মাথা নাড়ল। যা শুনল, হাসল। বন্ধ করে দিল রেকর্ডার। সুইভেল চেয়ার ঘুরিয়ে দ্বিতীয় রেকর্ডারের দিকে ফিরল। চাপ দিল ট্রান্সমিট বোতামে। মুখের কাছে ধরল মাইক্রোফোন। অনুবাদ করা শুরু করল হিব্রু থেকে ইংরেজিতে।
দরজার কাছে এসে দাঁড়াল ইলা। দেখতে লাগল মেয়েটার কাজকর্ম। একজন আমেকিান প্রকাশক ইংরেজি স্বত্ব কিনে নিয়েছে। বইটার জন্য ডেবরাকে অগ্রিম ত্রিশ হাজার আমেরিকান ডলার দিয়েছে। আর বাড়তি পাঁচ হাজার ডলার অনুবাদের জন্য। কাজটা প্রায় শেষ করে এনেছে সে।
যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে ডেবরার মাথায় ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাচ্ছে ইলা। মুখের তামাটে চামড়ার তুলনায় জায়গাটা সাদা গোলাপি হয়ে আছে। মনে হলো ছোট কোন শিশু এঁকে রেখেছে উড়ন্ত সি-গালের ছবি। ভি আকারের দাগটা তুষার কণার চেয়ে তেমন বড় নয়। মনে হলো এতে মেয়েটার সৌন্দর্য আরো বেড়ে গেছে। প্রায় একটা বিউটি স্পটের মতো।
এটা ঢাকার কোন চেষ্টাই করেনি সে। কালো চুলগুলো ঘাড়ের পেছনে টানটান করে বাঁধা। চামড়ার ফিরে দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। কোন মেকআপ নেয়নি মেয়েটা তারপরেও মুখের চামড়া দেখাচ্ছে পরিষ্কার, উজ্জ্বল, টানটান আর মসৃণ।
ফিশারম্যানদের বিশাল জার্সি আর উলের স্ন্যাক্স থাকা সত্ত্বেও দেহ দেখাচ্ছে দৃঢ় আর কৃশকায়। প্রতিদিন নিয়ম করে সাঁতার কাটে মেয়েটা। এমনকি উত্তরে ঠাণ্ডা বাতাসও তাকে থামাতে পারে না।
দরজা পার হয়ে নিঃশব্দে ডেস্কের কাছাকাছি গেল ইলা। তাকিয়ে থাকল ডেবরার চোখে। যা সে প্রায়ই করে। কোন একদিন এই ছবিটা আঁকবে সে। বাইরে থেকে আঘাতের কোন চিহ্নই নেই। কিছুতেই বোঝা যায় না যে মেয়েটা দেখতে পায় না। উপরন্তু অনিন্দ্যসুন্দর চোখ দুটো দেখে মনে হয় যে সবকিছু গভীর পর্যন্ত দেখতে পায় ওদুটো। এতটাই স্বচ্ছ চোখ দুটো যে রহস্যময় মনে হয় এই প্রশান্ত ভাব। এই গভীরতা আর সবকিছু বুঝে নেবার ভাবটাকে মেন অদ্ভুত মনে হয় ইলার কাছে।
মাইক্রোফোনের সুইচ অফ করল ডেবরা। রেকর্ডিং বন্ধ করে মাথা না ঘুরিয়েই বলে উঠল,
‘ইলা, এসেছো তুমি?
‘কেমন করে এটা করো তুমি? বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল ইলা।
‘তুমি হাঁটার সময় বাতাসে তার শব্দ পাই আমি আর তারপর তোমার গন্ধ।
‘ঝড় তোলার মতো যথেষ্ট বড়সড় আমি। কিন্তু আমার গায়ের গন্ধ কী এতটাই বাজে?’ কিড়মিড় শব্দে অভিযোগ জানাল ইলা।
‘তোমার গা থেকে তারপিন, রসুন আর বীয়ারের গন্ধ আসে। নাক টেনে হাসল ডেবরা।
‘আমি ছবি আঁকছিলাম। রোস্টের জন্য রসুন কেটেছি আর একজন বন্ধুর সাথে বীয়ারও পান করেছি। একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল ইলা। বইয়ের কাজ কতদূর হয়েছে?
