‘লেজে আলো জ্বালিয়ে এটার জন্য অপেক্ষা করো!’ বলে উঠল জো। তাকিয়ে দেখতে লাগল পূর্ণ গতিতে ডেভিডের মিরেজের দিকে ধেয়ে আসছে মিসাইল।
‘ডানে ব্রেক চাপো। যাও! যাও! গো! জোর গর্জন শুনেই মোড় নিল ডেভিড। আবারো অল্পের জন্যে মিস করল মিসাইল। কিন্তু এবার আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। ঘুরে আবার ডেভিডের পিছু নিল।
‘ও এখনো তোমার পেছনে লেগে আছে। চিৎকার করে উঠল জো। সূর্যের দিকে উঠে যাও ডেভি। চেষ্টা করো। মিরেজ সাথে সাথে নাক উঁচু করে কালো মেঘের উপর জ্বলতে থাকা নক্ষত্রপানে ছুটে চলল। সার্পেন্ট সাথে সাথে উপরে উঠে অন্ধের মতো অনুসরণ করে চলল।
‘ও এখনো পিছু ছাড়েনি ডেভি। যাও! যাও! গো।’
হঠাৎ করেই ধুপ করে নিচের দিকে পড়তে শুরু করল মিরেজ। সার্পেন্ট ও সামনে সূর্য থেকে আসা ইনফ্রারেডের দিকে ধেয়ে চলল। আবারো বেঁচে গেল ডেভিড।
‘তুমি এটাকে হারিয়ে দিয়েছে। বাইরে যাও, ডেভি! বাইরে যাও। আকুতি জানাতে লাগল জো। কিন্তু অসহায় হয়ে পড়েছে মিরেজ। প্রাণভয়ে সূর্যের দিকে উঠে যাওয়ায় সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে অলস ভাবে পড়ে যাচ্ছে। এখন নিচের দিকে। এদিকে জো দেখতে পেল তৃতীয় মিসাইলটাকে। ধোঁয়ার পাখা ছড়িয়ে এগিয়ে আসছে ডেভিডের মিরেজের দিকে।
জো নিজেও ঠিকভাবে জানে না যে সে কী করতে চলেছে। শুধুমাত্র পুরো শক্তি নিয়ে নিচের দিকে ডাইভ দিল প্লেন নিয়ে। শব্দের চেয়েও দ্বিগুণ গতি নিয়ে ডেভিডের লেজের সমান্তরাল চলে এলো জো। চাইল আড়াআড়ি ভাবে থেকে সার্পেটের নাক ভোঁতা করে দিতে।
নিজের ছোট্ট গোলাকার রাডার চোখ দিয়ে জোকে দেখতে পেল সার্পেন্ট। টের পেল এর থেকে বের হওয়া তাপ ডেভিডের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় মনে হলো এটি। বিকল্প টার্গেট ধরে নিয়ে ডেভিডের পিছু নেয়া বাদ দিয়ে জোর দিকে ঘুরে গেল মিসাইল।
জোর এয়ারক্রাফটের পাখা সরে যেতে দেখল ডেভিড। একটু পরেই দেখল সার্পেন্টও তার পিছু নিল। এক সেকেন্ড লাগল বুঝতে যে ইচ্ছে করেই মিসাইলের গতি ঘুরিয়ে নিয়েছে জো, কেননা ডেভিডের বাঁচার কোন সম্ভাবনাই থাকতো না নইলে।
আতঙ্কিত হয়ে ডেভিড দেখল নিজের গতি বাড়িয়ে সূর্যের দিকে ছুটলো জো। মসৃণভাবে তার পিছু নিল মিসাইলটাও। নিজের আয়নায় পিছনের মিসাইলটাকে দেখল জো। কিন্তু মনে হলো ছলনার আশ্রয় নিয়েও লাভ হয়নি। ডেভিডের মতো অসহায় বোধ করল জো নিজেও। মিসাইল খুঁজে পেয়েছে তাকে আর ধোয়ার পুচ্ছ ছড়িয়ে এগিয়ে আসছে। জো আর তার মিরেজ একসাথে চলে গেল না ফেরার দেশে।
একা উড়ে চলল ডেভিড। ভয়, দুঃখ আর আতঙ্কে গলা শুকিয়ে কাঠ। জোরে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। জো, না জো। ওই ঈশ্বর না! তুমি এটা করতে পারো না।
