‘আমরা তাদেরকে আঘাত করব। সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল ডেভিড। কমান্ড নেট বন্ধ করে জোর সাথে কথা বলল।
‘টু’ লিডার আক্রমণ করছি।
‘নেগেটিভ। আমি আবারো বলছি নেগেটিভ!’ তাড়াতাড়ি বলে উঠল জো। টার্গেট বিধ্বংসী নয়।’
‘হান্নাহর কথা স্মরণ করো।’ মাস্কের ভেতরে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। ‘আমাকে নিশ্চিত করো। ট্রিগারের উপর চেপে ধরল আঙুল। স্পর্শ করল বাম পাশের রাডার।
জো মনে হলো দম বন্ধ করে বসে রইল খানিকক্ষণ। তরপরই কঠিন স্বরে ঘোষণা করল,
টু কনফর্মিং।’
‘তাদেরকে মেরে ফেলো জো। দাঁত কিড়মিড় করে ট্রিগারের স্প্রিং আলগা করে টেনশনমুক্ত হলো। মৃদু হিসহিস শব্দ শোনা গেল। কেঁপে উঠে পিছনে বের হয়েই ছোটা শুরু করল টার্গেটের দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সচেতন হলো মিগ বহর।
চিৎকার করে সাবধান করল তাদের লিডার। পুরো কাঠামো পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে গেল। মনে হলো যে বারাকুড়াকে দেখতে পেয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল রূপালি সার্ডিনের দল।
সবচেয়ে কিনারে থাকা সিরিয়ানটা একটু ধীর গতিতে মোড় ঘুরলো। তখনি লেজে বাড়ি খেল সাইডইডার মিসাইল একসাথে দুটিই যাত্রা করল দূর আকাশে স্বর্গপানে।
শক ওয়েভের ধাক্কায় কেঁপে উঠল ডেভিডের মেশিন। কিন্তু শব্দ থেমে গেল দ্রুত; কেননা চোখের পলকে ভগ্নাংশে ভেঙ্গে গিয়ে মেঘের আঁধারে হারিয়ে গেল মিগ। একটা পাখা অনেক উপরে উঠে ছাইয়ের মতো ঝরে পড়তে লাগল নিচে। অল্পের জন্য বেঁচে গেল ডেভিডের মাথা।
দ্বিতীয় মিসাইল নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিল লাল রিং আঁকা প্লেনটাকে। কিন্তু দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাল রাশান লিডার। শক্তভাবে মোড় ঘোরায় অল্পের জন্য হাত ফসকে গেল মিসাইলের। মিগকে আর অনুসরণ করতে পারলো না। ডেভিড নিজের মিরেজ নিয়ে ছুটলো রাশানের পিছনে। দেখতে পেল বহুদূরে মেঘের ভিড়ে সবুজ ধোঁয়া ছড়িয়ে বিস্ফোরিত হয়ে গেল মিসাইল।
ডান দিকে কাত হয়ে মোড় নিল রাশান। পিছু নিল ডেভিড। শত্রুর মেশিনের সবকিছু পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে সে। পাইলটের বেগুনি রঙের হেলমেট, আইডেনটিফিকেশন মার্ক হিসেবে থাকা আরবী হরফ–এমনকি মিগের চকচকে ধাতব গায়ের প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে।
নিজের সর্বশক্তি দিয়ে জয় স্টিককে পেছন দিকে টেনে ধরল ডেভিড।
এদিকে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি টেনে ধরতে চাইছে ডেভিডকে। ফলে মনে হলো মাথা থেকে সব রক্ত বের হয়ে যাবে, চোখের সামনেটা হয়ে গেল ঝাপসা। শত্রুর পাইলটের হেলমেটের রং হয়ে গেল তামাটে বাদামী। ডেভিডের মনে হলো নিজের আসনে বসেই ভেঙেচুড়ে চুড়মার হয়ে যাবে সে।
