বুঝতে পারল দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। যতবার চোখ দিচ্ছে বাইরে দেখতে পাচ্ছে মাটি আরো কাছে চলে এসেছে।
মাটির খুব কাছাকাছি এসে মনে হলো মিরেজ তার কথা শুনল। জয়স্ট্রিক আর রাডার একসাথে হয়ে উত্তর দিল। আস্তে করে সোজা হলো মিরেজ। ছুটতে লাগল সামনের দিকে। মিসাইলের আঘাতে অসুস্থ হয়ে গেছে বেচারা মিরেজ। ডেভিড অনুভব করল ইঞ্জিনের যন্ত্রণাকাতর ঘড়ঘড়ানি শব্দ। বুঝতে পারল কমপ্রেসর গেছে। হয়তো আর মিনিটখানেক বা সেকেন্ডের মাঝেই টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। উপরে চেষ্টা করেও লাভ নেই আর।
তাড়াতাড়ি নিজের চারপাশে তাকাল ডেভিড। এমনভাবে দুলতে থাকতে আকাশের কোথায় গিয়ে পড়বে ভয় পেল সে। মাটির থেকে মাত্র দুইশ থেকে তিনশ ফুট উপরে আছে। নিজের পতনের দিক সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই তার। কিন্তু নিজের উপলার কম্পাস চেক করে খানিকটা বিস্মিতই হলো; ঘরের দিকেই উড়ে যাচ্ছে।
ইঞ্জিনের কাপন গেল বেড়ে। ধাতুর ঘর্ষণও শুনতে পাচ্ছে সে। মনে হয় না ঘর পর্যন্ত টিকতে পারবে। আর ক্যানোপিকে ঠিকঠাক করার মতো যথেষ্ট উচ্চতাও নেই। তাই স্ট্র্যাপ খুলে ককপিট থেকে বের হবার সম্ভাবনাও নেই। মাত্র একটা কোর্স বাকি আছে। মিরেজকে তাই চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে ভেতরের দিকে।
সিদ্ধান্ত নেয়ার সাথে সাথে সুস্থ হাত লেগে গেল কাজে। হাঁটুর মাঝে ধরল জয়স্ট্রিক। ল্যান্ডিং গিয়ার নামিয়ে দিল।
সামনের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল পাথুরে ভূমি আর তারপর সবুজ ক্ষেত। সেখানেই শুয়ে আছে তার সমাপ্তি কিন্তু তার আরেকটু পরেই দেখা যাচ্ছে খোলা মাঠ, ফসলি জমি, ফলের বাগান, দালানের সারি–তার মানে, খুশি হয়ে উঠল ডেভিডের মন, ইস্রায়েলের সীমান্তে পৌঁছে গেছে সে।
ভাঙা পাথরের কিনারা দিয়ে উড়ে গেল ডেভিড। গ্রানাটের হাঁ করা মুখের উপর থেকে অল্পের জন্যে বেঁচে গেল। সামনে পড়ে আছে ক্ষেত। স্পষ্ট দেখা গেল ফল বাগানে কাজ করছে মহিলারা। থেমে তাকিয়ে রইল তার দিকে। এত কাছ থেকে দেখল ডেভিড যে পরিষ্কার পড়তে পারল তাদের মুখের বিস্মিত ভাব।
নীল ট্রাক্টরের উপর বসে আছে একজন পুরুষ। সিট থেকে লাফ দিয়ে মাটির উপর পড়ে গেল লোকটা। মাথার সামান্য ফুটখানেক উপর দিয়ে উড়ে গেল ডেভিড।
ফুয়েল ট্যাঙ্কের চাবি বন্ধ, সমস্ত সুইচ বন্ধ, মাস্টার সুইচ বন্ধ–ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করতে চলেছে ডেভিড।
সামনে দিগন্ত বিস্তৃত মসৃণ বাদামী ক্ষেত। ভাগ্যই বলতে হবে শেষ হয়ে এসেছে তার যাত্রা।
গতি কমে আসছে মিরেজের। নাক নিচু হয়ে এসেছে নিচের দিকে। এয়ারস্পিডের কাঁটা উলটো দিকে ঘুরছে। ঘণ্টায় ২০০ মাইল, ১৯০, ১৮০, ১৫০-এর ঘরে এসে কাঁপতে লাগল।