সামনে মেঘের ফাঁকে দেখা গেল জর্দানের ভূমি।
‘ঘরে ফেরার কথা ছিল তোমার জো। তোমার। গলার মাঝে দলা পাকিয়ে উঠল কান্না।
কিন্তু বেঁচে থাকার আদিম বোধের কল্যাণে তাকিয়ে দেখতে পেল শেষ মিসাইলের আগমন। অনেক দূরে ছোট্ট কালো একটা বিন্দু। ঘন ধোয়ার লেজ। কিন্তু রাক্ষসের মতো তাকিয়ে দেখছে ডেভিডকে ছোট্ট চোখ দিয়ে।
দেখা মাত্র ডেভিড বুঝতে পারল যে এর হাতেই লেখা রয়েছে তার নিয়তি। এতক্ষণ পর্যন্ত এত কিছু ঘটার পরে স্নায়ু অবশ হয়ে আসতে চাইল। তার পরে শেষ চেষ্টা করল সে।
চোখ ভেঙ্গে আসতে চাইছে। পুরো মাস্ক ভিজে গেছে ঘামের ফোঁটায়। বাম হাতে থ্রটল খুলে দিল পুরোপুরি। ডান হাতে চেপে ধরল কন্ট্রোল কলাম। হতাশা নিয়ে ভাবতে লাগল নিজের কথা।
মিসাইল প্রায় তার ঘাড়ের উপরে পৌঁছে গেছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠল সে। চাইল মিরেজকে ঘুরাতে কিন্তু সেকেন্ডের জন্য ভুল হয়ে গেল। মোড় নেয়ার সময় তার পাশ দিয়ে গেল মিসাইল। নিজের ফিউজিং ডিভাইসের ফটো ইলেকট্রিক চোখ দিয়ে দেখে ফেলল মিরেজের ছায়া। বিস্ফোরিত হলো মিসাইল।
বিস্ফোরণের ঠিক মাঝখানে পড়ল ককপিট ক্যানোপি। শক ওয়েঙের ধাক্কায় কাঁপতে লাগল প্লেন। ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল মিরেজ।
ক্যানোপির চারপাশে পড়তে লাগল উড়ন্ত স্টিলের অংশ। ডেভিডের সিটে। ধাক্কা দিল একটা অংশ। বাম হাতে কনুইয়ের উপর আঘাত করল এটি। নিখুঁতভাবে কেটে গেল হাড়। ভারসাম্যহীনভাবে ঝুলতে লাগল হাতটা।
ভাঙা ক্যানোপিটার মাঝে ঢুকে গেল হিম শীতল বাতাস। আত্মহত্যা করার ভঙ্গিতে গোত্তা খেতে খেতে নামতে লাগল প্লেন পূর্ণ গতিতে। সিট বেল্ট থেকে ছিটকে পড়ল ডেভিড। পাঁজর ভেঙ্গে গেল। কাঁধের চামড়া ছিঁড়ে গেল।
চেষ্টা করল সিটের উপর ধরে রাখতে নিজেকে। ইজেক্টর মেকানিজমের হ্যান্ডেল ধরে রইল সুস্থ হাতে। ভাবল সিটের নিচে চার্জ বিস্ফোরিত হয়ে মিরেজ থেকে মুক্তি মিলবে তার। কিন্তু কিছুই ঘটল না।
তাড়াতাড়ি হ্যান্ডেল ছেড়ে সামনে ঝুঁকে সেকেন্ডারি ফায়ারিং মেকানিজম ধরতে চাইল তার সিটের নিচে দুপায়ের ফাঁকে। কিন্তু হতাশ হয়ে দেখল কোন কাজই করছে না এটি। সিট কাজ করছে না। বিস্ফোরণের ফলে এর গুরুতৃপূর্ণ কোন অংশের ক্ষতি হয়েছে। এক হাতে এভাবেই মিরেজ চালাতে হবে তাকে। আর খুব বেশি উচ্চতাও বাকি নেই। জয়স্টিকের উপর ডান হাতের মুঠি রাখল। আর পাগলের মতো হচড়পাঁচড় করে চেষ্টা করল কন্ট্রোলের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে। সহজাত অভ্যাসবশে এখনো উড়ে চলেছে সে। নইলে চোখের সামনে ঝুলছে আকাশ আর পৃথিবী একসাথে।
