মাত্র এইটুকুতেই তুমি বাঁচতে পারবে না ডিয়ার। নাইটের দিকে প্রায় তাকালই না ডেভিড। রুককে আবারো আঘাত করল সাদা বিশপ দিয়ে।
কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেখতে পেল নাটকীয় ভাবে জোর মুখ থেকে উধাও হয়ে গেল দুঃশ্চিতার রেখা। হোসেফ মোরদেসাই এতক্ষণ কৌশল করেছে প্রতিপক্ষকে ফাঁদে ফেলার জন্য। তাড়াতাড়ি সতর্ক চোখে নাইটের দিকে তাকাল ডেভিড। বুঝতে পারল জোর দুর্গ পুরোপুরি অক্ষত। ওহ’ দেখেছো কতবড় চালাক। গুঙ্গিয়ে উটলো ডেভিড।
‘চেক!’ হাসিমুখে ঘোষণা করল জো। সৈন্যদের কাছে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল ডেভিডের রানী।
‘চেক!’ বোর্ড থেকে সাদা রানী তুলে নিল জো। সাথে সাথে নড়বড়ে রাজা আর সামনের খোলা পথ বেছে নিল পালাবার জন্যে।
‘অ্যান্ড মেট। পেছন দিক থেকে আক্রমণে ছুটলো তার রানী। হাততালি দিয়ে হেসে উঠল উপস্থিত দর্শকেরা। ডেভিডের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলো জো।
‘আবার?’ জিজ্ঞেস করতেই মাথা নাড়ল ডেভিড।
অন্যদের কাউকে ডেকে নাও। আমি এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাচ্ছি। নিজের আসন খালি করে উঠে দাঁড়াল ডেভিড। বোর্ড আবার নতুন করে সাজালো জো। হেঁটে কফি মেশিনের কাছে গেল ডেভিড। জি স্যুট পরণে থাকায় আড়ষ্ট হলো চলা-ফেরা। কালো ঘন তরলে চার চামচ চিনি নিয়ে কু রুমের কোণার দিকে শান্ত একটা অংশ গিয়ে বসল।
একই টেবিলে বসে আছে কোঁকড়ানো চুলের পাতলা শরীরের একজন কিবুজনিক ছেলে। ডেভিডের সাথে ইতিমধ্যেই খানিকটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে ছেলেটার। মোটাসোটা একটা উপন্যাস পড়ছে বসে বসে।
‘শালোম, রবার্ট কেমন আছো?
বই থেকে চোখ না তুলেই হাঁ সূচক মাথা নাড়ল রবার্ট। মিষ্টি গরম কফিতে চুমুক দিল ডেভিড। তার পাশে নিজের আসনে বসে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসল রবার্ট। আস্তে করে কাশলো। নিজের ভাবনায় ডুবে গেল ডেভিড। এত মাসের মাঝে প্রথমবারের মতো মনে পড়লো নিজের বাড়ির কথা। ভাবতে লাগল মিউজি আর বানি ভেন্টারের কথা। মনে পড়ল এই সিজনে ফলস বেতে ইয়ালো টেইল চলছে কিনা। কে জানে কেমন আছে হিল্ডারবার্গে প্রোটিয়ারা।
নিজের চেয়ারে বসে আবারো উসখুস করে উঠল রবার্ট। গলা পরিষ্কার করল কেঁশে নিয়ে। তার দিকে তাকাল ডেভিড। বুঝতে পারল বেশ আবেগ আপুত হয়ে পড়েছে ছেলেটা। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, চোখ দুটোও বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