‘প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আগামীকাল টাইপিস্টের কাছে যেতে পারবে। কফি খাবে?’ উঠে দাঁড়িয়ে গ্যাস ষ্টোভের কাছে গেল ডেবরা। ইলা জানে সাহায্য করতে চাইলে কী ঘটবে। প্রতিবার আগুন আর গরম পানির কাছে ডেবরাকে যেতে দেখলে দাঁত ঠকঠক করতে থাকে ইলা। মেয়েটা ভয়াবহ রকমের স্বাধীনচেতা। অন্য কারো সাহায্য আর সহানুভূতি চায় না কিছুতেই।
ঠিকঠিক ভাবে সাজানো আছে রুমটা। প্রতিটি জিনিস জায়গামত রাখা আছে যেন ডেবরা হাত দেয়ার সাথে সাথে জিনিসটি পেয়ে যায়। নিজের এই ছোট্ট দুনিয়ায় নিঃসংকোচে চলাফেরা করে ডেবরা। স্বচ্ছন্দে নিজের কাজ করে, নিজের খাবার নিজেই তৈরি করে, মাথা উঁচু করে নিজের মতো বাঁচতে শিখে গেছে মেয়েটা।
সপ্তাহে একবার, জেরুজালেমে প্রকাশকের অফিস থেকে ড্রাইভার এসে ডেবরার লেখা আর টেপ নিয়ে যায়।
এছাড়াও সপ্তাহে একবার ইলার সাথে স্পিডবোটে করে লেকের ওপারে টিবেরিসে যায় ডেবরা। একসাথে কেনাকাটা সারে দু’জনে আর প্রতিদিন পাথরের জেটিতে একঘণ্টা সাঁতার কাটে। প্রায়ই একজন পুরোন জেলে যার সাথে ইতিমধ্যেই বেশ সখ্যতা জমে গেছে ডেবরার, এসে ওকে নিয়ে যায়। তারপর দুজনে মিলে মাছ ধরে আবার ফিরিয়ে দিয়ে যায় ডেবরাকে।
জেটির পাশে থাকা লনে, ক্রুসেডের প্রাসাদে আছে ইলার বন্ধুত্ব আর বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা আর এখানে নিজের ছোট্ট কুটিরে আছে নৈঃশব্দ আর নিরাপত্তা, দীর্ঘকালব্যাপী করার জন্য কাজ। রাতে সঙ্গ দেয় একাকিত্ব আর নিঃশব্দ কান্না। একমাত্র বালিশটা ভিজে নকশা হয়ে যায়, যার কারণ একমাত্র জানে ডেবরা।
ইলার চেয়ারের পাশে এক মগ কফি রেখে দিল ডেবরা। নিজের কফি নিয়ে বসলো বেঞ্চে।
এখন বল’, বলে উঠল ডেবরা।
‘নিজের চেয়ারে এরকম আড়ষ্ট হয়ে বসে আছো কেন? চেয়ারের হাতলে আঙুল কৈছো। ইলার দিকে তাকিয়ে হাসল ডেবরা। বুঝতে পারল অবাক হয়েছে ইলা।
‘আমাকে কিছু একটা বলতে চাও তুমি। তাই না?
‘হ্যাঁ।’ একটু চুপ করে থেকে উত্তর দিল ইলা। হ্যাঁ, তুমি ঠিকই বলেছো। ডিয়ার’ লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার বলে উঠল। ও এসেছিল ডেবরা। আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। যেমনটা ভেবেছিলাম আমরাও।
টেবিলের উপর মগ নামিয়ে রাখল ডেবরা। একটুও হাত কাঁপল না, মুখে কোন ভাব ফুটলো না।
‘আমি ওকে বলিনি তুমি কোথায় আছো।
‘ও কেমন আছে ইলা? কেমন দেখাচ্ছিল ওকে?’
‘শুকিয়ে গেছে, খানিকটা। আমার মনে হয়েছে আর শেষবার যেমন দেখেছিলাম তার তুলনায় বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। কিন্তু এটাও মানিয়ে গেছে তাকে। ও এখনো আমার দেখা সবচেয়ে সুদর্শন পুরুষ।
