। চামড়ার একেবারে গভীর থেকে বোধ করল যন্ত্রণাবোধ।
‘খুব সুন্দর হয়েছে, সত্যিই ইনফেকশনকে খুব সুন্দর ভাবে ঢেকে দিয়েছি। আমরা। এখন আমরা শুরু করতে পারব।’
মাথার উপরে এখন একটা চকচকে ভেজা ভাব তৈরি হয়েছে। নতুন টিস্যু গজানোতে রং হয়েছে উজ্জ্বল লাল, ককটেল চেরীর মতো। কানের জায়গায় কুঁচকানো চামড়া। দাঁতের সারি উজ্জ্বল সাদা। শুধুমাত্র ঠোঁট দুটো নেই। চোয়ালের জায়গায় সাদা হাড়ের ব্লেড। নাকের জায়গায় শট গানের মতো নাকের ফুটো। শুধুমাত্র চোখ দুটো এখনো আগের মতো উজ্জ্বল–ঘন নীল আর সাদা। লাল চোখের পাতার উপর পরিষ্কার কালো সেলাই।
‘ঘাড়ের পেছনে কাজ শুরু করব আমরা। এই কারণে সন্ধ্যায় থিয়েটার তৈরি রাখবেন সিস্টার।
ছুরির মাঝেও কত রকম বৈচিত্র্য আছে। থাই থেকে সমান করে চামড়া কেটে নেয়া হলো। এরপর এগুলো বিছিয়ে দেয়া হলো উন্মুক্ত মাংসের উপর। এরপর ভালোভাবে মাংসের উপর। এরপর ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হলো ব্যথাতুর ডেভিডের প্রতিটি পদক্ষেপ।
‘এটা দেখে ভালো মনে হচ্ছে না। আমার মনে হয় আমাদের আবার চেষ্টা করতে হবে।’
থাই-তে নতুন করে চামড়া গজানো শুরু হতেই গোড়ালি থেকে নতুন করে চামড়া কেটে নেয়া হলো। প্রতিটি জায়গা হয়ে উঠল নতুন করে ব্যথার উৎস।
চমৎকার! একেবারে খাপে খাপে মিশে গেছে এবারে।
ধীরে ধীরে ঘাড়ের উপর, মাথার উপর চামড়া বসে গেল।
এবার আমরা হাত খুলবো।’
সন্ধ্যার থিয়েটারে, স্যার?
‘হা, প্লিজ তৈরি রাখবেন সিস্টার।
ডেভিড পরবর্তীতে জানতে পারে যে প্রতি বৃহস্পতিবার বার্ন ইউনিটের অপারেশন থিয়েটারে কাজ অপারেশন করা হয়। তাই প্রতি বৃহস্পতিবারে আতঙ্ক নিয়ে দেখে যে বিছানার চারপাশে জড়ো হয় ডাক্তার দল। এমন ভাবে পুনরায় চামড়া প্রতিস্থাপন নিয়ে কথা বলতে থাকে যে শিউরে ওঠে ডেভিড।
পেট থেকে মোটা সসেজটাকে মুক্ত করল তারা। হাত থেকে সরানোর পর দেখা গেল সাদা লেসের মতো নিজের জীবন শুরু করেছে যেন রক্ত পেয়ে।
হাত তুলে বুকের সাথে বেঁধে দেয়া হলো। আরো একটু চামড়া কেটে চোয়াল আর নাকে লাগানো হলো।
‘খুব সুন্দর হয়েছে কাজটা। আজ সন্ধ্যায় একে ঘষামাজা করা হবে। থিয়েটার লিস্টে সবার আগে যাবে তার নাম। এদিকে খেয়াল রাখবেন সিস্টার।
পেট থেকে কাটা মাংস নিয়ে নাক, সরু ঠোঁট আর চোয়ালের হাড়ের জন্য নতুন কাভার তৈরি করা হলো।
‘ফোলা ভাবটা মিশে গেছে। আজ সন্ধ্যায় চোয়ালের হাড় সমান করা হবে।’