কী পড়ছো তুমি? অবাক হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে ‘টাইটেলে চোখ বোলালো ডেভিড। বইয়ের গায়ে লাগানো ধুলার জ্যাকেটের ছবিটা তৎক্ষণাৎ চিনতে পারল। খুব মনেযোগ দিয়ে দেখা একটি মরুভূমির ল্যান্ডস্কেপ। ভয়ঙ্কর সব রঙ আর বিশাল ভূমি। দুটি শরীর নারী আর পুরুষ, মরুভূমির মাঝ দিয়ে হেঁটে চলেছে হাতে হাত রেখে; পুরো আবহটাই বেশ রহস্যময়। ঝিম ধরা। ডেভিড বুঝতে পারলো কেবল একজনই এটা আঁকতে পারে ইলা কাঁদেশ।
বইটা নিচু করল বরার্ট। অদ্ভুত!’ আবেগে থরথর করছে ওর গলা। আমি তোমাকে বলছি ডেভি। একটা অসাধারণ। এত সুন্দর বই খুব কমই লেখা হয়েছে।
কেমন করে কী যেন টের পেল ডেভিড। পুরোপুরি নিশ্চয়তার ভার নিয়ে রবার্টের হাত থেকে নিল বই। চোখ রাখল টাইটেলে, ‘আ প্লেস অব আওয়ার ওন।’
তখনো কথা বলে চলেছে রবার্ট। আমার বোন আমাকে বলেছে এটা পড়তে। প্রকাশকের হয়ে কাজ করে সে। এটা পড়ে পুরো রাত কেঁদেছে। আমার বোন। একদম নতুন বই। মাত্র গত সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু নির্ঘাৎ এদেশে লেখা সবচেয়ে অসাধারণ বইগুলোর মাঝে একটি হতে যাচ্ছে এটি।’
মনে হলো কিছু শুনতেই পেল না ডেভিড। একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। টাইটেলের নিচে ছোট করে লেখা লেখকের নামের দিকে।
‘ডেবরা মোরদেসাই।
আলতো করে বইয়ের মোড়কের গায়ে অক্ষরের উপর হাত বুলালো ডেভিড।
‘আমি এটা পড়তে চাই।’ বলে উঠল আস্তে করে।
‘আমার শেষ হলেই তোমাকে দেবো আমি। প্রতিজ্ঞা করল রবার্ট।
“আমি এখনি পড়তে চাই!
“উঁহু হবে না। প্রায় আতঙ্কিত হয়ে ডেভিডের কাছ থেকে বইটা কেড়ে নিল রবার্ট।
‘তোমার সময়ের জন্য অপেক্ষা করো কমরেড। জানিয়ে দিল সে।
চোখ তুলে তাকাল ডেভিড। রুমের ওপাশ থেকে তাকিয়ে আছে জো। অভিযোগের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল ডেভিড। তাড়াতাড়ি দাবা বোর্ডের দিকে চোখ নামিয়ে নিল জো। ডেভিড বুঝতে পারল বইয়ের কথা জানে জো। উঠে দাঁড়াল ওর কাছে যাবে বলে। গিয়ে কারণ জানতে চাইবে ওকে না জানাবার কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাঙ্কারে বেজে উঠল সাইরেন।
ল্যান্স স্কোয়াড্রনের ‘রেড স্ট্যান্ডবাই-এর সবাই। রেডিনেস বোর্ডে বিভিন্ন পদবীর পাশে লাল আলো জ্বলে উঠল।
ব্রাইট ল্যান্স।
‘রেড ল্যান্স।
ফায়ার ল্যান্স।’
নিজের ফ্লাইং হেলমেট ছো করে তুলে জি স্যুট পরিহিত ছুটতে থাকা শরীরগুলোর সাথে ছুটলো ডেভিড। কু-রুমের দরজার বাইরে কংক্রিটের টানেলে থাকা ইলেকট্রিক পার্সোনেল ক্যারিয়ারের উদ্দেশে ছুটছে সবাই। ঠেলেঠুলে তুলে জোর পাশে গিয়ে দাঁড়াল ডেভিড।
‘আমাকে বলনি কেন?’ জানতে চাইল জোর কাছে।
‘আমি বলতেই যাচ্ছিলাম, সত্যি।
হ্যাঁ। বুঝতে পেরেছি আমি।’ বিদ্রুপের স্বরে উত্তর দিল ডেভিড। ‘পড়েছো তুমি?
মাথা নাড়ল জো। আবারও জানতে চাইল ডেভিড, কী সম্পর্কে?
‘আমি তোমাকে বলব না। তুমি নিজেই পড়ো।
‘এটা নিয়ে ভেব না।’ বিড়বিড় করে উত্তর দিল ডেভিড। আমি পড়বো।’