হঠাৎ করেই সামনের ভূমিতে দেখা গেল কংক্রিটের সেচের যন্ত্রাংশ। বিশ ফুট চওড়া, দশ ফুট গভীর–একটা সেঞ্চুরিয়ান ট্যাংক ধ্বংস করার জন্যে যথেষ্ট।
খোলা মুখ এড়িয়ে যাবার কোন পদ্ধতিই জানা নেই তার। নিচে নামল মিরেজ। এতটাই সাবধানে যে, মনে মনে ভাবল বার্নি নিজেও গর্ববোধ করবে আমাকে এভাবে দেখলে।’ ভূমি কর্কশ হলেও ঠিকঠাকভাবে এগোতে লাগল মিরেজ। ককপিটে বসে ভয়ঙ্করভাবে কাঁপছে ডেভিড। তারপরেও এখনো তিন চাকার উপর দাঁড়িয়ে আছে প্লেন। সেচের নালার দিকে এগোবার সময় দেখা গেল ছোটার গতি ঘণ্টায় ৯০ মাইল। নালার মাঝে লেগে ভেঙ্গে গেল প্লেনের অংশ। নাক ডুবিয়ে দিল মিরেজ। ফিউজিলাজ সরসর করে এগিয়ে গেল মাঠের উপর। ভেতরে ডেভিড এখনো স্ট্র্যাপ দিয়ে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে। পাখা ভেঙ্গে নরম মাটির উপর খানিকটা ঘষটে গিয়ে অবশেষে স্থির হলো মিরেজ।
ডেভিডের বাম পাশ পুরো অবশ হয়ে আছে। হাত বা পায়ে কোন বোধ নেই। কঠিনভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছে স্ট্র্যাপ। হঠাৎ নেমে আসা নীরবতার স্থানুর মতো বসে রইল সে।
বেশ কিছু সেকেন্ড পার হলো এভাবে। নড়াচড়া বা চিন্তা করার শক্তিটুকুও মনে হলো নেই আর। এরপরই গন্ধ পেল নাকে। ট্যাংক আর লাইনের জেট ফুয়েলের গন্ধ। আগুনে পুড়ে যাবার ভয় জেঁকে ধরল তাকে।
ডান হাত দিয়ে চেপে ধরল ক্যানোপি রিলিজ লিভার। টানাটানি করে চেষ্টা করল খুলে ফেলতে। কিন্তু মূল্যবান দশটি সেকেন্ড নষ্ট হলো কেবল। পুরো জমে গেছে লিভার। এরপর লিভারের নিচে থাকা স্টিলের ক্যানোপি ব্রেকারে চোখ পড়ল। এই যন্ত্রটি এ জাতীয় কোন বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। টেনে ধরল ডেভিড। কাজ হলো না। মাথার উপরের গম্বুজ আঘাত করল। টের পেল জেট ফুয়েলের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে ককপিটের বাতাস।
বাম হাতে কোন কাজই করতে পারছে না সে। এদিকে স্ট্রাপ গুলোও শক্ত করে আটকে রেখেছে সিটের সাথে।
আবারো শুরু করল চেষ্টা। মাথার উপরের কাঁচের ঢাকনিতে হাত সমান ফুটো করতে পারল অবশেষে। চাইল আরেকটু বড় করা যায় কিনা। এমন সময় চিড় ধরা ফিউজিলাজের কোন অংশ থেকে ফিনকি দিয়ে আকাশে উঠে পড়ল ফুয়েল। ঝরে পড়তে লাগল বৃষ্টির মতো। ক্যানোপির উপরে বাগানের ফোয়ারার মতো ভারী হয়ে পড়তে লাগল। ডেভিডের তৈরি করা ফুটো প্রায় বন্ধ হবার উপক্রম। ফুয়েল গড়িয়ে পড়তে লাগল চোখে মুখে, গাল বেয়ে। কাঁধ থেকে গড়িয়ে প্রেশার স্যুটের ভেতরেও পড়ল ফুয়েল। প্রার্থনা করতে লাগল ডেভিড। জীবনে প্রথমবারের মতো শব্দগুলো অর্থবহ হয়ে উঠল তার কাছে। বুঝতে পারল ভয় কমে আসছে প্রার্থনার শক্তিতে।