কোমর আর পায়ের কাছে জি-স্যুট এঁটে বসে আছে। মনে হলো চেপে ধরে আছে কোন নিষ্ঠুর অজগর; চেষ্টা করছে কপালের খুলি চিড়ে ফেলে রক্ত শুষে নিতে।
ডেভিড চাইল শরীরের পেশীগুলোকে পাড়াতে। উপরের দিকে সামান্য কাত করল মিরেজ। চেষ্টা করল নিজের উচ্চতাকে কাজে লাগিয়ে আরো একবার শত্রুর উপর আঘাত হানতে।
চোখের দৃষ্টি আবারো ঝাপসা হয়ে এলো। নিজের সিটে পিন দিয়ে কেউ যেন আটকে দিল তাকে। মুখ হাঁ হয়ে গেল আপনাতেই। চোখের মণি মনে হলো ঠিকরে বের হয়ে আসবে। কন্ট্রোল কলামের উপর ডান হাত রাখতেই হিমশিম খেতে লাগল সে।
চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল স্টল ইন্ডিকেটরের কাঁটা নড়ছে। লাল বিন্দু জানিয়ে দিল যে এতটা সুপারসনিক গতি বিপদ বয়ে আনতে পারে তার জন্য।
ফুসফুস ভর্তি করে নিজের সমস্ত শক্তি এক করে চিৎকার করে উঠল ডেভিড। ধূসর কুয়াশায় শুনতে পেল নিজের প্রতিধ্বনি। এই চেষ্টার ফলে মনে হলো ব্রেইনে রক্ত ফিরে এলো খানিকটা। চোখের দৃষ্টিও একটু স্বাভাবিক হলো। স্পষ্ট দেখতে পেল যে মিগ আবার চলে এসেছে তার নিচে।
ঘুরে গিয়ে রাশানের কামানের মুখ থেকে পালানো ছাড়া আর কোন পথ রইল না ডেভিডের। গড়িয়ে গিয়ে বের হয়ে আনল মিরেজকে। আফটারবার্নারস এখনো জ্বলছে। অসম্ভব রকমের ফুয়েল খরচ করছে।
একজন ব্যালে নর্তকীর মতোই ভারসাম্য বজায় রেখে ডেভিডের পিছু নিল রাশান মিগ। রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে ডেভিড দেখতে পেল তাকে আক্রমণের জন্য এগিয়ে আসছে রাশান। আবারো গড়িয়ে উপরে উঠে ডান দিকে সরে গেল ডেভিড।
গড়িয়ে ঘুরে যাওয়া, জীবনের জন্য মোড় নেয়া। রাশানটাকে ভালই বুঝে নিল ডেভিড। প্রতিপক্ষ হিসেবে দুর্ধর্ষ রাশান দ্রুত আর নিখুঁতভাবে অনুসরণ করছে ডেভিডের প্রতিটি বাঁক আর মোড়ঘোরা। প্রতিবারই আঘাত করার চেষ্টা করছে।
কন্ট্রোল নিয়ে যুদ্ধ করতে করতে ডেভিডের কাঁধ আর হাত ব্যথা হয়ে গেল। মাধ্যাকর্ষণের চাপ, ব্রেইনে রক্তের অভাব, নিজের ভেতর অ্যাড্রেনালিনের প্রবাহ সব কিছু মিলিয়ে অসুস্থ বোধ করতে লাগল ডেভিড। নিজের ভেতরের ঠাণ্ডা রাগটা মনে হলো জমাট বাঁধা হতাশায় রূপ নিল। কেননা প্রতিবারই ওর কোন চেষ্টা ব্যর্থ হতে লাগল রাশানের কাছে। প্রতিবারই ওর প্রায় কাঁধ অথবা পেট ছুঁয়ে বের হয়ে যেতে লাগল মিগ। সমস্ত দক্ষতা, পাইলট হিসেবে সহজাত বোধ, সবকিছু মনে হলো নষ্ট হয়ে যেতে লাগল। বোঝা গেল শক্রর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আরো বেশি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় একবার যখন তারা প্রায় পাখায় পাখায় লেগে আছে মাঝখানের ফাঁকটুকু দিয়ে মানুষটার চেহারা স্পষ্ট দেখতে পেল ডেভিড। অক্সিজেন মাস্কের উপর দিয়ে কপাল আর চোখ। হাড়ের মতো ধূসর আর বিবর্ণ চামড়া। চোখগুলো খুলির একেবারে গর্তের মাঝে বসানো। আবারো মোড় নিল ডেভিড। ঘুরতে লাগল আর চিৎকার করতে লাগল। মাধ্যাকর্ষণের চাপ, ভয় সবকিছু চাইল চিৎকার করে তাড়িয়ে দিতে।
